আধুনিক সম্পর্কে যৌন আকাঙ্ক্ষা নষ্ট হওয়ার এক নীরব ঘাতক হলো অবৈতনিক ঘরের কাজ
২৯ মার্চ, ২০২৬

দম্পতিরা প্রায়শই মনে করেন যে দীর্ঘদিনের সম্পর্কে আবেগ কমে যাওয়াটা মানুষের শারীরিক গঠনের এক অবশ্যম্ভাবী পরিণতি। প্রচলিত ধারণা অনুযায়ী, অতিরিক্ত পরিচিতি যৌন জীবনে একঘেয়েমি নিয়ে আসে। আর বছরের পর বছর পেরিয়ে গেলে প্রেমের প্রাথমিক আগুন এমনিতেই নিভে যায়। এই পরিস্থিতি বদলাতে সঙ্গীরা ডেট নাইট, দামী ছুটি কাটানো এবং ব্যয়বহুল কাপল থেরাপির মতো জিনিসে অনেক টাকা খরচ করেন। তারা তাদের সম্পর্কের শুরুর দিনগুলোর সেই পুরনো স্ফুলিঙ্গ ফিরে পেতে চান। কিন্তু গবেষণায় দেখা যাচ্ছে, যৌন জীবন ফিকে হয়ে যাওয়ার আসল কারণ ভালোবাসা বা শারীরিক আকর্ষণের অভাব নয়। বরং, আধুনিক সম্পর্কের ঘনিষ্ঠতার সবচেয়ে বড় শত্রু হয়তো রান্নাঘরের সিঙ্কেই জমে আছে। অবৈতনিক ঘরের কাজ এবং বাড়ির দায়িত্বের অসম বন্টন বিশ্বজুড়ে সম্পর্কের যৌন স্বাস্থ্যকে নীরবে নিয়ন্ত্রণ করছে।
কয়েক দশক ধরে গবেষকরা একটি আকর্ষণীয় সম্পর্ক লক্ষ্য করেছেন। সেটা হলো, কে ঘরের মেঝে পরিষ্কার করছে এবং শোবার ঘরে কী ঘটছে—তার মধ্যে একটি যোগসূত্র আছে। 'জার্নাল অফ ম্যারেজ অ্যান্ড ফ্যামিলি'-র মতো সমাজতাত্ত্বিক জার্নালে প্রকাশিত তথ্য लगातार দেখিয়েছে যে, যে দম্পতিরা ঘরের দায়িত্ব সমানভাবে ভাগ করে নেন, তারা যৌন জীবনে অনেক বেশি সন্তুষ্ট থাকেন। এই দম্পতিদের যৌন জীবন শুধু উন্নতই নয়, তারা অন্যদের চেয়ে ঘন ঘন যৌন মিলনেও লিপ্ত হন। বিশেষ করে সেইসব দম্পতিদের চেয়ে, যাদের মধ্যে কাজের ভাগাভাগিটা গতানুগতিক বা অসম। কর্নেল ইউনিভার্সিটির গবেষকদের একটি উল্লেখযোগ্য গবেষণায় মধ্যবয়সী দম্পতিদের অভ্যাস পরীক্ষা করা হয়েছিল। সেখানে ঘরের কাজে সমতা এবং শারীরিক ঘনিষ্ঠতার মধ্যে সরাসরি একটি যোগসূত্র পাওয়া গেছে। যখন একজন সঙ্গী মনে করেন যে দৈনন্দিন কাজের একটি অন্যায্য বোঝা তার ওপর চাপানো হয়েছে, তখন তাদের যৌন মিলনের হার একদম কমে যায়। এটি শুধু আমেরিকার ঘটনা নয়। ইউরোপ এবং উত্তর আমেরিকা জুড়ে সমাজতাত্ত্বিক সমীক্ষায় ঠিক একই চিত্র দেখা গেছে। বসার ঘরে সমতা সরাসরি শোবার ঘরে আবেগের জন্ম দেয়।
এই প্রবণতার মূল কারণ মানব मनोविज्ञान এবং শরীরবৃত্ত, দুটোর মধ্যেই গভীরভাবে নিহিত। বিষমকামী সম্পর্কের ক্ষেত্রে, ঘরের কাজ সামলানোর বোঝা এখনও নারীদের ওপর অসমভাবে চাপে। এমনকি যখন উভয় সঙ্গীই বাড়ির বাইরে পুরো সময় কাজ করেন, তখনও এই চিত্র বদলায় না। এই ভারসাম্যহীনতা কেবল রান্না করা বা কাপড় ভাঁজ করার মতো শারীরিক কাজের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। এর মধ্যে রয়েছে এক অদৃশ্য এবং ক্লান্তিকর মানসিক বোঝাও। যেমন, কার কী লাগবে তা আগে থেকে বোঝা, অ্যাপয়েন্টমেন্ট ঠিক করা এবং পরিবারের সবকিছু মসৃণভাবে চালানো। যখন একজন ব্যক্তিকে বাড়ির প্রধান ব্যবস্থাপকের ভূমিকা পালন করতে বাধ্য করা হয়, তখন তিনি অজান্তেই তার সঙ্গীর প্রতি একজন অভিভাবক বা মায়ের মতো আচরণ করতে শুরু করেন। এই ধরনের সম্পর্ক যৌনতার সম্পূর্ণ বিরোধী। একজন সঙ্গীকে যদি আপনার নিজের ওপর নির্ভরশীল কারো মতো করে সামলাতে হয়, তবে তার প্রতি যৌন আকর্ষণ অনুভব করা প্রায় অসম্ভব।
এছাড়াও, এই অসম মানসিক বোঝার কারণে তৈরি হওয়া দীর্ঘস্থায়ী মানসিক চাপের একটি গুরুতর শারীরিক প্রভাব রয়েছে। অতিরিক্ত মানসিক চাপ মস্তিষ্কে কর্টিসল নামক হরমোনের নিঃসরণ ঘটায়। কর্টিসলের মাত্রা বেড়ে গেলে তা যৌন উত্তেজনার জন্য প্রয়োজনীয় হরমোনগুলোকে দমন করে। একই সাথে, এটি স্নায়ুতন্ত্রকে সবসময় সতর্ক অবস্থায় রাখে। ক্লান্তি এবং উদ্বেগ শারীরিক সম্পর্কের ক্ষমতাকে নষ্ট করে দেয়। যখন মস্তিষ্ক ক্রমাগত মুদি দোকানের তালিকা, বিল মেটানোর চিন্তা এবং বাচ্চার ডাক্তারের অ্যাপয়েন্টমেন্ট নিয়ে ব্যস্ত থাকে, তখন ঘনিষ্ঠতার আবহে প্রবেশ করা তার পক্ষে সম্ভব হয় না।
এই অসম বণ্টনের পরিণতি কেবল কয়েকটি রাত শারীরিক সম্পর্ক না হওয়ার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে না। সময়ের সাথে সাথে, কাজের এই অসম বন্টন এক গভীর, নীরব ক্ষোভের জন্ম দেয়। যেটা হয়তো না ধোওয়া বাসন নিয়ে সামান্য বিরক্তি দিয়ে শুরু হয়েছিল, সেটাই ধীরে ধীরে সঙ্গীদের মধ্যে একটি স্থায়ী মানসিক প্রাচীরে পরিণত হয়। যে সঙ্গীর ওপর বেশি কাজের বোঝা থাকে, তিনি শারীরিক স্নেহকে তার ফুরিয়ে যাওয়া শক্তির ওপর আরেকটি দাবি বলে মনে করতে শুরু করেন। শোবার ঘর, যা সম্পর্কের আশ্রয়স্থল হওয়া উচিত ছিল, তা এড়িয়ে চলার জায়গায় পরিণত হয়। অন্যদিকে, যে সঙ্গী তার দায়িত্ব পালন করছেন না, তিনি প্রায়শই বিভ্রান্ত এবং প্রত্যাখ্যাত বোধ করেন। তারা বুঝতেই পারেন না যে ঘরের কাজে তার অবদানের অভাবই এই শারীরিক দূরত্বের কারণ। তারা প্রায়শই বয়স বা অফিসের চাপকে যৌনতার অভাবের জন্য দায়ী করেন।
এই বোঝাপড়ার অভাব সম্পর্ককে নিয়মিত ভাঙনের দিকে ঠেলে দেয়। অনেক দম্পতি শেষ পর্যন্ত বোঝাপড়ার অভাব বা একে অপরের থেকে দূরে সরে যাওয়ার কারণে বিবাহবিচ্ছেদ করেন। তারা কখনই বুঝতে পারেন না যে তাদের রোমান্টিক সম্পর্কের পতনের ভিত্তি ছিল সম্পূর্ণরূপে ঘরের কাজের ভাগাভাগি। এই ধারা বদলাতে হলে, প্রাপ্তবয়স্কদের প্রেম এবং অংশীদারিত্ব নিয়ে তাদের দৃষ্টিভঙ্গি আমূল পরিবর্তন করতে হবে। এর সমাধান এটা নয় যে কম সক্রিয় সঙ্গী মাঝে মাঝে ঘরের কাজে 'সাহায্য' করবেন। 'সাহায্য' শব্দটি বোঝায় যে ঘরের কাজের বোঝা স্বাভাবিকভাবেই একজনের। অন্যজন শুধু অংশ নিয়ে তাকে অনুগ্রহ করছেন।
এর পরিবর্তে, দম্পতিদের ঘরের কাজ নিয়ে সম্পূর্ণ স্বচ্ছতা এবং পূর্ণ মালিকানার একটি ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। সম্পর্ক বিশেষজ্ঞরা এবং মনোবিজ্ঞানীরা পরামর্শ দেন যে, বাড়ি चलाने জন্য প্রয়োজনীয় প্রতিটি কাজ এবং মানসিক দায়িত্বের একটি স্পষ্ট তালিকা তৈরি করে আলোচনা করা উচিত। সঙ্গীদের নির্দিষ্ট কিছু কাজের সম্পূর্ণ দায়িত্ব নিতে হবে। যেমন, খাবারের পরিকল্পনা করা থেকে শুরু করে বাড়ির বাজেট সামলানো। এর জন্য তাদের মনে করিয়ে দেওয়া, তদারকি করা বা প্রশংসা করার কোনো প্রয়োজন থাকা উচিত নয়। প্রকৃত সমতা মানে একজনের কাঁধ থেকে মানসিক বোঝা নামিয়ে তা ন্যায্যভাবে ভাগ করে নেওয়া। যখন দুজনেই সক্রিয়ভাবে সংসার চালান, তখন ক্ষমতার ভারসাম্য স্বাভাবিকভাবেই সমান অংশীদারিত্বে ফিরে আসে। এটি দুর্বলতা প্রকাশ এবং ঘনিষ্ঠতার জন্য প্রয়োজনীয় মানসিক নিরাপত্তা তৈরি করে।
পরিশেষে, দীর্ঘমেয়াদী সম্পর্কের ক্ষেত্রে রোমান্টিকতার সংজ্ঞা নতুন করে নির্ধারণ করা সমাজের জন্য জরুরি। দামী ফুল কেনা বা জমকালো রাতের খাবারের আয়োজন করা কখনওই একটি অসম সম্পর্কের প্রতিদিনের ক্লান্তিকে পূরণ করতে পারে না। আসল ঘনিষ্ঠতা পারস্পরিক সমর্থন এবং ভাগ করে নেওয়া দায়িত্বের এক নির্ভরযোগ্য ভিত্তির ওপর তৈরি হয়। না বলে ডিশওয়াশার খালি করা, পরিবারের কোনো প্রয়োজন আগে থেকে বোঝা, বা সপ্তাহের বাজার করা—এগুলো আবেগগত এবং যৌন বিনিয়োগের গভীর কাজ। যখন সঙ্গীরা অবশেষে ঘরের কাজে সমতাকে ভালোবাসার একটি অলঙ্ঘনীয় শর্ত হিসেবে বিবেচনা করেন, তখন তারা শুধু একটি বাড়ি পরিষ্কার করেন না। তারা এমন একটি পরিবেশ তৈরি করেন যেখানে শারীরিক আকাঙ্ক্ষা সত্যিই টিকে থাকতে পারে।