ডিজিটাল অবসাদের সংকট প্রাপ্তবয়স্কদের ডেটিং অ্যাপ ছেড়ে পুরনো অফলাইন সম্পর্কে ফিরতে বাধ্য করছে

২৮ মার্চ, ২০২৬

ডিজিটাল অবসাদের সংকট প্রাপ্তবয়স্কদের ডেটিং অ্যাপ ছেড়ে পুরনো অফলাইন সম্পর্কে ফিরতে বাধ্য করছে

এক দশকেরও বেশি সময় ধরে আধুনিক প্রেম নিয়ে একটি নির্দিষ্ট ধারণা সমাজে প্রচলিত ছিল। মনে করা হতো, প্রযুক্তি যৌন ঘনিষ্ঠতা এবং দীর্ঘস্থায়ী সঙ্গী খুঁজে পাওয়াকে মানব ইতিহাসের যেকোনো সময়ের চেয়ে সহজ করে দেবে। এর প্রতিশ্রুতি ছিল খুবই সাধারণ। একটি অ্যালগরিদম আশেপাশের হাজার হাজার অবিবাহিত মানুষের তালিকা থেকে পছন্দ এবং আকর্ষণের ভিত্তিতে তাৎক্ষণিকভাবে যোগাযোগ করিয়ে দেবে। কিন্তু ডিজিটাল ডেটিং-এর বাস্তবতা সম্পূর্ণ ভিন্নভাবে 드러 পড়েছে। সহজ সম্পর্কের যুগের পরিবর্তে, আধুনিক প্রাপ্তবয়স্করা আজ মারাত্মক রোমান্টিক অবসাদের শিকার হচ্ছেন। বহু মানুষ তাদের মানসিক স্বাস্থ্য রক্ষা করতে এবং প্রকৃত ঘনিষ্ঠতা ফিরে পেতে ডেটিং অ্যাপগুলো পুরোপুরি ছেড়ে দিচ্ছেন। তারা পুরনো দিনের মতো ব্যক্তিগতভাবে দেখা করে সম্পর্ক তৈরির পথে ফিরে যাচ্ছেন।

ডিজিটাল জগৎ থেকে সরে আসার এই প্রবণতার অনেক প্রমাণ রয়েছে। পিউ রিসার্চ সেন্টারের সাম্প্রতিক সমীক্ষায় দেখা গেছে, ডেটিং অ্যাপ ব্যবহারকারী প্রায় অর্ধেক প্রাপ্তবয়স্ক তাদের অভিজ্ঞতা নিয়ে হতাশ, বিরক্ত বা উদ্বিগ্ন। অন্যদিকে, বিশ্বব্যাপী ডেটিং অ্যাপের শিল্প ব্যবহারকারীদের আগ্রহ ধরে রাখতে সংকটে পড়েছে। বিশ্বের সবচেয়ে জনপ্রিয় ডেটিং প্ল্যাটফর্মগুলোর মালিকানাধীন বড় প্রযুক্তি সংস্থাগুলো জানাচ্ছে যে, গত কয়েকটি আর্থিক ত্রৈমাসিকে তাদের ব্যবহারকারীর সংখ্যা বৃদ্ধি থমকে গেছে এবং আয় কমেছে। গ্রাহক গবেষণা সংস্থাগুলোর তথ্য অনুযায়ী, গত তিন বছরে তরুণদের মধ্যে অ্যাপ ডাউনলোডের হার ক্রমাগত কমেছে। মানুষ শুধু সাময়িক বিরতি নিচ্ছে না, তারা স্থায়ীভাবে তাদের প্রোফাইল মুছে ফেলছে। সম্প্রতি ‘জার্নাল অফ সোশ্যাল অ্যান্ড পার্সোনাল রিলেশনশিপস’-এ প্রকাশিত একটি গবেষণায় দেখা গেছে, যারা অ্যাপে সবচেয়ে বেশি সময় ধরে সোয়াইপ করেন, তাদের আত্মসম্মান কম থাকে। অফলাইনে সঙ্গী খোঁজা মানুষদের তুলনায় তারা বাস্তবে কম ডেট করার সুযোগ পান।

অ্যাপগুলো থেকে মানুষের এভাবে গণহারে চলে যাওয়ার কারণটি তাদের নকশার মধ্যেই নিহিত। ডেটিং অ্যাপগুলো এমনভাবে তৈরি করা হয়েছে যা অনেকটা গেমের মতো। ক্রমাগত সোয়াইপ করতে থাকলে ব্যবহারকারী মাঝে মাঝে পুরস্কার হিসেবে ডোপামিন অনুভব করেন। এই গঠন একটি মনস্তাত্ত্বিক পরিস্থিতি তৈরি করে, যা ‘পছন্দের উভয়সংকট’ (paradox of choice) নামে পরিচিত। যখন প্রাপ্তবয়স্কদের সামনে অসংখ্য সম্ভাব্য যৌন ও রোমান্টিক সঙ্গীর তালিকা তুলে ধরা হয়, তখন চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া খুব কঠিন হয়ে পড়ে। মানুষ সব সময় ভাবতে থাকে, হয়তো আরও ভালো কেউ মাত্র একটি সোয়াইপ দূরেই আছে। এই অফুরন্ত পছন্দের भ्रम মানুষের একে অপরের প্রতি আচরণকে পুরোপুরি বদলে দেয়। ব্যবহারকারীরা তাদের ডেটকে একজন জটিল মানুষ হিসেবে দেখার পরিবর্তে, একে অপরকে ফেলে দেওয়ার মতো পণ্য হিসেবে গণ্য করে। যদি সামান্য মতবিরোধ হয় বা কথোপকথনে সাময়িক নীরবতা আসে, তবে সেই সমস্যা সমাধানের চেষ্টা করার চেয়ে আনম্যাচ করে নতুন করে শুরু করা সহজ মনে হয়। এছাড়াও, অগভীর কথোপকথনের এই বিশাল পরিমাণ প্রচুর মানসিক শ্রমের দাবি করে। মানুষ ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপরিচিতদের সাথে টেক্সট করে, কিন্তু কোনও ব্যাখ্যা ছাড়াই সেই কথোপকথন হঠাৎ থেমে যায়। সময়ের সাথে সাথে, আশা এবং প্রত্যাখ্যানের এই পুনরাবৃত্তিমূলক চক্র প্রকৃত ঘনিষ্ঠতার জন্য প্রয়োজনীয় দুর্বলতাকে নষ্ট করে দেয়।

এই ডিজিটাল ক্লান্তির প্রভাব প্রাপ্তবয়স্কদের মানসিক স্বাস্থ্য এবং সামাজিক সম্পর্কের আচরণের ওপর গভীরভাবে পড়ে। মনোবিজ্ঞানীরা ‘ডেটিং অ্যাপ বার্নআউট’ নামে একটি ক্রমবর্ধমান প্রবণতা চিহ্নিত করেছেন, যার লক্ষণগুলো পেশাগত ক্লান্তির মতোই। ফোনে কয়েক ডজন সক্রিয় ম্যাচ থাকা সত্ত্বেও, অবিবাহিত ব্যক্তিরা মানসিকভাবে শূন্য এবং অত্যন্ত একাকী বোধ করেন বলে জানিয়েছেন। এই পরিবেশ ‘ঘোস্টিং’ (হঠাৎ যোগাযোগ বন্ধ করে দেওয়া), ‘ব্রেডক্রাম্বিং’ (আগ্রহের মিথ্যা ইঙ্গিত দেওয়া), এবং অস্পষ্ট সম্পর্ক তৈরির মতো ক্ষতিকর আচরণগুলোকে স্বাভাবিক করে তুলেছে। যেহেতু অ্যাপগুলো কম বিনিয়োগের ডেটিং সংস্কৃতিকে উৎসাহিত করে, তাই প্রায়শই স্পষ্ট যোগাযোগ এবং সম্মতির বিষয়টি উপেক্ষা করা হয়। মানুষ তাদের সম্পর্কের সীমা নির্ধারণ করতে এড়িয়ে চলে, কারণ ডিজিটাল জগৎ মানসিক দূরত্বকে পুরস্কৃত করে। ফলস্বরূপ, অনেক প্রাপ্তবয়স্ক অর্থপূর্ণ শারীরিক এবং মানসিক ঘনিষ্ঠতার তীব্র অভাব অনুভব করছেন। তারা একটি ভিড়ে ভরা ডেটিং জগতে থেকেও সম্পূর্ণ অদৃশ্য বোধ করছেন। যৌনতা এবং প্রেমের এই বাণিজ্যিকীকরণ একটি প্রজন্মকে অপর্যাপ্ত, ক্লান্ত এবং দীর্ঘমেয়াদী প্রতিশ্রুতির সম্ভাবনা সম্পর্কে গভীরভাবে সন্দিহান করে তুলেছে।

এই মানসিক চাপের প্রতিক্রিয়ায় একটি বড় সাংস্কৃতিক পরিবর্তন ঘটছে। অবিবাহিতরা এখন ডিজিটাল সঙ্গী খোঁজার পদ্ধতির বাইরে অ্যানালগ বা বাস্তব জীবনের বিকল্প খুঁজছেন। প্রথাগত, ব্যক্তিগতভাবে দেখা করার পরিবেশগুলোর ব্যাপক पुनरुत्थान ঘটেছে। দৌড়ের ক্লাব, রান্নার ক্লাস এবং শখের ওপর ভিত্তি করে তৈরি কমিউনিটি গ্রুপগুলো প্রাপ্তবয়স্কদের সম্পর্ক তৈরির নতুন কেন্দ্র হয়ে উঠছে। এই পরিবেশগুলো લોકોને কোনও ধরনের ডিজিটাল সাক্ষাৎকারের চাপ ছাড়াই স্বাভাবিকভাবে শারীরিক রসায়ন তৈরি করতে এবং পারস্পরিক আকর্ষণ বুঝতে সাহায্য করে। এছাড়াও, পেশাদার ম্যাচমেকিং পরিষেবা, যা একসময় ধনীদের জন্য একটি পুরনো বিলাসিতা হিসেবে বিবেচিত হতো, তা এখন মধ্যবিত্ত পেশাদারদের মধ্যে ব্যাপক জনপ্রিয়তা পাচ্ছে। মানুষ সম্ভাব্য সঙ্গীদের যাচাই করতে, তাদের উদ্দেশ্য নিশ্চিত করতে এবং নিরাপদ ও উন্নত মানের পরিচয় পর্বের ব্যবস্থা করার জন্য পেশাদার ঘটকদের অর্থ দিতে ইচ্ছুক। যারা এখনও ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করতে চান, তাদের জন্য সম্পর্ক বিশেষজ্ঞরা ‘স্লো ডেটিং’ বা ধীরগতির ডেটিং নামে একটি কৌশলের পরামর্শ দিচ্ছেন। এই পদ্ধতিতে অ্যাপ ব্যবহার দিনে মাত্র কয়েক মিনিটের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখা, একবারে মাত্র এক বা দুজন ব্যক্তির সাথে কথা বলা এবং যত দ্রুত সম্ভব কথোপকথনটিকে বাস্তব জগতের বৈঠকে নিয়ে যাওয়া হয়। প্রযুক্তির চারপাশে কঠোর সীমানা নির্ধারণ করে, প্রাপ্তবয়স্করা তাদের মানসিক শক্তি রক্ষা করতে পারেন।

ডেটিং অ্যাপ থেকে এই সরে আসা মানুষের স্বভাব সম্পর্কে একটি মৌলিক সত্য তুলে ধরে। আমরা একটি উচ্চ প্রযুক্তির, বিশাল ডিজিটাল বাজারের মাধ্যমে ভালোবাসা এবং ঘনিষ্ঠতা খুঁজে পাওয়ার জন্য তৈরি নই। সত্যিকারের রোমান্টিক সম্পর্কের জন্য প্রয়োজন দুর্বলতা, ধৈর্য এবং অন্য একজন ব্যক্তিকে তার সম্পূর্ণরূপে দেখার ইচ্ছা। অ্যালগরিদম অবশ্যই ভৌগোলিক নৈকট্য এবং বাহ্যিক পছন্দের ভিত্তিতে দুজন অপরিচিতকে পরিচয় করিয়ে দিতে পারে, কিন্তু তারা শারীরিক রসায়নের সেই স্ফুলিঙ্গ বা মানসিক বিশ্বাসের আরাম তৈরি করতে পারে না। যত বেশি প্রাপ্তবয়স্ক এই গেম-সর্বস্ব প্রেমের সীমাবদ্ধতা বুঝতে পারছেন, আধুনিক ডেটিং-এর জগৎ ধীরে ধীরে সুস্থ হয়ে উঠছে। ধীর, ইচ্ছাকৃত এবং ব্যক্তিগতভাবে দেখা করে সম্পর্ক তৈরির দিকে এই প্রত্যাবর্তন প্রমাণ করে যে, মানব সম্পর্কের চূড়ান্ত লক্ষ্য কেবল দক্ষতা বৃদ্ধি নয়। শেষ পর্যন্ত, মানুষ বুঝতে পারছে যে একটি অর্থপূর্ণ সম্পর্ক খুঁজে পাওয়া মানে পছন্দের সংখ্যা বাড়ানো নয়, বরং বাস্তব জগতে আন্তরিকভাবে উপস্থিত থাকা।

Publication

The World Dispatch

Source: Editorial Desk

Category: Adult