আধুনিক প্রাপ্তবয়স্কদের সম্পর্ক বদলে দিচ্ছে নীরব যৌন মন্দা

২৮ মার্চ, ২০২৬

আধুনিক প্রাপ্তবয়স্কদের সম্পর্ক বদলে দিচ্ছে নীরব যৌন মন্দা

আধুনিক সমাজ প্রাপ্তবয়স্কদের জীবন নিয়ে এক বড় বিভ্রান্তির মধ্যে রয়েছে। ডেটিং অ্যাপের প্রসার, পুরোনো রাখঢাক ভেঙে যাওয়া এবং মূলধারার মাধ্যমে প্রচুর যৌনতাপূর্ণ বিষয়বস্তুর কারণে মনে হওয়া স্বাভাবিক যে, বর্তমান যুগের প্রাপ্তবয়স্করা আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি শারীরিক অন্তরঙ্গতা উপভোগ করছেন। চারপাশের পরিবেশ দেখে মনে হয়, রোমান্টিক সুযোগ এবং বাধাহীন যৌন প্রকাশের কোনো শেষ নেই। কিন্তু অতিরিক্ত যৌনতাপূর্ণ এই ডিজিটাল দুনিয়ার গভীরে রয়েছে এক অদ্ভুত বৈপরীত্য। শিল্পোন্নত বিশ্বজুড়ে প্রাপ্তবয়স্করা আসলে ইতিহাসে সবচেয়ে বড় অন্তরঙ্গতার খরায় ভুগছেন। একে সম্পর্কের সোনালী যুগ বলা যায় না। বরং আমরা শারীরিক ও মানসিক নৈকট্যের এক নীরব অথচ মারাত্মক মন্দায় প্রবেশ করেছি। এটি প্রাপ্তবয়স্কদের সম্পর্কের ধরনকে পুরোপুরি বদলে দিচ্ছে।

এই পরিবর্তনের পেছনের পরিসংখ্যানগুলো বেশ স্পষ্ট। বিভিন্ন সংস্কৃতিতেও এর মিল রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের ইউনিভার্সিটি অব শিকাগো পরিচালিত 'জেনারেল সোশ্যাল সার্ভে' একটি অত্যন্ত সম্মানিত সমাজতান্ত্রিক গবেষণা প্রকল্প। তাদের তথ্যে দেখা গেছে, শারীরিক সম্পর্কহীন প্রাপ্তবয়স্কদের সংখ্যা সেখানে ব্যাপকভাবে বেড়েছে। নব্বইয়ের দশকের শেষ থেকে ২০১০ সালের শেষভাগ পর্যন্ত সময়ে তরুণ ও মধ্যবয়সীদের মধ্যে গত এক বছরে কোনো শারীরিক সম্পর্ক না হওয়ার হার রেকর্ড ছুঁয়েছে। এটি শুধু আমেরিকার একক কোনো ঘটনা নয়। যুক্তরাজ্যের 'ন্যাশনাল সার্ভে অব সেক্সুয়াল অ্যাটিচিউডস অ্যান্ড লাইফস্টাইলস' গত দুই দশক ধরে সব বয়সী মানুষের মধ্যে শারীরিক সম্পর্কের হার কমার কথা বারবার জানিয়েছে। এমনকি বিবাহিত দম্পতিদের মধ্যেও এই হার কমেছে। একইভাবে, জাপানের 'ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব পপুলেশন অ্যান্ড সোশ্যাল সিকিউরিটি রিসার্চ'-এর গবেষকরা দীর্ঘদিন ধরে এমন এক প্রাপ্তবয়স্ক গোষ্ঠীর ওপর নজর রাখছেন, যারা সম্পূর্ণ সঙ্গীহীন এবং শারীরিক সম্পর্ক থেকে বিরত। পশ্চিমা দেশগুলোতেও এখন এই একই প্রবণতা দেখা যাচ্ছে।

প্রাপ্তবয়স্কদের অন্তরঙ্গতা এভাবে কমে যাওয়ার কারণে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন ওঠে, আচরণের এত বড় পরিবর্তনের পেছনে কারণ কী? এর উত্তর লুকিয়ে আছে অর্থনৈতিক দুশ্চিন্তা, সমাজকাঠামোর পরিবর্তন এবং প্রযুক্তির অতিরিক্ত ব্যবহারের জটিল সমীকরণে। এর মূলে রয়েছে অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা। যখন প্রাপ্তবয়স্কদের ঘাড়ে পড়াশোনার ঋণের বোঝা চাপে, বেতন বাড়ে না এবং বাড়ি কেনা বা ভাড়া নেওয়া কঠিন হয়ে পড়ে, তখন জীবনের স্বাভাবিক ধাপগুলো পিছিয়ে যায়। আর্থিক অস্থিতিশীলতার কারণে হওয়া দীর্ঘস্থায়ী মানসিক চাপ মানুষের যৌন আকাঙ্ক্ষা কমিয়ে দেয়। এটি বৈজ্ঞানিকভাবে প্রমাণিত। তরুণদের বাধ্য হয়ে অনেক দিন বাবা-মায়ের সাথে থাকতে হয়। অথবা ছোট অ্যাপার্টমেন্টে অনেক রুমমেট নিয়ে থাকতে হয়। এর ফলে অন্তরঙ্গ সম্পর্ক গড়ে তোলার জন্য প্রয়োজনীয় জায়গা ও মানসিক স্পেস অনেকটাই কমে যায়। শুধু টিকে থাকার লড়াইয়ে রোমান্স বা প্রেম নিবেদনের সুযোগ খুব কমই থাকে।

অর্থনীতির বাইরে, ডিজিটাল জীবনযাপন মানুষের সম্পর্ক খোঁজার ধরনকে পুরোপুরি বদলে দিয়েছে। আধুনিক ডেটিং জগৎ এখন অ্যালগরিদম-নির্ভর অ্যাপের দখলে। এটি রোমান্সকে একটি কঠিন ও কম লাভজনক বাছাই প্রক্রিয়ায় পরিণত করেছে। অসংখ্য বিকল্প থাকার কারণে অনেকেই দ্বিধায় ভোগেন এবং সবসময় অসন্তুষ্ট থাকেন। তারা সম্ভাব্য সঙ্গীদের বাতিলযোগ্য মনে করেন। একই সময়ে, দ্রুতগতির ইন্টারনেটের সহজলভ্যতার কারণে মানুষ বিপুল পরিমাণে ডিজিটাল প্রাপ্তবয়স্ক বিনোদন বা পর্নোগ্রাফি দেখছে। সমাজবিজ্ঞানী ও স্নায়ুবিজ্ঞানীরা লক্ষ্য করছেন যে, মানুষের একটি বড় অংশের কাছে পর্নোগ্রাফি এখন বাস্তব জীবনের জটিল শারীরিক অন্তরঙ্গতার বিকল্প হয়ে দাঁড়িয়েছে। কারণ এটি খুব সহজেই পাওয়া যায় এবং মস্তিস্কে দ্রুত ডোপামিন ছড়ায়। এই ডিজিটাল মাধ্যমগুলো মানুষকে তাৎক্ষণিক আনন্দ দেয়। বাস্তব জীবনে প্রেম করতে গেলে যে মানসিক শ্রম দিতে হয় বা প্রত্যাখ্যাত হওয়ার যে ঝুঁকি থাকে, এখানে তা নেই। ফলে অনেকেই নীরবে সঙ্গীসহ অন্তরঙ্গতার পথ থেকে সরে আসছেন।

আমাদের ব্যক্তিগত জীবনে প্রযুক্তির প্রবেশ শুধু পর্নোগ্রাফি বা ডেটিং অ্যাপের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই। কর্মজীবন এবং ব্যক্তিগত জীবনের মধ্যকার দেয়াল পুরোপুরি ভেঙে গেছে। বাসা থেকে কাজ করার বা 'রিমোট ওয়ার্ক'-এর কারণে এই প্রবণতা আরও বেড়েছে। শোবার ঘরটি যখন অফিসের কাজেও ব্যবহার করা হয়, তখন সেই জায়গাটি আর বিশ্রাম বা অন্তরঙ্গতার থাকে না। বরং তা মানসিক চাপ ও কাজের জায়গা হয়ে দাঁড়ায়। সোশ্যাল মিডিয়ায় টানা স্ক্রল করা এবং রাতে কাজের ইমেইলের নোটিফিকেশন আসা—সব মিলিয়ে প্রাপ্তবয়স্কদের স্নায়ুতন্ত্র সবসময় অতিরিক্ত সতর্ক অবস্থায় থাকে। ডিজিটাল কাজের কারণে তৈরি হওয়া এই উত্তেজনা থেকে বেরিয়ে শান্ত ও অন্তরঙ্গ অবস্থায় যাওয়া শারীরবৃত্তীয়ভাবে অত্যন্ত কঠিন। দম্পতিরা বিছানায় পাশাপাশি শুয়ে থাকলেও তাদের মুখে শুধু নিজ নিজ ডিভাইসের আলো এসে পড়ে। মাত্র কয়েক ইঞ্চি দূরে থাকা মানুষটির সাথে তাদের কোনো যোগাযোগই থাকে না।

অন্তরঙ্গতার এই মন্দার ফলাফল শুধু জন্মহার কমার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই। বরং এটি দীর্ঘস্থায়ী একাকীত্ব এবং শারীরিক স্পর্শের অভাবকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা একটি ক্রমবর্ধমান জনস্বাস্থ্য সংকট। শারীরিক স্নেহ শুধু জীবনযাত্রার কোনো পছন্দ নয়। এটি মানুষের স্নায়ুতন্ত্রকে ঠিক রাখার জন্য একটি প্রমাণিত জৈবিক প্রয়োজন। নিয়মিত শারীরিক অন্তরঙ্গতা শরীরের কর্টিসলের মাত্রা এবং রক্তচাপ কমায়। একইসাথে এটি অক্সিটোসিন হরমোন নিঃসরণ করে, যা মস্তিষ্ককে উদ্বেগ ও হতাশা থেকে রক্ষা করে। প্রাপ্তবয়স্করা যখন এই মৌলিক শারীরবৃত্তীয় প্রয়োজন থেকে বঞ্চিত হন, তখন তারা দৈনন্দিন জীবনের মানসিক চাপে খুব সহজেই বিপর্যস্ত হয়ে পড়েন। যুক্তরাষ্ট্রের সার্জন জেনারেল একাকীত্ব ও বিচ্ছিন্নতার মহামারির বিষয়ে স্পষ্টভাবে সতর্ক করেছেন। তিনি জানিয়েছেন, সামাজিকভাবে মারাত্মক বিচ্ছিন্ন থাকার ক্ষতিকর প্রভাব দিনে ১৫টি সিগারেট খাওয়ার সমান। এই বড় সংকটের মূল একটি কারণ হলো অন্তরঙ্গ স্পর্শের অভাব, যা নিয়ে প্রায়ই কথা বলা হয় না।

এই গভীর ঘাটতি মেটানোর জন্য সমাজ কীভাবে প্রাপ্তবয়স্কদের সম্পর্ককে মূল্যায়ন ও রক্ষা করে, তাতে মৌলিক পরিবর্তন আনা প্রয়োজন। সমাধানটি শুরু হতে হবে এই সাংস্কৃতিক উপলব্ধির মাধ্যমে যে, অন্তরঙ্গতা সম্পূর্ণ স্বাস্থ্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। ঘুম বা পুষ্টির মতো এটিকেও রক্ষা করা জরুরি। ব্যক্তিগত পর্যায়ে, ক্লিনিক্যাল সাইকোলজিস্টরা ঘরে প্রযুক্তির ব্যবহার কমানোর ওপর জোর দিচ্ছেন। তারা প্রাপ্তবয়স্কদের শোবার ঘর থেকে মোবাইল বা ল্যাপটপের মতো স্ক্রিন সরিয়ে ফেলতে বলছেন। যাতে এই জায়গাটি শুধু বিশ্রাম এবং সম্পর্কের জন্য ব্যবহার করা যায়। কাপল থেরাপিস্টরা পরামর্শ দিচ্ছেন, এই আধুনিক সমস্যায় ভোগা প্রাপ্তবয়স্কদের যৌন সম্পর্ক ছাড়াই নিছক শারীরিক স্নেহের জন্য সময় বের করা উচিত। এর মাধ্যমে পারফরম্যান্সের চাপ ছাড়াই পারস্পরিক স্বস্তি ও আস্থা ফিরিয়ে আনা সম্ভব। বৃহত্তর সামাজিক ক্ষেত্রে, কর্মক্ষেত্রে এমন নীতিমালা থাকা জরুরি যা কাজের সময়ের বাইরে বিচ্ছিন্ন থাকার অধিকারকে কঠোরভাবে রক্ষা করে। এর ফলে প্রাপ্তবয়স্করা তাদের সঙ্গীর সাথে সময় কাটানোর মতো মানসিক শক্তি পাবেন।

পরিশেষে, প্রাপ্তবয়স্কদের অন্তরঙ্গতার এই নীরব মন্দা কাটাতে আধুনিক জীবনের চলতি স্রোতের বিরুদ্ধে সচেতনভাবে দাঁড়ানো প্রয়োজন। আমরা এমন এক পরিবেশ তৈরি করেছি, যা আমাদের মনোযোগ সবসময় স্ক্রিন, অ্যালগরিদম এবং একটি অনিশ্চিত অর্থনীতির সীমাহীন চাহিদার দিকে টেনে নেয়। এমন পরিবেশে সত্যিকারের শারীরিক নৈকট্যকে প্রাধান্য দেওয়া এক ধরনের বড় প্রতিরোধ। এর জন্য একটি মানসিক প্রস্তুতি দরকার। ডিজিটাল ডিভাইসের নিরাপদ ও পরিচিত আনন্দটুকু বাদ দিয়ে অন্য একজন মানুষকে জানার অনিশ্চিত অথচ তৃপ্তিদায়ক অভিজ্ঞতার দিকে ঝুঁকতে হবে। শারীরিক বিচ্ছিন্নতার শূন্যতায় জীবনের ঝড় সামলানোর জন্য মানুষের স্নায়ুতন্ত্র তৈরি হয়নি। এই দুর্বলতা স্বীকার করে নেওয়াই হলো গভীরভাবে মানবিক সম্পর্ক ফিরে পাওয়ার প্রথম পদক্ষেপ। আধুনিক প্রাপ্তবয়স্কদের জীবন যে সম্পর্ককে নীরবে কেড়ে নিয়েছে।

Publication

The World Dispatch

Source: Editorial Desk

Category: Adult