দীর্ঘ জীবন দম্পতিদের ‘আমৃত্যু এক থাকার’ শপথ নিয়ে নতুন করে ভাবতে বাধ্য করছে
২৯ মার্চ, ২০২৬

বিয়ের চিরাচরিত শপথ, “মৃত্যু পর্যন্ত আমরা এক থাকব,” দীর্ঘদিন ধরে திருமணের রোমান্টিক ভিত্তি। শত শত বছর ধরে এই প্রতিশ্রুতির অর্থ ছিল ২০ বা ৩০ বছরের একটি সম্পর্ক, কারণ তখন মানুষের গড় আয়ু কম ছিল। কিন্তু আজ, সেই একই শপথের অর্থ হতে পারে ৫০, ৬০ বা এমনকি ৭০ বছরের একটি দীর্ঘ সম্পর্ক। আধুনিক চিকিৎসা ও জনস্বাস্থ্যের এই সাফল্য মানুষের গড় আয়ু অনেক বাড়িয়ে দিয়েছে। এই পরিবর্তন দীর্ঘমেয়াদী সম্পর্কের জন্য একটি নীরব এবং জটিল চ্যালেঞ্জ তৈরি করছে। এর ফলে, একজনের সঙ্গে চিরকাল জীবন কাটানোর অর্থ কী, তা নিয়ে নতুন করে ভাবতে হচ্ছে অনেককে।
বিংশ শতাব্দীর শুরুতে, বিশ্বজুড়ে মানুষের গড় আয়ু ছিল ৩০ বছরের কিছু বেশি। ২০২৩ সাল নাগাদ তা বেড়ে ৭৩ বছর ছাড়িয়ে গেছে। অনেক উন্নত দেশে মানুষের ৮০ বছর বা তার বেশি বয়স পর্যন্ত বেঁচে থাকা এখন সাধারণ ব্যাপার। আয়ু বৃদ্ধির এই বিপ্লব আধুনিক বিয়ের সম্ভাব্য সময়কালকে প্রায় দ্বিগুণ করে দিয়েছে। আজ যে দম্পতিরা কুড়ির দশকের শেষের দিকে বিয়ে করছেন, তারা একসঙ্গে অর্ধ শতাব্দীরও বেশি সময় কাটানোর আশা করতে পারেন। যদিও এটি একটি সমৃদ্ধ যৌথ ইতিহাস তৈরির সুযোগ দেয়, তবে এটি এমন চাপ এবং জটিলতাও তৈরি করে যা আগের প্রজন্মের মানুষদের মোকাবিলা করতে হয়নি। এর মূল সমস্যা শুধু একঘেয়েমি নয়, বরং দীর্ঘ সময় ধরে মানুষের ব্যক্তিগত চিন্তাভাবনা ও জীবনধারার গভীর পরিবর্তন।
২৫ বছর বয়সে আপনি যে মানুষ, ৪৫ বছর বয়সে সাধারণত সেই একই মানুষ থাকেন না, ৭৫ বছরের কথা তো বলাই বাহুল্য। দশকের পর দশক ধরে মানুষের পেশা বদলায়, নতুন শখ তৈরি হয়, রাজনৈতিক বা আধ্যাত্মিক বিশ্বাসে পরিবর্তন আসে এবং তাদের মূল মূল্যবোধও বদলে যায়। দীর্ঘ জীবন এ ধরনের নানা ব্যক্তিগত পরিবর্তনের সুযোগ করে দেয়। একটি আজীবনের সম্পর্কের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো, সম্পর্ক না ভেঙে এই পরিবর্তনগুলোর সঙ্গে মানিয়ে নেওয়া। যখন দুজন মানুষ দুটি ভিন্ন দিকে বদলাতে শুরু করে, তখন তাদের প্রাথমিক সম্পর্কের ভিত্তি দুর্বল হয়ে যেতে পারে। এর ফলে তারা একই ছাদের নিচে থেকেও নিজেদের অচেনা ভাবতে শুরু করে। সন্তান লালন-পালনের যৌথ দায়িত্ব প্রায়শই দম্পতিদের জীবনের মাঝের দশকগুলোতে এই ভিন্নতাকে আড়াল করে রাখে। কিন্তু সন্তানরা বাড়ি ছেড়ে চলে যাওয়ার পর, অনেক দম্পতি একটি নীরব বাড়িতে একে অপরের মুখোমুখি হন। তখন তাদের হাতে আরও ৩০ বছরের জীবন বাকি থাকলেও, সেই সময়টা কাটানোর মতো তেমন কোনো মিল খুঁজে পাওয়া যায় না।
এই বিষয়টি সামাজিক পরিসংখ্যানে স্পষ্টভাবে ফুটে উঠেছে। যদিও অনেক পশ্চিমা দেশে সামগ্রিক বিবাহবিচ্ছেদের হার স্থিতিশীল হয়েছে, বয়স্কদের মধ্যে বিচ্ছেদের হার বাড়ছে। পিউ রিসার্চ সেন্টারের গবেষণা অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রে ৫০ বা তার বেশি বয়সী মানুষদের মধ্যে বিবাহবিচ্ছেদের হার ১৯৯০-এর দশকের পর থেকে প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে। এই প্রবণতাটি “গ্রে ডিভোর্স” নামে পরিচিত। এটি থেকে বোঝা যায় যে, অনেকেই মনে করছেন একটি অতৃপ্তিকর সম্পর্কে আরও দুই বা তিন দশক কাটানো সম্ভব নয়। তাদের জন্য দীর্ঘ জীবন বিবাহিত জীবনের জন্য আশীর্বাদ নয়, বরং বাকি বছরগুলোতে ব্যক্তিগত সুখের সন্ধানে সম্পর্ক শেষ করার একটি কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
বিচ্ছেদের বিকল্প হিসেবে প্রায়শই দেখা যায় এক ধরনের নীরব মানসিক দূরত্ব। অনেক দীর্ঘমেয়াদী দম্পতি এমন একটি সম্পর্কে জড়িয়ে পড়েন, যাকে বিশেষজ্ঞরা "রুমমেট ম্যারেজ" বা সহবাসীর মতো দাম্পত্য বলেন। সেখানে তারা একসঙ্গে সংসার চালান এবং শান্তিতে থাকেন, কিন্তু তাদের মধ্যে সেই ঘনিষ্ঠতা, আবেগ এবং গভীর মানসিক সংযোগ থাকে না যা একসময় তাদের সম্পর্কের ভিত্তি ছিল। এর ফলে সম্পর্কের ভেতরেই এক ধরনের তীব্র একাকীত্ব তৈরি হতে পারে, যা খুবই যন্ত্রণাদায়ক। সম্পর্কের নিরাপত্তা হয়তো টিকে থাকে, কিন্তু এর প্রাণ হারিয়ে যায়। এই শূন্যতা মানুষের সার্বিক সুস্থতা এবং মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলে।
এর প্রতিক্রিয়ায়, সম্পর্ক বিশেষজ্ঞরা দাম্পত্য জীবনের সাফল্যের জন্য একটি নতুন ধারণার কথা বলছেন। এটি কোনো কাল্পনিক রোমান্টিক আদর্শের ওপর ভিত্তি করে নয়, বরং সচেতনভাবে সম্পর্ককে যত্ন করা এবং নতুন করে গড়ে তোলার ওপর জোর দেয়। তারা মনে করেন, একটি দীর্ঘমেয়াদী সম্পর্ককে নিজের মতো চলতে দেওয়া যায় না। পুরোনো লক্ষ্যগুলো শেষ হয়ে গেলে দম্পতিদের সচেতনভাবে নতুন যৌথ লক্ষ্য ও অভ্যাস তৈরি করতে হয়। এর মধ্যে থাকতে পারে একসঙ্গে নতুন কোনো শখ তৈরি করা, বড় কোনো ভ্রমণের পরিকল্পনা করা, বা এমন কোনো কাজ শুরু করা যা তাদের একসঙ্গে থাকার নতুন উদ্দেশ্য তৈরি করে। মূল কথা হলো, একসঙ্গে থাকার পুরোনো কারণগুলো ফুরিয়ে গেলে, নতুন করে একটি কারণ খুঁজে বের করা।
আপাতদৃষ্টিতে বিপরীত মনে হলেও, দীর্ঘ সময় একসঙ্গে থাকার জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো নিজেদের ব্যক্তিগত জীবনকে গুরুত্ব দেওয়া। একটি সুস্থ সম্পর্ক মানে দুজন মানুষ মিশে গিয়ে এক হয়ে যাওয়া নয়। বরং, দুজন সম্পূর্ণ মানুষ নিজেদের জীবনযাত্রা একসঙ্গে ভাগ করে নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। যখন সঙ্গীরা নিজেদের শখ, বন্ধুত্ব এবং ব্যক্তিগত উন্নতির জন্য উৎসাহ পান, তখন তারা সম্পর্কে আরও বেশি নতুনত্ব ও শক্তি নিয়ে আসেন। এটি সেই একঘেয়েমি কাটিয়ে উঠতে সাহায্য করে, যা কেবল একে অপরের জগৎ নিয়ে ব্যস্ত থাকলে তৈরি হতে পারে।
পরিশেষে, মানুষের আয়ু বৃদ্ধি প্রতিশ্রুতির ধারণাকে আরও গতিশীলভাবে দেখার দাবি জানায়। বিয়ের দিনে করা একটি স্থির প্রতিশ্রুতির পরিবর্তে, আধুনিক প্রতিশ্রুতি হলো একটি চলমান প্রক্রিয়া। এটি জীবনের প্রতিটি নতুন পর্যায়ে নিজের সঙ্গীকে বারবার বেছে নেওয়ার একটি সক্রিয় সিদ্ধান্ত। এই ধারণা স্বীকার করে যে দুজন মানুষই সময়ের সঙ্গে বদলাবে, এবং এর জন্য একে অপরকে নতুন করে চেনার মানসিকতা থাকা প্রয়োজন। আধুনিক বিয়ের এই চ্যালেঞ্জ কোনো ব্যর্থতার লক্ষণ নয়, বরং মানুষের আয়ু বাড়ানোর ক্ষেত্রে সমাজের সাফল্যেরই সরাসরি ফল। সফলভাবে এই পথ পাড়ি দেওয়ার অর্থ হলো "চিরকাল সুখে থাকার" অপরিবর্তনীয় ধারণাটি থেকে বেরিয়ে আসা। এর পরিবর্তে, জীবনের প্রতিটি অধ্যায়ে ভালোবাসা গড়ে তোলার জটিল, শ্রমসাধ্য, এবং শেষ পর্যন্ত আনন্দদায়ক কাজটি গ্রহণ করা।