বেঁচে থাকার তাগিদে যখন প্রবাসী পুরুষরা সেক্স ওয়ার্ক বেছে নেন
১ এপ্রিল, ২০২৬

মানুষ সাধারণত দেশান্তর বা মাইগ্রেশনকে খুব সহজভাবে দেখে। যেমন- সীমান্ত পার হওয়া, কোনো আশ্রয়ে ওঠা বা একটা কাজ পাওয়া। কিন্তু অনেক পুরুষ যারা সীমান্ত পার হয়ে অন্য দেশে যান, তাদের আসল সংগ্রাম শুরু হয় আরও পরে। বিশেষ করে যাদের বৈধ কাগজপত্র নেই। বাসা ভাড়া, ঋণ আর একাকীত্ব তাদের ঘিরে ধরে। অনেক বড় শহরে প্রবাসী পুরুষরা এখন আর শুধু নির্মাণ, কৃষি বা ডেলিভারির কাজে আয় করছেন না। এর বদলে তারা অর্থের বিনিময়ে সঙ্গ দিচ্ছেন। স্থানীয় ধনী ক্লায়েন্টদের জন্য তারা এরোটিক লেবার বা নানা ধরনের সেক্স ওয়ার্কে যুক্ত হচ্ছেন। এই বিষয়টিকে হয়তো সহজেই উপহাস করা যায়। কিন্তু বাস্তবতা এড়িয়ে যাওয়ার উপায় নেই। এটি এমন এক গল্প যেখানে কাজের বাজার বন্ধ, ক্ষমতার বৈষম্য প্রবল এবং বৈধ পথ বন্ধ হয়ে গেলে পুরুষদের বেঁচে থাকার জন্য কঠিন পথ বেছে নিতে হয়।
এটি কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। তবে এ নিয়ে সঠিক হিসাব খুব কমই পাওয়া যায়। আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা (ILO) অনেক দিন ধরেই সতর্ক করে আসছে যে, প্রবাসী শ্রমিকরা প্রায়ই এমন খাতে কাজ করেন যেখানে শোষণ বেশি আর তদারকি কম। জোরপূর্বক শ্রম ও যৌন শোষণের ঝুঁকিতে থাকা মানুষদের তালিকায় প্রবাসীরা বারবার উঠে এসেছেন। কারণ, তাদের সহজেই ডিপোর্ট বা দেশে ফেরত পাঠানোর ভয় দেখানো যায়। ভয় দেখিয়ে টাকা না দেওয়া বা ব্ল্যাকমেইল করাও সহজ। জাতিসংঘ (UNODC) জানিয়েছে, মানবপাচার ও যৌন শোষণের শিকার হিসেবে পুরুষ ও ছেলেদের প্রায়ই চিহ্নিত করা হয় না। কারণ, সাধারণ মানুষ ও প্রশাসন তাদের মূলত শ্রমিক বা অপরাধী হিসেবেই দেখে, ঝুঁকির মুখে থাকা মানুষ হিসেবে নয়। এই দেখার ভুলটা বড় একটা সমস্যা তৈরি করে। এটি দেশান্তরের এমন একটি অন্ধকার দিক ঢেকে রাখে, যা অনানুষ্ঠানিক শ্রম, জবরদস্তি এবং সম্মতির মাঝামাঝি জায়গায় থাকে।
ইউরোপের শহরগুলোতে সেক্স মার্কেট নিয়ে গবেষণা করা গবেষকরা দেখেছেন, বিদেশি পুরুষরা এসকর্ট সার্ভিস, বিভিন্ন অ্যাপ এবং নাইটলাইফ অর্থনীতিতে বেশ সক্রিয়। বিশেষ করে যেসব শহরে বাসা ভাড়া অনেক বেশি এবং প্রচুর পর্যটক বা প্রবাসী থাকেন, সেখানে এমনটা বেশি দেখা যায়। লাতিন আমেরিকা ও মধ্যপ্রাচ্যের কিছু অংশেও একই চিত্র দেখা গেছে। সেখানে গরিব দেশ থেকে আসা পুরুষরা বয়স্ক বা ধনী বিদেশি ক্লায়েন্ট কিংবা স্থানীয় ধনীদের অর্থের বিনিময়ে সঙ্গ দেন। এর ধরন নানা রকম হতে পারে। কেউ কেউ অনলাইনে সরাসরি বিজ্ঞাপন দেন। অনেকে বার, জিম, ক্লাব বা প্রাইভেট মেসেজিং গ্রুপের মাধ্যমে পরিচিত হন। কেউ কেউ এই কাজটিকে ডেটিং বা সঙ্গ দেওয়া হিসেবেই দেখেন। আবার অনেকেই একে সেক্স ওয়ার্ক বলতে নারাজ। কিন্তু এর পেছনের অর্থনৈতিক কারণটা খুবই স্পষ্ট। ঋণ, বৈধ কাগজপত্রের অভাব, ভাষার সমস্যা এবং সাধারণ কাজের সুযোগ না থাকায় তাদের সামনে বিকল্প খুব কমই থাকে।
প্রবাসী জীবনের গবেষণা থেকেই বোঝা যায় কেন এমনটা ঘটে। ওইসিডি (OECD) ভুক্ত দেশগুলোতে স্থানীয়দের তুলনায় বিদেশিদের অনিরাপদ কাজে যুক্ত হওয়ার আশঙ্কা বেশি। নতুন আসা প্রবাসীদের আয় ও সামাজিক মর্যাদা প্রায়ই দ্রুত নিচে নেমে যায়। যারা আশ্রয়প্রার্থী বা যাদের বৈধ কাগজ নেই, তাদের অবস্থা আরও খারাপ। অনেক দেশে আশ্রয়প্রার্থীদের বৈধভাবে কাজ করার আগে মাসের পর মাস অপেক্ষা করতে হয়। অন্যদের জন্য সাধারণ কাজের দরজা পুরোপুরি বন্ধ থাকে অথবা তারা এমন ভিসায় আটকা পড়েন যেখানে মালিক বদলানোর সুযোগ থাকে না। এমনকি যাদের কাজ করার অধিকার আছে, তাদের শিক্ষাগত যোগ্যতা বা অভিজ্ঞতারও অনেক সময় দাম দেওয়া হয় না। দেশে হয়তো একজন পুরুষ শিক্ষক, ড্রাইভার বা টেকনিশিয়ান ছিলেন। কিন্তু তিনি এমন এক শহরে পৌঁছালেন যেখানে তিনি বৈধভাবে কাজ করতে পারছেন না। কাগজপত্র ছাড়া ভাড়ায় থাকাও সম্ভব নয়। আর দ্রুত হাতে নগদ টাকা না পেলে পরিবারের কাছে টাকা পাঠানোরও কোনো উপায় থাকে না।
এই চাপ একসময় চরমে পৌঁছাতে পারে। বিশ্বব্যাংক ও আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থা (IOM) জানিয়েছে, প্রবাসীদের আয়ের ওপর অনেক পরিবার পুরোপুরি নির্ভরশীল। পরিবারের কাছে টাকা পাঠানো কোনো ছোটখাটো বিষয় নয়, বরং এটি একটি বড় দায়িত্ব। বিদেশ যাওয়ার খরচ জোগাতে পরিবারগুলো ধারদেনা করে। আত্মীয়রাও তাদের কাছ থেকে আর্থিক সাহায্য আশা করেন। একবার টাকা পাঠাতে না পারার মানে হলো, দেশে সন্তানের স্কুলের বেতন বকেয়া পড়া বা জরুরি ওষুধ কেনা আটকে যাওয়া। এই অবস্থায় সাময়িক কোনো আপস যে কখন দীর্ঘমেয়াদী নির্ভরতায় রূপ নেয়, তা টেরই পাওয়া যায় না। একজন প্রবাসী পুরুষ হয়তো একটি চুক্তির মাধ্যমে সম্পর্ক শুরু করেন। এরপর তিনি ধীরে ধীরে অর্থের বিনিময়ে ঘনিষ্ঠতার এই পেশায় জড়িয়ে পড়েন। কারণ, খাবার ডেলিভারি, দিনমজুরি বা রেস্তোরাঁর পেছনের কাজের চেয়ে এই কাজে দ্রুত বেশি টাকা পাওয়া যায়।
ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মগুলো এই কাজকে আরও সহজ করে দিয়েছে, আবার আড়ালেও রেখেছে। উবার বা ডেলিভারি অ্যাপগুলো যেমন যাতায়াত ও পার্সেল সেবাকে বদলে দিয়েছে, তেমনি সোশ্যাল ও ডেটিং অ্যাপগুলো অনানুষ্ঠানিক সেক্স মার্কেটে ঢোকা সহজ করে দিয়েছে। নতুন আসা একজন মানুষের শুধু একটি স্মার্টফোন, কিছু ছবি আর দরদাম করার মতো ভাষা জানা প্রয়োজন হয়। এখানে কোনো ম্যানেজার থাকে না, কোনো চুক্তিপত্র নেই এবং কোনো নির্দিষ্ট অফিসও নেই। একে হয়তো স্বাধীনতা মনে হতে পারে। কিন্তু বাস্তবে এটি পুরোপুরি উল্টো। আইনি সুরক্ষা না থাকায় এসব কর্মীদের টাকা চুরি হতে পারে, তারা হামলার শিকার হতে পারেন, ব্ল্যাকমেইলের মুখে পড়তে পারেন অথবা তাদের পাওনা টাকা আটকে দেওয়া হতে পারে। প্রবাসী পুরুষদের ঝুঁকি সবচেয়ে বেশি। কারণ, তারা খারাপ ক্লায়েন্টের চেয়ে পুলিশকে বেশি ভয় পান। যদি তাদের বৈধ কাগজ না থাকে, তবে থানায় গিয়ে অভিযোগ করার চেয়ে মুখ বুজে অপরাধ সহ্য করাকেই তারা নিরাপদ মনে করেন।
এর প্রভাব শুধু ব্যক্তির কষ্টের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে না। প্রথমত, সুরক্ষার অভাব এমন একটি বাজার তৈরি করে যেখানে শোষণ সহজেই বেড়ে যায়। ইউরোপোল ও মানবপাচার বিরোধী গোষ্ঠীগুলো বারবার সতর্ক করেছে যে, অপরাধী চক্রগুলো দুর্বল মানুষদের খুব দ্রুত টার্গেট করে। বিশেষ করে যাদের কাগজপত্র নেই, তাদের সহজেই নিয়ন্ত্রণ করা যায়। অর্থের বিনিময়ে সঙ্গ দেওয়া সব প্রবাসী পুরুষই যে পাচারের শিকার, তা কিন্তু নয়। তাদের নিজেদের ইচ্ছার বিষয়টিও অস্বীকার করা যাবে না। কিন্তু নিরাপদ অভিযোগ কেন্দ্র না থাকায় আড়ালে জবরদস্তি চলতে থাকে। দ্বিতীয়ত, স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থা অনেক সময় এই পুরুষদের নজরে আনে না। জনস্বাস্থ্য বিষয়ক কর্মসূচিগুলো সাধারণত সেক্স ওয়ার্কার নারী ও চিহ্নিত যৌন সংখ্যালঘু পুরুষদের দিকে বেশি মনোযোগ দেয়। কিন্তু যেসব প্রবাসী পুরুষ গোপনীয় চুক্তির মাধ্যমে এই কাজ করেন, তারা এই দুই ক্যাটাগরির বাইরে থেকে যান। অথচ তারা চরম সহিংসতা, খারাপ মানসিক স্বাস্থ্য এবং চিকিৎসা না হওয়া যৌন রোগের বড় ঝুঁকিতে থাকেন।
এর একটি বড় সামাজিক ক্ষতিও রয়েছে। সাধারণত মনে করা হয় যে, প্রবাসীরা দৃশ্যমান কাজের বাজারে ঢুকবেন এবং ভাষা শিখে, বাড়ি ভাড়া নিয়ে ও কর দিয়ে স্বাভাবিক জীবনে অভ্যস্ত হবেন। কিন্তু প্রবাসী পুরুষরা যখন বেঁচে থাকার জন্য আড়ালে থেকে এসব কাজ করেন, তখন তারা এসব ব্যবস্থার বাইরেই থেকে যান। তারা হয়তো টাকা আয় করেন, কিন্তু দিন দিন আরও একা হয়ে পড়েন। এখানে লজ্জা একটি বড় বিষয়। নিজের দেশ ও নতুন দেশের পুরুষালী মানসিকতার কারণে তারা এই কাজের কথা কাউকে বলতে পারেন না। একজন পুরুষ হয়তো পরিবারকে জানান যে তিনি রেস্তোরাঁয় কাজ করেন। অথচ বাস্তবে তিনি টুকটাক সেক্স ওয়ার্ক করে বেঁচে আছেন। এই গোপনীয়তা তাদের হতাশাকে আরও বাড়িয়ে দেয় এবং এই পেশা থেকে বেরিয়ে আসাকে কঠিন করে তোলে।
এর সঠিক সমাধান কোনো নৈতিক আতঙ্ক ছড়ানো নয়। বরং কাজের বাজারের বাস্তবতা মেনে নেওয়া। সরকার যদি না চায় যে প্রবাসীরা সেক্স ইকোনমিতে যুক্ত হোক, তবে তাদের সেই অসহায়ত্ব দূর করতে হবে। আশ্রয়প্রার্থীদের জন্য দ্রুত বৈধ কাজের সুযোগ তৈরি করাটা কাজে দিতে পারে। বিদেশিদের যোগ্যতা ও অভিজ্ঞতার সঠিক মূল্যায়ন করা প্রয়োজন। পাশাপাশি, সাধারণ কাজগুলো থেকে প্রবাসীদের দূরে ঠেলে দেওয়া মজুরি চুরির বিরুদ্ধে কড়া ব্যবস্থা নিতে হবে। শহরগুলো স্বল্প খরচে আইনি সহায়তা ও পরিচয় গোপন রেখে অভিযোগ করার ব্যবস্থা করতে পারে। এতে কাগজপত্রহীন মানুষরা ইমিগ্রেশনের ভয় ছাড়াই হামলা বা চাঁদাবাজির অভিযোগ করতে পারবেন। স্বাস্থ্যসেবার ধারণাও বদলাতে হবে। ক্লিনিক ও এনজিওগুলোর উচিত এটা মেনে নেওয়া যে, অনেক পুরুষ, এমনকি হেটেরোসেক্সুয়াল (বিষমকামী) প্রবাসী পুরুষরাও সেক্স ওয়ার্কে যুক্ত আছেন এবং তাদের জন্য বিশেষায়িত সেবা প্রয়োজন।
ইমিগ্রেশন নীতি প্রায়ই ব্যর্থ হয়। কারণ, এটি শুধু নিয়ন্ত্রণের ভাষায় কথা বলে, কিন্তু বেঁচে থাকার অর্থনীতির হিসাব মেলায় না। কোনো শহর যদি নতুন আসা মানুষদের বৈধ কাজ করতে না দেয়, খারাপ বাড়িওয়ালাদের প্রশ্রয় দেয়, দালালদের প্রতারণার সুযোগ দেয় এবং তাদের পুলিশের ভয়ে তটস্থ রাখে, তবে কিছু মানুষ তাদের শরীরের বিনিময়ে আয় করলে অবাক হওয়ার কিছু নেই। এটি শুধু সেক্স বা যৌনতার গল্প নয়, এটি সমাজ থেকে ছিটকে পড়ার গল্প।
"প্রবাসী পুরুষরা জিগোলো হয়ে যায়"—কথাটি বলে সহজেই হয়তো কাউকে বিচার করা যায়। এটি এমন একটা ধারণা দেয় যেন তারা শখ করে এটা করছে এবং এতে কোনো বিপদ নেই। কিন্তু এই প্রচলিত ধারণার বাইরে বের হলে ভিন্ন এক চিত্র চোখে পড়ে। কাজের বাজার থেকে ছিটকে পড়া মানুষগুলো যখন আড়ালে চলে যান, তখন ঠিক এই অবস্থাই তৈরি হয়। দেশান্তরের আলোচনা সাধারণত সীমান্তে গিয়ে শুরু হয়। কিন্তু এই মানুষদের আসার পরে কী ঘটে, তা নিয়ে আরও বেশি ভাবা উচিত। যখন নতুন জীবনের স্বপ্নের সাথে কাজ ও বাসস্থানের বন্ধ দরজাগুলোর ধাক্কা লাগে, তখন কিছু পুরুষ টিকে থাকার জন্য বাধ্য হয়ে এই পথ বেছে নেন। একটি দায়িত্বশীল সমাজের শুধু তারা কী করছে তা দেখা উচিত নয়, বরং কেন তাদের সামনে অন্য কোনো পথ খোলা ছিল না, সেই প্রশ্নটি তোলা উচিত।