নাৎসি মিথের ব্যবসা আজও জমজমাট
১৬ এপ্রিল, ২০২৬
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে নাৎসিদের নিয়ে মিথ্যার ব্যবসা শেষ হয়নি, বরং নতুন রূপ পেয়েছে। ষড়যন্ত্র তত্ত্ব, গোপন নথি আর পপ কালচার ব্যবহার করে এক পরাজিত শক্তিকে মুনাফার মেশিনে পরিণত করা হয়েছে।
থার্ড রাইখ যুদ্ধে হেরেছিল, কিন্তু সাধারণ মানুষের কল্পনা থেকে তারা কখনও মুছে যায়নি। এটা কোনো দুর্ঘটনা নয়। আধুনিক ইতিহাসে এটাই সম্ভবত সবচেয়ে সফল 'পুনর্জন্ম'। বার্লিনের বাঙ্কারে হিটলারের মৃত্যুর আট দশক পরেও, নাৎসিদের নিয়ে নানা মিথ আজও বই বিক্রি করছে, ভিডিও ফিড কাঁপাচ্ছে, ডকুমেন্টারি বানাচ্ছে এবং রাজনৈতিক ষড়যন্ত্র তত্ত্বকে উস্কে দিচ্ছে। আসল কথা এটা নয় যে মানুষ দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ নিয়ে অদ্ভুত সব জিনিস বিশ্বাস করে। আসল কথা হলো, এই পরাজিত শক্তিটি কীভাবে ষড়যন্ত্র তৈরির এক স্থায়ী কারখানায় পরিণত হলো।
শুরু করা যাক সবচেয়ে জনপ্রিয় গুজবটি দিয়ে: হিটলার পালিয়ে গিয়েছিলেন। ঐতিহাসিকরা দশক ধরে এই দাবিকে ভুল প্রমাণ করার চেষ্টা করেছেন। ১৯৪৫ সালে সোভিয়েত সেনারা বার্লিনে তার দেহাবশেষ খুঁজে পায়। পরবর্তীকালে ফরেনসিক পরীক্ষায়ও এর প্রমাণ মিলেছে। ২০১৮ সালে ফরাসি গবেষকরা হিটলারের দাঁত পরীক্ষা করে নিশ্চিত করেন যে তিনি সেখানেই মারা গিয়েছিলেন। তবুও, তার পালিয়ে যাওয়ার গল্পটি আজও বেঁচে আছে। কেন? কারণ বিশৃঙ্খলা কল্পনার জন্ম দেয়। যুদ্ধের পর সোভিয়েত ইউনিয়ন নিজেরাই ধোঁয়াশা তৈরি করেছিল। স্তালিন নিজে ইঙ্গিত দিয়েছিলেন যে হিটলার হয়তো পালিয়ে গেছেন। এই ধোঁয়াশাটাই ছিল গুরুত্বপূর্ণ। যখনই কোনো গল্পে সরকারি গোপনীয়তা ঢুকে পড়ে, তখনই ষড়যন্ত্র তত্ত্বের কারবারিরা ঝাঁপিয়ে পড়ে।
এরপর সামনে আসে বিভিন্ন ফাইল। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে সিআইএ এবং এফবিআই-এর প্রকাশ করা কিছু গোপন নথি নিয়ে আবার হইচই শুরু হয়। এই নথিগুলোতে নাৎসি নেতাদের দক্ষিণ আমেরিকায় দেখা যাওয়ার গুজব বা রিপোর্টের কথা উল্লেখ ছিল। কিন্তু গোয়েন্দা ফাইল মানেই প্রমাণ নয়। এগুলো প্রায়শই বিভিন্ন দাবি, গুজব বা এমন তথ্যের সংগ্রহ যা দিয়ে কিছুই প্রমাণ হয় না। অনলাইনে এই পার্থক্যটা হারিয়ে যায়। একটা সাধারণ মেমো হয়ে যায় 'বোমা ফাটানো' তথ্য। একটা গুজব হয়ে যায় 'ধামাচাপা' দেওয়ার চেষ্টা। শেষে যা টিকে থাকে তা প্রমাণ নয়, কেবল একটা আবহ। সন্দেহই এখানে আসল পণ্য।
এইসব মিথের কেন্দ্রে দক্ষিণ আমেরিকা থাকার একটা কারণ আছে। কিছু নাৎসি সত্যি সেখানে পালিয়েছিল। ১৯৬০ সালে ইসরায়েল আর্জেন্টিনা থেকে অ্যাডলফ আইখম্যানকে গ্রেপ্তার করে। জোসেফ মেঙ্গেলে দক্ষিণ আমেরিকায় বছরের পর বছর পালিয়ে বেড়িয়েছিলেন। গবেষক এবং আর্কাইভের নথি থেকে জানা যায়, নাৎসিদের ইউরোপ থেকে পালাতে সাহায্য করার জন্য কিছু গোপন পথ ছিল। এই পথগুলো প্রায়ই ইতালি হয়ে যেত এবং সহানুভূতিশীল কিছু গোষ্ঠী তাদের সাহায্য করত। যুদ্ধ পরবর্তী দুর্বল প্রশাসনও এর জন্য দায়ী। এই কঠিন সত্যটাই আরও ভয়ঙ্কর সব দাবির জন্ম দিয়েছে। যখন কিছু দানব সত্যিই পালিয়ে গেল, তখন মানুষ বিশ্বাস করতে শুরু করল যে সবাই হয়তো পালিয়েছে।
একইভাবে নাৎসিদের 'আশ্চর্যজনক অস্ত্র' বা 'wonder weapons' নিয়ে বাড়াবাড়ি শুরু হয়। জার্মানি সত্যিই কিছু উন্নত সামরিক প্রযুক্তি তৈরি করেছিল। ভি-২ রকেট সত্যি ছিল। জেট বিমানও সত্যি ছিল। রাইখের অধীনে কাজ করা ইঞ্জিনিয়াররা পরে যুক্তরাষ্ট্র এবং সোভিয়েত ইউনিয়নের কোল্ড ওয়ার প্রোগ্রামে যোগ দেন। 'অপারেশন পেপারক্লিপ' কোনো গুজব নয়। এই অভিযানের মাধ্যমেই যুক্তরাষ্ট্র ভার্নার ফন ব্রাউনের মতো জার্মান বিজ্ঞানীদের আমেরিকায় নিয়ে আসে। এটা একটা ঐতিহাসিক সত্য। আর এটাই বাড়িয়ে বলার সুযোগ করে দেয়। বাস্তবের এই নৈতিক আপোস থেকেই জন্ম নেয় অ্যান্টার্কটিকার গোপন ঘাঁটি, উড়ন্ত সসার বা লুকিয়ে রাখা সুপার-সায়েন্সের মতো কল্পনা। সত্যিটা এমনিতেই যথেষ্ট ভয়ঙ্কর ছিল, কিন্তু মিথ্যার বাজারের চাহিদা সবসময় আরও বেশি।
এই বিষয়গুলো গুরুত্বপূর্ণ, কারণ নাৎসিদের নিয়ে তৈরি মিথ বর্তমান রাজনীতিতে প্রভাব ফেলে। এটা ইতিহাসকে একটা তামাশায় পরিণত করে এবং দায়বদ্ধতা মুছে দেয়। একটি আধুনিক রাষ্ট্র কীভাবে আমলাতন্ত্র, প্রোপাগান্ডা, শিল্প এবং সাধারণ মানুষের সহযোগিতায় গণহত্যা চালিয়েছিল— সেই দিকে মনোযোগ না দিয়ে, মিথগুলো আমাদের মনোযোগ ঘুরিয়ে দেয় গোপন সুড়ঙ্গ, হারানো সোনা, আশ্চর্য মেশিন বা ভুয়া মৃত্যুর ষড়যন্ত্রের দিকে। এটা ইতিহাসকে নাটকীয়ভাবে বদলে দেয়। খারাপ শক্তিকে আকর্ষণীয়, রহস্যময় এবং অদ্ভুতভাবে দক্ষ হিসেবে দেখানো হয়। এটা একটা বিপজ্জনক মিথ্যা।
আসল কঠিন সত্যিটা পরিসংখ্যানে লুকিয়ে আছে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে কোটি কোটি মানুষ মারা যায়। হলোকাস্টে ৬০ লক্ষ ইহুদিকে হত্যা করা হয়েছিল। এছাড়াও নাৎসিদের শিকার হয়েছিলেন আরও লক্ষ লক্ষ মানুষ। এটা কোনো অতিপ্রাকৃত শক্তির কাজ ছিল না। এটা ছিল বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান, কাগজের নথি, রেল ব্যবস্থা, অনুগত মন্ত্রণালয় এবং সেইসব মানুষের কাজ, যারা হয় মুখ ফিরিয়ে নিয়েছিল অথবা এতে যোগ দিয়েছিল। ষড়যন্ত্র তত্ত্বে বিশ্বাসীরা ঠিক এই শিক্ষাটাই ঘৃণা করে। প্রকাশ্যে হওয়া অপরাধের চেয়ে কাল্পনিক কোনো সমাপ্তি নিয়ে ভাবা অনেক বেশি আরামদায়ক।
তাই নাৎসি মিথের বাজার আজও জমজমাট। এটা পাঠকদের 'গোপন কিছু জানার' রোমাঞ্চ দেয়। চরমপন্থীরা এখান থেকে নিজেদের প্রতীক খুঁজে নেয়। মিডিয়া কোম্পানিগুলো সস্তায় ক্লিক জোগাড় করে। আর এর মাধ্যমে গোটা বিশ্ব দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সবচেয়ে ভয়ঙ্কর সত্যিটা এড়িয়ে যায়। সবচেয়ে ভয়ের বিষয় এটা নয় যে নাৎসিরা রহস্যময় ছিল। সবচেয়ে ভয়ের বিষয় হলো, তারা ছিল ভয়ঙ্করভাবে আধুনিক।
Source: Editorial Desk