দেশ ছাড়ছে ইরানের তরুণ প্রজন্ম, তৈরি হচ্ছে বড় সংকট

১৫ এপ্রিল, ২০২৬

দেশ ছাড়ছে ইরানের তরুণ প্রজন্ম, তৈরি হচ্ছে বড় সংকট

ইরান থেকে শুধু যুদ্ধ বা নির্যাতনের ভয়েই মানুষ পালাচ্ছে না। আসল সংকট হলো ছাত্র, পেশাজীবী এবং সাধারণ পরিবারগুলোর নিয়মিত দেশত্যাগ। তারা মনে করছেন, ইরানে আর থাকার মতো ভবিষ্যৎ নেই।

ইরান থেকে অভিবাসনের বিষয়ে একটি গতানুগতিক ধারণা প্রচলিত আছে। সেটি হলো, মূলত দমন-পীড়ন বা রাজনৈতিক সংঘাতের কারণে হঠাৎ করেই মানুষ দেশ ছাড়ে। কিন্তু এই ধারণাটি আসল চিত্র তুলে ধরে না। ইরানের আসল অভিবাসন সংকট আরও গভীর এবং ধীরগতির। এটি দেশের ভবিষ্যতের জন্য আরও বেশি বিপজ্জনক। ব্যাপারটা শুধু সীমান্তে আশ্রয়প্রার্থীদের ভিড় নয়। এর মধ্যে রয়েছে ছাত্রছাত্রীরা, যারা পড়তে গিয়ে আর ফিরছে না। রয়েছেন ডাক্তার ও নার্সরা, যারা বিদেশে চাকরির সন্ধান করছেন। প্রকৌশলী, শিক্ষাবিদ, দক্ষ কর্মী এবং মধ্যবিত্ত পরিবারগুলোও দেশ ছাড়ছে। তারা কঠিন হিসাব কষেই এই সিদ্ধান্তে আসছে—বিদেশের জীবন হয়তো কঠিন হবে, কিন্তু দেশের জীবন স্থবির মনে হচ্ছে।

এই চিত্রটি কোনো অনুমান নয়। বছরের পর বছর ধরে বিভিন্ন ডেটা, বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিসংখ্যান এবং শ্রমিকের ঘাটতিতে এটা স্পষ্ট। এমনকি ইরানের কর্মকর্তা এবং বিশেষজ্ঞরা নিজেরাই ‘মেধা পাচার’ নিয়ে বারবার সতর্ক করেছেন। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (IMF) একসময় শিক্ষিত জনগোষ্ঠীর দেশত্যাগের কারণে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলোর তালিকায় ইরানকে রেখেছিল। এই বিষয়ে সঠিক সংখ্যা পাওয়া কঠিন, তাই যেকোনো পরিসংখ্যান সতর্কতার সাথে দেখা উচিত। কিন্তু মূল চিত্রটি নিয়ে কোনো সন্দেহ নেই। ইরান বহু বছর ধরে বিপুল সংখ্যক উচ্চশিক্ষিত তরুণ তৈরি করেছে। কিন্তু একই সাথে দেশটি নিষেধাজ্ঞা, মুদ্রাস্ফীতি, দুর্বল কর্মসংস্থান, রাজনৈতিক সীমাবদ্ধতা এবং জনগণের গভীর হতাশার সাথে লড়াই করছে। এই পরিস্থিতিই মানুষকে দেশ ছাড়তে বাধ্য করছে।

এই অভিবাসনের গল্প শুধু উচ্চবিত্তদের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। ইরানের জনসংখ্যা প্রায় ৮ কোটি ৯০ লাখ। আঞ্চলিক মানদণ্ডে এটি একটি অপেক্ষাকৃত তরুণ ও শিক্ষিত সমাজ। কিন্তু দেশের অর্থনীতি বছরের পর বছর ধরে বিপর্যস্ত। বারবার মুদ্রাস্ফীতির কারণে মানুষের সঞ্চয় এবং বেতন কমে গেছে। সময়ের সাথে সাথে জাতীয় মুদ্রার মানে বড় ধরনের পতন হয়েছে। তরুণদের মধ্যে বেকারত্ব একটি দীর্ঘস্থায়ী সমস্যা। যাদের চাকরি আছে, তাদের জন্যও সমস্যা শুধু আয় নিয়ে নয়। মূল সমস্যা হলো স্থিতিশীলতা, মর্যাদা এবং এই বিশ্বাস যে পরিশ্রম করলে জীবনে এগোনো যাবে। যখন এই বিশ্বাস ভেঙে যায়, তখন দেশত্যাগ আর স্বপ্ন থাকে না, বেঁচে থাকার কৌশল হয়ে দাঁড়ায়।

তথ্যপ্রমাণ বলছে, শুধু খুব ধনী বা খুব মরিয়া মানুষই দেশ ছাড়ছে না। ভিসার কড়াকড়ি এবং রাজনৈতিক বাধা সত্ত্বেও তুরস্ক, জার্মানি, কানাডা, ইতালি এবং যুক্তরাষ্ট্রের মতো দেশগুলোর বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে ইরানি শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি চোখে পড়ার মতো। OECD এবং UNESCO-এর ডেটাও বছরের পর বছর ধরে ইরান থেকে শিক্ষার্থীদের বিদেশে যাওয়ার এই প্রবণতা তুলে ধরেছে। তাদের মধ্যে কেউ কেউ দেশে ফেরে, কিন্তু অনেকেই ফেরে না। এটি গুরুত্বপূর্ণ, কারণ শিক্ষার্থীদের অভিবাসনই স্থায়ীভাবে দেশত্যাগের সবচেয়ে সহজ পথ। এটি আইনসম্মত, সুশৃঙ্খল এবং যুক্তিসঙ্গত। একই সাথে এটি দেশের অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতির একটি নীরব অভিযোগ।

ডাক্তারদের দেশত্যাগ আরেকটি সতর্ক সংকেত। ইরানের গণমাধ্যম এবং পেশাজীবী সংগঠনগুলো বারবার চিকিৎসকদের, বিশেষ করে বিশেষজ্ঞ এবং তরুণ ডাক্তারদের দেশ ছাড়ার প্রবণতা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। নার্সদের অভিবাসনও মনোযোগ আকর্ষণ করেছে। অবশ্য এটা শুধু ইরানের সমস্যা নয়। সারা বিশ্বেই স্বাস্থ্যকর্মীরা এক দেশ থেকে অন্য দেশে যান। কিন্তু অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক চাপে থাকা একটি দেশের জন্য প্রশিক্ষিত চিকিৎসাকর্মী হারানো কোনো সাধারণ বিষয় নয়। এটি দেশের সরকারি সেবার সক্ষমতার ওপর একটি বড় আঘাত। একজন ডাক্তার তৈরি করতে বছরের পর বছর সময় লাগে। তার বিকল্প রাতারাতি তৈরি করা যায় না। যখন বিপুল সংখ্যক স্বাস্থ্যকর্মী দেশ ছেড়ে চলে যান, তখন সাধারণ মানুষকে তার মূল্য দিতে হয়। তাদের দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে হয়, দুর্বল সেবা পেতে হয় এবং যারা ব্যক্তিগতভাবে চিকিৎসার খরচ বহন করতে পারে এবং যারা পারে না, তাদের মধ্যে বৈষম্য আরও গভীর হয়।

কেন এমন হচ্ছে? এর একটি বড় কারণ নিষেধাজ্ঞা। কিন্তু নিষেধাজ্ঞা-ই একমাত্র কারণ বলাটা সত্যকে এড়িয়ে যাওয়া। নিষেধাজ্ঞার কারণে বিনিয়োগ বন্ধ হয়েছে, ব্যাংকগুলো বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে, বাণিজ্য ব্যাহত হয়েছে এবং দৈনন্দিন অর্থনৈতিক পরিকল্পনা চালানো কঠিন হয়ে পড়েছে। এটা বাস্তব। এর ফলে সাধারণ পরিবারগুলো ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এবং সুযোগ কমে গেছে। কিন্তু অভ্যন্তরীণ প্রশাসনিক ব্যর্থতাও এর জন্য দায়ী। দুর্নীতির অভিযোগ, অস্বচ্ছ প্রতিষ্ঠান, রাজনৈতিক দমন-পীড়ন, ইন্টারনেট ব্যবহারে বিধিনিষেধ—এই সবই পরিস্থিতিকে আরও খারাপ করেছে। তরুণ ইরানিরা এই ব্যবস্থাকে একটি রুদ্ধ এবং শাস্তিমূলক ব্যবস্থা হিসেবে দেখে। মানুষ শুধু দরিদ্র হলেই দেশ ছাড়ে না। যখন তারা মনে করে যে উন্নতির সব পথ বন্ধ, তখনও তারা দেশ ছাড়ে।

এই কারণেই অভিবাসনের সবচেয়ে বড় সংকেত রাজনৈতিক আশ্রয় চাওয়া নয়, বরং দেশ ছাড়ার ইচ্ছা। বিভিন্ন জরিপ এবং আলোচনা থেকে দেখা গেছে, ইরানি তরুণদের মধ্যে বিদেশে পড়াশোনা, কাজ করা বা স্থায়ীভাবে বসবাসের প্রতি প্রবল আগ্রহ রয়েছে। অবশ্য যেকোনো জরিপের ফল সতর্কতার সাথে বিবেচনা করা উচিত, বিশেষ করে রাজনৈতিকভাবে সংবেদনশীল পরিবেশে। কিন্তু এর ফলাফল বিশ্ববিদ্যালয়, নিয়োগকারী সংস্থা এবং বিভিন্ন দেশের তথ্যের সাথে মিলে যায়। একটি দেশ কষ্ট সহ্য করতে পারে। কিন্তু ভবিষ্যতের প্রতি গণঅনাস্থা একটি দেশকে ভেতর থেকে শেষ করে দেয়।

এর পরিণতি গুরুতর, এবং তা শুধু ইরানের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। যেসব দেশে এই মানুষগুলো যাচ্ছে, তারা প্রায়শই উপকৃত হয়। কানাডা, জার্মানি, অস্ট্রেলিয়া, যুক্তরাজ্য এবং অন্যান্য দেশগুলো দক্ষ অভিবাসী পায়, যারা উচ্চশিক্ষিত এবং উদ্যমী। এটা তাদের জন্য ভালো। আমাদের এটা অস্বীকার করার কোনো কারণ নেই। মেধাবীদের জন্য রাষ্ট্রগুলো প্রতিযোগিতা করে, এবং এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু এখানে একটি বড় ভারসাম্যহীনতা রয়েছে। যে দেশগুলো আগে থেকেই চাপে আছে, তারা তাদের সেরা মানুষদের হারাচ্ছে, যারা কিনা দেশ পুনর্গঠনে সবচেয়ে বেশি সক্ষম। এর ফল একটি দুষ্টচক্র: দুর্বল প্রতিষ্ঠানগুলো মানুষকে দেশ ছাড়তে বাধ্য করে, এবং মেধা চলে যাওয়ায় প্রতিষ্ঠানগুলো আরও দুর্বল হয়ে পড়ে।

এই সংকটের একটি মানবিক দিকও রয়েছে, যা প্রায়শই উপেক্ষা করা হয়। ইরান থেকে যারা চলে যাচ্ছে, তারা সবাই দক্ষ কর্মী বা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তির চিঠি পাওয়া শিক্ষার্থী নয়। এর মধ্যে এমন অনেক আফগান নাগরিকও রয়েছেন, যারা আগে ইরানে আশ্রয় নিয়েছিলেন। এখন তারা নতুন করে অস্থিতিশীলতা, দারিদ্র্য বা নির্বাসনের চাপের মুখে পড়েছেন। জাতিসংঘের সংস্থাগুলোর মতে, ইরান কয়েক দশক ধরে বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ আফগান শরণার্থী জনগোষ্ঠীকে আশ্রয় দিয়ে আসছে। এর ফলে আবাসন, স্কুল এবং অন্যান্য সেবার ওপর প্রচণ্ড চাপ সৃষ্টি হয়েছে। বিশেষ করে ২০২১ সালে তালেবানের ক্ষমতা দখলের পর আফগানিস্তানের সংকট আরও গভীর হওয়ায় এই চাপ আরও বেড়েছে। সুতরাং, ইরান শুধু অভিবাসীর উৎস দেশ নয়, এটি একটি প্রধান আশ্রয়দাতা এবং ট্রানজিট দেশও। এই কারণে ইরানের অভিবাসন বাস্তবতা স্লোগানের চেয়ে অনেক বেশি জটিল।

এই জটিলতা বিদেশের নীতিনির্ধারকদের জন্য একটি কঠিন সত্য তুলে ধরে। ইরানকে শুধু একটি নিরাপত্তা সমস্যা হিসেবে দেখা কৌশলগতভাবে একটি ভুল। অভিবাসন নীতিকে শুধু সীমান্ত নিয়ন্ত্রণ এবং ভিসা যাচাইয়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখা যায় না। ইউরোপীয় এবং অন্যান্য দেশের সরকারগুলো যদি বিপজ্জনক ও অবৈধ অভিবাসন কমাতে চায়, তবে তাদের পড়াশোনা, কাজ এবং পরিবারের সাথে মিলিত হওয়ার জন্য আরও বেশি আইনি পথ তৈরি করতে হবে। তারা যদি আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা চায়, তবে তাদের বুঝতে হবে যে একটি সমাজকে অর্থনৈতিকভাবে পিষে ফেলার চেষ্টা করা এবং একই সাথে সেখানকার মেধাবী মানুষদের দেশে ধরে রাখার আশা করা একটি কল্পনা মাত্র। কিছু চাপ হয়তো রাষ্ট্রের আচরণ পরিবর্তন করতে পারে। কিন্তু ব্যাপক অর্থনৈতিক চাপ একটি দেশকে ভেতর থেকে ফাঁপা করে দিতে পারে এবং দেশত্যাগ আরও ত্বরান্বিত করতে পারে।

ইরানের কর্তৃপক্ষের জন্য শিক্ষাটি আরও কঠোর। গ্রেফতার করে বা ভয় দেখিয়ে মেধা পাচার বন্ধ করা যায় না। তরুণদের একদিকে উন্নত জীবন থেকে বঞ্চিত করে এবং তাদের মৌলিক স্বাধীনতা সীমিত করে, অন্যদিকে তাদের দেশে থাকার জন্য বক্তৃতা দিয়ে কোনো লাভ হবে না। রাষ্ট্র বৃত্তি বাড়াতে পারে, গুরুত্বপূর্ণ পেশায় বেতন উন্নত করতে পারে, ব্যবসার বাধা কমাতে পারে এবং গবেষণার জন্য ভালো পরিবেশ তৈরি করতে পারে। এছাড়াও, রাজনৈতিক চাপ কমানো যেতে পারে, যা শিক্ষিত নাগরিকদের নিজেদের নজরদারিতে থাকা, বন্দী বা অপ্রয়োজনীয় ভাবতে বাধ্য করে। এগুলোর কোনোটিই অস্বাভাবিক দাবি নয়। এগুলো রাষ্ট্র পরিচালনার মৌলিক বিষয়। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনক ব্যাপার হলো, এসব পদক্ষেপ নেওয়ার চেয়ে মানুষকে দেশ ছেড়ে চলে যেতে দেখাটা রাজনৈতিকভাবে সহজ মনে হয়।

অভিবাসন বললেই সাধারণত একটি ভিড়ে ঠাসা নৌকা বা কাঁটাতারের বেড়ার ছবি চোখে ভাসে। এই ছবিগুলো বাস্তব এবং গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু ইরানের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অভিবাসনের গল্পটি হয়তো এর চেয়েও নীরব। সেই গল্পটি বিমানবন্দরের ডিপার্চার লাউঞ্জে, দূতাবাসের লাইনে, ভাষা শেখার ক্লাসে বা একটি পরিবারে দেশ ছাড়া বা থেকে যাওয়ার বিতর্কের মধ্যে লুকিয়ে আছে। একটি দেশ তার ভবিষ্যৎ কোনো একটি নাটকীয় মুহূর্তে হারায় না। কখনো কখনো প্রতিটি আবেদনের সাথে একটু একটু করে সে তার ভবিষ্যৎ হারায়।

Source: Editorial Desk

Publication

The World Dispatch

Source: Editorial Desk

Category: Migration