জঙ্গিদের অর্থায়ন: আঞ্চলিক ক্ষমতার লড়াইয়ের নতুন হাতিয়ার

১ এপ্রিল, ২০২৬

জঙ্গিদের অর্থায়ন: আঞ্চলিক ক্ষমতার লড়াইয়ের নতুন হাতিয়ার

ইসলামি জঙ্গি গোষ্ঠীগুলোকে নিয়ে সাধারণ মানুষের ধারণা খুব সহজ। বলা হয়, টাকার সুটকেস, গোপন দাতা বা কালোবাজারির অর্থে এরা চলে। এই চিত্র ভুল নয়, তবে অসম্পূর্ণ। সবচেয়ে বড় সত্যি হলো, জঙ্গিদের অর্থায়ন এখন বড় মাপের ভূ-রাজনৈতিক লড়াইয়ের অংশ। মধ্যপ্রাচ্য, আফ্রিকা আর দক্ষিণ এশিয়ায় লড়াইটা এখন আর শুধু যুদ্ধক্ষেত্রে আটকে নেই। বরং ব্যাংক, চ্যারিটি, বাণিজ্য পথ, ডিজিটাল পেমেন্ট এবং হুন্ডির মতো অনানুষ্ঠানিক নেটওয়ার্কগুলো নিয়ন্ত্রণের লড়াইও সমান জরুরি। কারণ এগুলোই জঙ্গিদের টিকে থাকার রসদ জোগায়।

এই পরিবর্তনটা গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, টাকা এখন শুধু অপরাধের বিষয় নয়। এটি এখন আঞ্চলিক প্রভাব বিস্তার আর রাষ্ট্র পরিচালনার হাতিয়ার। সরকারগুলো তাদের প্রতিদ্বন্দ্বীদের চাপে ফেলতে এই আর্থিক নিয়ন্ত্রণ ব্যবহার করে। মিত্রদের কাছে নিজেদের বিশ্বাসযোগ্যতা প্রমাণ করতেও এটি কাজে লাগে। এমনকি অস্থির অঞ্চলগুলোতে কারা ক্ষমতায় যাবে, তা-ও এর মাধ্যমে ঠিক করা হয়। জঙ্গিদের অর্থায়ন বন্ধের এই লড়াই মূলত সার্বভৌমত্ব, সীমান্ত নিয়ন্ত্রণ আর আন্তর্জাতিক বৈধতার এক নীরব প্রতিযোগিতা।

এর প্রমাণ বেশ স্পষ্ট। ফিন্যান্সিয়াল অ্যাকশন টাস্ক ফোর্স (এফএটিএফ) মানি লন্ডারিং এবং সন্ত্রাসে অর্থায়ন প্রতিরোধের একটি বৈশ্বিক সংস্থা। তারা বারবার সতর্ক করেছে যে, রাষ্ট্রগুলোর চেয়ে সন্ত্রাসী গোষ্ঠীগুলো অনেক দ্রুত নতুন কৌশলের সাথে মানিয়ে নেয়। তাদের সাম্প্রতিক মূল্যায়নে পুরোনো ও নতুন অনেক পদ্ধতির কথা বলা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে চ্যারিটির অপব্যবহার, ক্যাশ কুরিয়ার, বাণিজ্যের আড়ালে মানি লন্ডারিং, অপহরণ, চাঁদাবাজি, অনলাইনে তহবিল সংগ্রহ এবং হাওয়ালার (হুন্ডি) মতো অবৈধ লেনদেন। ইসলামিক স্টেট এবং আল-কায়েদার মতো গোষ্ঠীগুলোও এখন বড় কোনো বিদেশি দাতার আশায় বসে থাকে না। যুদ্ধে হেরে যাওয়ার পরও তারা স্থানীয় আয়ের ওপর ভর করে টিকে আছে। জাতিসংঘও এই বিষয়টি তুলে ধরেছে।

জঙ্গি গোষ্ঠীগুলো মূলত উপসাগরীয় ধনী দাতাদের ওপর নির্ভরশীল—এই পুরোনো ধারণা এখন আর আগের মতো খাটে না। ২০০০-এর দশকের শুরুর দিকে বেশ কিছু হামলার পর উপসাগরীয় দেশগুলোর ওপর চাপ বাড়ে। চ্যারিটি এবং ব্যক্তিগত লেনদেনের ওপর তাদের নজরদারি কড়া করতে বলা হয়। এরপর সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাত আরও শক্তিশালী আর্থিক মনিটরিং ব্যবস্থা গড়ে তোলে। তারা পশ্চিমা নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলোর সাথে মিলে কাজ শুরু করে। এতে সমস্যার পুরোপুরি সমাধান হয়নি। তবে এর ধরন পাল্টে গেছে। অর্থায়ন এখন অনেক বেশি খণ্ডিত, স্থানীয় এবং নজরদারির বাইরে চলে গেছে।

সাহেল, সোমালিয়া, আফগানিস্তান এবং সিরিয়ার কিছু অংশে সশস্ত্র ইসলামি গোষ্ঠীগুলো এখন ভিন্নভাবে কাজ করছে। তারা এখন বিদেশ থেকে আসা অর্থে চলা বিদ্রোহীদের চেয়ে স্থানীয় একচেটিয়া কর্তৃপক্ষের মতোই বেশি আচরণ করে। সোমালিয়ার আল-শাবাব এর অন্যতম বড় উদাহরণ। হিরাল ইনস্টিটিউটের গবেষণা এবং জাতিসংঘের পর্যবেক্ষকরা দেখিয়েছেন যে, এই গোষ্ঠীটি কর, চাঁদাবাজি এবং চেকপয়েন্টের টোল থেকে প্রচুর টাকা তোলে। যেসব এলাকা তাদের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে নেই, সেখানেও তারা ব্যবসায়ীদের চাপ দিয়ে টাকা আদায় করে। নীতিনির্ধারকদের জন্য এটি একটি বড় সতর্কবার্তা। যে গোষ্ঠী ট্রাকচালক, ব্যবসায়ী এবং কৃষকদের কাছ থেকে কর আদায় করতে পারে, তাদের আটকানো খুব কঠিন। কারণ তারা কোনো একক বিদেশি দাতার ওপর নির্ভর করে না।

ইরাক ও সিরিয়ায় ইসলামিক স্টেটের (আইএস) উত্থানের সময়ও একই চিত্র দেখা গিয়েছিল। ২০১৪ ও ২০১৫ সালের দিকে এই গোষ্ঠীটি তেল বিক্রি, চাঁদাবাজি, সম্পদ দখল এবং সাধারণ মানুষের ওপর কর চাপিয়ে আয় করত। পরে 'সেন্টার ফর দ্য অ্যানালাইসিস অব টেরোরিজম' এবং জাতিসংঘের প্রতিবেদনে দেখা যায়, বড় বড় শহরগুলো হাতছাড়া হওয়ার পরও তাদের কাছে জমানো টাকা ছিল। তারা ছোট এবং লুকানো আয়ের পথ বেছে নেয়। সামরিক পরাজয় তাদের দুর্বল করেছিল ঠিকই। কিন্তু তাদের টিকে থাকার অর্থনৈতিক ভিত্তি পুরোপুরি ধ্বংস করতে পারেনি।

এখানেই ভূ-রাজনীতির প্রবেশ। আর্থিক নেটওয়ার্কগুলো এমনি এমনি তৈরি হয় না। এগুলো সীমান্ত এলাকা, শরণার্থী অর্থনীতি, দুর্বল কাস্টমস ব্যবস্থা এবং দ্বন্দ্বমুখর রাষ্ট্রগুলোর ভেতর দিয়ে চলে। কোনো সরকার যখন নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে, চ্যারিটি নিয়ন্ত্রণ করে বা সীমান্ত বন্ধ করে দেয়, তখন সেটি একটি ভূ-রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত হয়ে দাঁড়ায়। একইভাবে চোরাচালান সহ্য করা বা চোখ বন্ধ রাখাও রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত। লিবিয়া, সিরিয়া, ইয়েমেন এবং আফগানিস্তানে ক্ষমতার ভাগাভাগির কারণে সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলো সুযোগ পেয়েছে। কোনো নির্দিষ্ট রাষ্ট্রের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ না থাকার কারণে তারা সহজেই এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় টাকা সরাতে পারে। প্রতিদ্বন্দ্বী পরাশক্তিগুলো তখন নিজেদের সুবিধার জন্য এই ফাঁকফোকর কাজে লাগায়।

তুরস্ক, উপসাগরীয় রাজতন্ত্র, ইরান, পাকিস্তান এবং উত্তর আফ্রিকার বেশ কয়েকটি দেশকে বিভিন্ন সময়ে প্রশ্নের মুখে পড়তে হয়েছে। তাদের ভূখণ্ড, আর্থিক খাত বা তাদের মদদপুষ্ট গোষ্ঠীগুলো জঙ্গিদের অর্থায়নের সুযোগ তৈরি করেছে কি না—তা নিয়ে তদন্ত হয়েছে। অবশ্য প্রতিটি ঘটনার প্রেক্ষাপট আলাদা। রাষ্ট্র সরাসরি অর্থায়ন করেছে—এমন প্রমাণ পাওয়াও কঠিন। কিন্তু এর কৌশলগত প্রভাব প্রায় একই রকম। এক দেশে আইনের দুর্বল প্রয়োগ প্রতিবেশীদের জন্য নিরাপত্তা ঝুঁকি তৈরি করে। একটি সীমান্ত এলাকায় অবৈধ নেটওয়ার্ককে প্রশ্রয় দিলে তা পুরো বাণিজ্য ও অভিবাসন রুটকে অস্থিতিশীল করে তুলতে পারে।

এ কারণেই বিষয়টি কূটনীতিতে বারবার ফিরে আসে। ফিন্যান্সিয়াল অ্যাকশন টাস্ক ফোর্সের (এফএটিএফ) সাথে পাকিস্তানের অভিজ্ঞতা এর একটি বড় উদাহরণ। সন্ত্রাসবিরোধী অর্থায়ন রোধের নিয়মগুলো কীভাবে আন্তর্জাতিক চাপের হাতিয়ার হতে পারে, তা এখানে স্পষ্ট। নজরদারি বাড়ানো, আইনের প্রয়োগ এবং অর্থায়নের মামলাগুলো দ্রুত শেষ করার চাপে ইসলামাবাদ বছরের পর বছর এফএটিএফ-এর গ্রে লিস্টে (ধূসর তালিকা) ছিল। ২০২২ সালে তারা এই তালিকা থেকে মুক্তি পায়। পাকিস্তানের কাছে এটি শুধু আইনি বিষয় ছিল না। এটি বিনিয়োগকারীদের আস্থা, কূটনৈতিক অবস্থান এবং পরাশক্তিগুলোর সাথে তাদের সম্পর্কের ওপর প্রভাব ফেলেছিল। জঙ্গিদের অর্থায়ন বন্ধের নীতি তাদের পররাষ্ট্রনীতির অংশ হয়ে দাঁড়িয়েছিল।

আফ্রিকার পশ্চিম এবং পূর্ব দিকেও একই অবস্থা। সাহেল অঞ্চলে জিহাদি গোষ্ঠীগুলো সোনার খনি, গবাদি পশুর বাজার, জ্বালানি চোরাচালান এবং দুর্বল সীমান্তকে কাজে লাগায়। মোজাম্বিকের কাবো ডেলগাদোতে বিদ্রোহীরা স্থানীয় মানুষের ক্ষোভ, অবৈধ বাণিজ্য এবং অরক্ষিত উপকূলীয় রুটগুলো ব্যবহার করে। সোমালিয়ায় আল-শাবাবের আর্থিক শক্তিমত্তা বারবার বিদেশি শক্তিগুলোকে হতাশ করেছে। যারা শুধু সামরিক বিজয়ের মাধ্যমে সাফল্য মাপতে চেয়েছিল, তারা ব্যর্থ হয়েছে। এখান থেকে পাওয়া শিক্ষাটি অস্বস্তিকর হলেও স্পষ্ট: রাষ্ট্র যদি বাণিজ্য নিয়ন্ত্রণ করতে না পারে, তবে সে সংঘাতও সামলাতে পারবে না।

এই সংঘাতের প্রভাব শুধু নির্দিষ্ট অঞ্চলের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে না। জঙ্গিদের অর্থায়ন অভিবাসনের চাপ বাড়ায়, সমুদ্রে চলাচলের বীমা খরচ বৃদ্ধি করে, দুর্নীতি উসকে দেয় এবং দুর্বল সরকারগুলোকে আরও পঙ্গু করে তোলে। এটি মিত্রদের আচরণেও পরিবর্তন আনে। যেসব দেশ ভালো আর্থিক গোয়েন্দা তথ্য দিতে পারে, তারা অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার হয়ে ওঠে। অন্যদিকে যেসব দেশ বেছে বেছে আইন প্রয়োগ করে, তাদের কূটনৈতিক মূল্য চোকাতে হয়। ব্যাংকগুলো আরও বেশি সতর্ক হয়ে যায়। মানবাধিকার বা ত্রাণ সংস্থাগুলোর ওপর নজরদারি বাড়ে। টাকা অন্য খাতে চলে যাওয়ার ভয়ে অনেক সময় বৈধ ত্রাণ এবং রেমিট্যান্স আসতে দেরি হয়। এর চরম মূল্য চোকাতে হয় সাধারণ মানুষকে।

শেষ পয়েন্টটি একটু বেশি মনোযোগ দাবি করে। জঙ্গিদের অর্থায়ন বন্ধের উদ্যোগগুলো অতিরিক্ত কড়াকড়ি হলে উল্টো ফল আনতে পারে। সোমালিয়া ও আফগানিস্তানে অনেক দিন ধরেই ত্রাণ সংস্থা এবং প্রবাসীরা সতর্ক করে আসছেন। তারা বলছেন, ব্যাংকগুলোর অতি-সতর্কতার কারণে বৈধ লেনদেনও আটকে যেতে পারে। অথচ অনেক পরিবার এই টাকার ওপর নির্ভর করে বাঁচে। বিশ্বব্যাংক ও মানবাধিকার সংস্থাগুলো বছরের পর বছর ধরে এই সমস্যার কথা বলে আসছে। বৈধ পথ বন্ধ হয়ে গেলে মানুষ টাকা পাঠানো থামায় না। তারা তখন এমন পথ বেছে নেয়, যা মোটেও স্বচ্ছ নয়। সরকার যে অস্বচ্ছতা দূর করতে চায়, সেটিই তখন আরও বেড়ে যায়।

এর চেয়ে ভালো কোনো কৌশল বের করতে হলে বাস্তবের দিকে তাকাতে হবে। প্রথমত, সরকারগুলোকে বিদেশি দাতাদের ওপর ফোকাস কমিয়ে স্থানীয় আয়ের রুটিনগুলোর দিকে নজর দিতে হবে। অনলাইনে ভাইরাল হওয়া কোনো তহবিলের চেয়ে চেকপয়েন্টের চাঁদাবাজি অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। দ্বিতীয়ত, ভঙ্গুর রাষ্ট্রগুলোতে শুধু নিষেধাজ্ঞা আর নিয়ম চাপালেই হবে না। এর পাশাপাশি কাস্টমস ব্যবস্থা, আদালত, ব্যাংকিং সুবিধা এবং ডিজিটাল রেকর্ডের জন্য ব্যবহারিক সহায়তা দিতে হবে। তৃতীয়ত, আঞ্চলিক পরাশক্তিগুলোকে আর্থিক শাসনকে মূল নিরাপত্তা ইস্যু হিসেবে দেখতে হবে। সামরিক অভিযানের পর ভেবে দেখার বিষয় এটি নয়। কোনো সীমান্ত যদি রাজনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ হয়, তবে এর আর্থিক লেনদেনও সমান গুরুত্বপূর্ণ।

এক্ষেত্রে আরও নিখুঁত কূটনীতির প্রয়োজন রয়েছে। সোনা, গবাদি পশু, জ্বালানি, শিপিং এবং টেলিকম পেমেন্টের মতো নির্দিষ্ট খাতগুলোতে গোয়েন্দা তথ্য শেয়ার করা সবচেয়ে বেশি কাজে দেয়। কারণ, সাধারণ বাণিজ্যের আড়ালেই জঙ্গি গোষ্ঠীগুলো লুকিয়ে থাকে। নিয়ন্ত্রকদের উচিত ত্রাণ এবং বৈধ রেমিট্যান্সের পথগুলো সুরক্ষিত রাখা। যাতে পরিস্থিতির চাপে পড়ে সাধারণ মানুষ অনানুষ্ঠানিক পথে লেনদেন করতে বাধ্য না হয়।

সবচেয়ে বড় ভুল ধারণাটি হলো, জঙ্গিদের অর্থায়ন মানেই উগ্রবাদীদের টাকা খোঁজার চেষ্টা। বাস্তবে এটি মূলত দুর্বল রাষ্ট্র, প্রশ্রয় পাওয়া কালোবাজার এবং আঞ্চলিক দ্বন্দ্বের বিষয়। এই জিনিসগুলোই আর্থিক ফাঁকফোকরগুলোকে কৌশলগত সম্পদে পরিণত করে। এ কারণেই শুধু সন্ত্রাসবাদ দমনের বাইরেও টাকার এই উৎসগুলো খুঁজে বের করা জরুরি। এটি থেকে বোঝা যায়, কোন সরকার আসলেই তাদের ভূখণ্ড নিয়ন্ত্রণ করে, কোন জোটগুলো সত্যিই কাজ করে, আর কোন সংঘাতগুলো সমাধানের বদলে শুধু জিইয়ে রাখা হচ্ছে। ক্ষমতার এই খণ্ডিত যুগে, জঙ্গিদের কারা অর্থায়ন করে—সেই লড়াইটি মূলত রাষ্ট্রগুলোর মধ্যবর্তী জায়গাগুলোতে কারা ছড়ি ঘোরাবে—তারই একটি লড়াই।

Publication

The World Dispatch

Source: Editorial Desk

Category: Geopolitics