ভারতের 'চীন সমস্যা' এখন দেশের রাজনীতিরও বড় পরীক্ষা
১ এপ্রিল, ২০২৬

অনেক ভোটার এখনও মনে করেন, ভারতের চীন নীতি মানেই শুধু পাহাড়ি সীমান্তে সেনাদের পাহারাদারি। কথাটা কিছুটা সত্যি। তবে এর পেছনে বড় একটি রাজনৈতিক গল্পও আছে। ভারতে চীন ইস্যুটি এখন শুধু পররাষ্ট্র নীতির বিষয় নয়। এটি দেশের ভেতরের শাসনব্যবস্থারও অংশ হয়ে উঠেছে। ২০২০ সালে গালওয়ান সংঘর্ষে ২০ জন ভারতীয় সেনা নিহত হন। এরপর লাইন অব অ্যাকচুয়াল কন্ট্রোলে (এলএসি) উত্তেজনা বাড়ে। এতে সাধারণ মানুষের মনোভাব চীনের বিরুদ্ধে কঠোর হয়। এরপর থেকে নয়াদিল্লি চীন ইস্যুটিকে সার্বভৌমত্ব ও অর্থনৈতিক স্বনির্ভরতার সঙ্গে জুড়ে দিয়েছে। একইসঙ্গে গুরুত্বপূর্ণ খাতগুলোতে সরকারি নিয়ন্ত্রণ বাড়িয়েছে। দূর থেকে দেখলে এটিকে ভূ-রাজনীতি মনে হতে পারে। কিন্তু এখন এটি ভারতের নির্বাচন, ব্যবসার অনুমোদন ও ডিজিটাল নিয়মের সিদ্ধান্তকে প্রভাবিত করছে। এর মাধ্যমে দেশের ভেতরে সরকারের একটি শক্তিশালী ভাবমূর্তিও তৈরি হচ্ছে।
সরকারের নীতিগুলো দেখলেই এর প্রমাণ পাওয়া যায়। নিরাপত্তার কারণ দেখিয়ে ২০২০ সাল থেকে ভারত চীনের সঙ্গে যুক্ত ৩০০টির বেশি অ্যাপ নিষিদ্ধ করেছে। এর মধ্যে টিকটক, উইচ্যাট এবং ইউসি ব্রাউজারও রয়েছে। ভারতের সঙ্গে যেসব দেশের স্থলসীমান্ত আছে, তাদের সরাসরি বিদেশি বিনিয়োগ (FDI) কড়া নজরে রাখা হচ্ছে। সবাই বোঝেন, এর মূল লক্ষ্য হলো চীনা বিনিয়োগ। কাস্টমস চেকিং ও অন্যান্য বাধা দিয়ে কিছু পণ্যের আমদানি কমানো হয়েছে। টেলিকম খাতের নিয়মেও বদল এসেছে। ঝুঁকিপূর্ণ কোম্পানিগুলোকে গুরুত্বপূর্ণ নেটওয়ার্কের কাজ থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে। ২০২৩ ও ২০২৪ সালে ভারতীয় কর্মকর্তারা ল্যাপটপ ও ইলেকট্রনিক্স আমদানিতে কড়াকড়ি বাড়িয়েছেন। দেশীয় উৎপাদনে উৎসাহ দেওয়া হচ্ছে। চীনের সাপ্লাই চেইনের ওপর নির্ভরতা কমাতেই এসব উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। তবে এত কিছুর পরও চীনের সঙ্গে ভারতের বাণিজ্য এখনও বিশাল আকারের।
শেষের এই বিষয়টিই সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক বৈপরীত্য। ভারত সরকার চীনকে একটি কৌশলগত প্রতিদ্বন্দ্বী এবং নিরাপত্তার জন্য হুমকি হিসেবে তুলে ধরেছে। কিন্তু বাণিজ্যের পরিসংখ্যানে দেখা যায়, এখনও চীনের ওপর ভারতের গভীর অর্থনৈতিক নির্ভরতা রয়েছে। ভারতের বাণিজ্য ও শিল্প মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, চীন এখনও ভারতের অন্যতম বড় বাণিজ্যিক অংশীদার। আর বাণিজ্য ঘাটতিও চীনের পক্ষেই অনেক বেশি। ভারতের শিল্প খাত এখনও ইলেকট্রনিক্স, সোলার প্যানেল, ওষুধের কাঁচামাল এবং যন্ত্রপাতির জন্য চীনের ওপর নির্ভরশীল। রাজনৈতিক প্রচার এবং অর্থনৈতিক বাস্তবতার এই পার্থক্যটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ। কারণ এটি বুঝিয়ে দেয় যে, শুধু স্লোগান দিয়ে সব হয় না। একটি অ্যাপ নিষিদ্ধ করা সহজ। কিন্তু একটি ম্যানুফ্যাকচারিং ইকোসিস্টেম গড়ে তোলা অনেক কঠিন।
এর কারণগুলো খুঁজে পাওয়া কঠিন কিছু নয়। চীন কয়েক দশক ধরে বিশাল উৎপাদন ক্ষমতা, লজিস্টিকস এবং শক্তিশালী শিল্পাঞ্চল গড়ে তুলেছে। ভারতের বিশাল বাজার এবং উন্নতির তীব্র ইচ্ছা আছে। তা সত্ত্বেও তারা এখনও এই জিনিসগুলো গড়ে তোলার চেষ্টা করে যাচ্ছে। প্রোডাকশন-লিংকড ইনসেনটিভ (PLI) বা উৎপাদনভিত্তিক প্রণোদনা প্রকল্পের মাধ্যমে মোবাইল ফোন, সেমিকন্ডাক্টর এবং সোলার প্যানেল খাতে বিনিয়োগ টানা হয়েছে। অ্যাপলের সাপ্লায়াররা ভারতে তাদের অ্যাসেম্বলির কাজ বাড়িয়েছে। নয়াদিল্লি স্থানীয় উৎপাদনকে তাদের প্রধান লক্ষ্য হিসেবে ঘোষণা করেছে। তবে বিভিন্ন গবেষণা ও ব্যবসায়িক জরিপ বারবার কিছু সমস্যার কথা তুলে ধরেছে। ভারতে এখনও লজিস্টিকস খরচ বেশি এবং অবকাঠামো সব জায়গায় সমান নয়। এছাড়া কোনো কিছুর অনুমোদন পেতে অনেক সময় লাগে এবং সরকারি নিয়মকানুনও বারবার বদলায়। ভারত যেখানে উন্নতি করছে, সেখানেও অনেক কারখানাকে চীন থেকে আসা যন্ত্রাংশের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে।
এই কারণেই ভারত ও চীনের রাজনীতি এখন প্রশাসনিক ক্ষমতার মধ্য দিয়ে চলছে। সরকার সিদ্ধান্ত নিচ্ছে কে বিনিয়োগ করতে পারবে, কোন প্রযুক্তি চলবে এবং কোন পণ্য আমদানিতে বেশি নজরদারি দরকার। সরকার আরও ঠিক করছে কোন খাতগুলো কৌশলগতভাবে বেশি গুরুত্বপূর্ণ। এর পেছনে শুধু সীমান্তের ভয় কাজ করছে না। বরং এটি এখন দেশ চালানোর একটি মডেলে পরিণত হয়েছে। ক্ষমতাসীন ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি) শক্ত হাতে দেশ চালানোকে তাদের রাজনৈতিক পরিচয়ের মূল অংশ বানিয়েছে। চীনের ক্ষেত্রে এই কঠোরতা মানে হলো—সতর্কতা, বিধিনিষেধ এবং শিল্পনীতিকে নিজেদের যোগ্যতার প্রমাণ হিসেবে তুলে ধরা। তাদের বার্তাটি খুবই পরিষ্কার: একটি কঠোর সরকারই দেশের ভূখণ্ড এবং অর্থনীতিকে রক্ষা করতে পারে।
এই কথার একটি বড় নির্বাচনি মূল্য আছে। কারণ এটি সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনের সঙ্গে জাতীয় গর্বকে জুড়ে দেয়। অনেক পরিবারের কাছে সীমান্তের লড়াইকে দূরের বিষয় মনে হতে পারে। কিন্তু জনপ্রিয় অ্যাপ নিষিদ্ধ হওয়া, দেশি কারখানাকে সুবিধা দেওয়া বা দেশি পণ্য কেনার ডাক মানুষকে সরাসরি নাড়া দেয়। ‘আত্মনির্ভর ভারত’ স্লোগানটি সরকারকে একটি রাজনৈতিক সুবিধা দিয়েছে। এর মাধ্যমে তারা বাইরের দেশের হুমকিকে দেশের ভেতরের নীতির সঙ্গে মেলাতে পেরেছে। রাজনৈতিক নেতারা এখন বলতে পারেন—মানুষের কেনাকাটা, বিনিয়োগের নিয়ম এবং উৎপাদনের পরিকল্পনা সবই জাতীয় প্রতিরক্ষার অংশ। যে দেশে বেকারত্ব ও শিল্পের অভাব রাজনীতির প্রধান ইস্যু, সেখানে এই ধরনের কথা বেশ ভালো কাজ করে।
তবে এর কিছু ঝুঁকিও আছে। সরকার যদি চীনের ওপর নির্ভরতা কমানোকে একটি জাতীয় মিশন হিসেবে তুলে ধরে, তবে মানুষ একসময় প্রশ্ন করবেই। তারা জানতে চাইবে, নির্ভরতা সত্যিই কমেছে কি না। কিছু ক্ষেত্রে ভারত অন্য দেশ থেকে আমদানি বাড়িয়েছে এবং যন্ত্রাংশ অ্যাসেম্বলি করার ক্ষমতাও অর্জন করেছে। কিন্তু অনেক ক্ষেত্রে তারা শুধু বাণিজ্যের পথ বদলেছে। তারা তৃতীয় কোনো দেশের মাধ্যমে পণ্য আনছে, কিন্তু এর পেছনে সেই চীনা যন্ত্রাংশের ওপরই নির্ভর করতে হচ্ছে। অর্থনীতিবিদরা বছরের পর বছর ধরে একটি বিষয়ে সতর্ক করে আসছেন। তারা বলছেন, চীন থেকে কৌশলগতভাবে সরে আসার কাজটি অনেক ব্যয়বহুল ও ধীরগতির। বিশেষ করে এমন একটি উন্নয়নশীল দেশের জন্য, যারা প্রচুর মানুষের কর্মসংস্থান তৈরি করতে চাইছে। যদি জিনিসের দাম বাড়ে, সাপ্লাই চেইন দুর্বল থাকে বা কারখানায় কাজ তৈরি না হয়, তবে এই নিরাপত্তা রাজনীতি সাধারণ ভোটারদের ক্ষোভের মুখে পড়তে পারে।
এর আরেকটি অভ্যন্তরীণ প্রভাবও আছে। জাতীয় নিরাপত্তার কথা বলে সরকারি ক্ষমতা এমনভাবে বাড়ানো হতে পারে, যা মূল হুমকি চলে যাওয়ার পরও থেকে যায়। ভারতের কঠোর প্রযুক্তি আইন, বিনিয়োগ বাছাই এবং শিল্প খাতের নীতিগুলো হয়তো কৌশলগত দুর্বলতার আসল ভয় থেকেই করা হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র থেকে শুরু করে ইউরোপীয় ইউনিয়নের অনেক দেশই এখন এমনটা করছে। তবে ভারতে আগে থেকেই বিভিন্ন নীতিতে সরকারের ক্ষমতা অনেক বেড়েছে। সেখানে চীন ইস্যুর কারণে সরকারি সিদ্ধান্তের সমালোচনা করা আরও কঠিন হয়ে যেতে পারে। একবার কোনো সিদ্ধান্তকে ‘নিরাপত্তা’-র মোড়কে মুড়ে দিলে, মানুষ প্রকাশ্যে সেটির সমালোচনা করতে ভয় পায়। এর ফলে শিল্পনীতি থেকে কারা লাভবান হচ্ছে, কোন কোম্পানিগুলো বিশেষ সুবিধা পাচ্ছে এবং বিধিনিষেধগুলো সবার ক্ষেত্রে সমানভাবে প্রয়োগ হচ্ছে কি না—সেই বিষয়ে স্বচ্ছতা কমে যেতে পারে।
এর সবচেয়ে ভালো সমাধান রাতারাতি সম্পর্ক ছিন্ন করার নাটকীয় প্রতিশ্রুতি দেওয়া নয়। বরং প্রয়োজন রাষ্ট্রের ধৈর্যশীল সক্ষমতা। ভারত যদি চায় ব্যবসাগুলো দেশেই হোক, তবে তাদের আরও কিছু কাজ করতে হবে। কাস্টমসের নিয়মে বড় পরিবর্তন আনতে হবে। লজিস্টিকস খরচ কমাতে হবে, নিয়মকানুন স্থিতিশীল করতে হবে এবং দ্রুত বিরোধ মেটানোর ব্যবস্থা করতে হবে। শুধু বড় বড় বিনিয়োগের খবর দিলেই হবে না। গবেষণা, কারিগরি প্রশিক্ষণ এবং ছোট সাপ্লায়ারদেরও জোরালো সমর্থন দিতে হবে। নিরাপত্তার আসল সীমাটা কোথায়, তা সরকারি নীতিতে স্পষ্ট থাকা উচিত। সংবেদনশীল ডিজিটাল অবকাঠামো আর সাধারণ ব্যবহারের জিনিসপত্র এক নয়। কথায় কথায় নিরাপত্তার ভয় দেখানো শুনতে হয়তো শক্ত মনে হতে পারে। তবে একটি সুনির্দিষ্ট কৌশল সাধারণত বেশি কাজে দেয়।
সক্ষমতা এবং বিচ্ছিন্নতার মধ্যে পার্থক্য কী, সে বিষয়েও ভারতকে সৎ হতে হবে। একটি সক্ষম অর্থনীতির অনেকগুলো সাপ্লায়ার থাকে, বিশ্বাসযোগ্য পার্টনার থাকে এবং তাদের দেশীয় সক্ষমতাও থাকে শক্তিশালী। অন্যদিকে একটি বিচ্ছিন্ন অর্থনীতিকে বেশি খরচ করতে হয়, কিন্তু উৎপাদন হয় কম। ভিয়েতনামের মতো দেশগুলো দেখিয়েছে যে, ভূ-রাজনৈতিক ঝুঁকি সামলে কীভাবে বৈশ্বিক উৎপাদনের সঙ্গে যুক্ত হতে হয়। কাজটা কঠিন হলেও অসম্ভব নয়। ভারতের বিশাল আকারের কারণে তাদের সম্ভাবনা আরও বেশি। তবে এটি তখনই সম্ভব হবে, যখন বিনিয়োগকারী এবং শ্রমিকরা দেশের স্থিতিশীল নীতিমালার ওপর ভরসা রাখতে পারবেন।
চীনের সঙ্গে সীমান্ত সবসময়ই বিপজ্জনক ও রাজনৈতিকভাবে উত্তপ্ত থাকবে। তবে ভারতের গণতন্ত্রের সবচেয়ে বড় পরীক্ষা হয়তো পাহাড় থেকে অনেক দূরে হতে যাচ্ছে। এই পরীক্ষা হবে সরকারি মন্ত্রণালয়, সমুদ্রবন্দর, ডেটা সেন্টার ও কারখানার ফ্লোরে। ভারত যদি চীন থেকে পাওয়া ধাক্কাটিকে কাজে লাগাতে পারে, তবেই এই রাজনৈতিক কঠোরতা টিকে থাকবে। তাদের সুশাসন, শক্তিশালী শিল্প ও স্বচ্ছ রাষ্ট্রনীতি গড়ে তুলতে হবে। তা না হলে চীন কেবল একটি স্লোগান হিসেবেই ব্যবহৃত হবে। আর ভেতরে ভেতরে চীনের ওপর নির্ভরতা ঠিকই চলতে থাকবে। যেকোনো সরকারের কাছেই এটি বেশ লোভনীয় একটি ব্যবস্থা। তবে ভারতের মতো বিশাল ও উচ্চাকাঙ্ক্ষী দেশের জন্য শুধু এটুকু যথেষ্ট নয়।