বিশ্বজুড়ে সংঘাতে অপপ্রচারই এখন নতুন কামান
২৯ মার্চ, ২০২৬

যুদ্ধের কথা ভাবলেই আমাদের চোখের সামনে ভেসে ওঠে মাঠের ওপর দিয়ে ট্যাঙ্কের সারি আর আকাশের বুকে যুদ্ধবিমানের গর্জন। আমরা ভাবি সৈন্য আর ধ্বংসযজ্ঞের কথা, যা অস্ত্র আর কৌশলের লড়াই। কিন্তু আধুনিক সংঘাতে এখন একটি নতুন, অদৃশ্য যুদ্ধক্ষেত্র তৈরি হয়েছে। এই যুদ্ধ বিস্ফোরক দিয়ে লড়া হয় না, বরং লড়া হয় অ্যালগরিদম, আখ্যান এবং সাবধানে তৈরি করা মিথ্যা দিয়ে। এই যুদ্ধ চলে আমাদের স্ক্রিনে, আমাদের সোশ্যাল মিডিয়া ফিডে এবং আমাদের নিজেদের মনের গভীরে। এর লক্ষ্য কোনো এলাকা দখল করা নয়, বরং মানুষের বিশ্বাসকেই জয় করা।
রাষ্ট্রীয় মদতে অপপ্রচারের কৌশলগত ব্যবহার এখন আর কোনো বিচ্ছিন্ন কৌশল নয়; এটি একবিংশ শতাব্দীর সামরিক নীতির একটি প্রধান অংশ হয়ে উঠেছে। এটা শুধু নতুন মোড়কে পুরনো প্রচারণার পুনরাবৃত্তি নয়। বরং এটি হলো আমাদের साझा বাস্তবতার ধারণাকেই ধ্বংস করার জন্য ডেটা-নির্ভর এক জটিল আক্রমণ। উদাহরণস্বরূপ, ২০২২ সালে ইউক্রেনে পুরোদমে আগ্রাসন শুরুর প্রথম দিকে, আটলান্টিক কাউন্সিলের ডিজিটাল ফরেনসিক রিসার্চ ল্যাবের মতো প্রতিষ্ঠানের গবেষকরা সমন্বিত ভুয়া কার্যকলাপের বিশাল বৃদ্ধি লক্ষ্য করেন। ক্রেমলিন-পন্থী অ্যাকাউন্টগুলো, যার বেশিরভাগই ছিল স্বয়ংক্রিয় বট, বিভিন্ন প্ল্যাটফর্মকে ইউক্রেনের আত্মসমর্পণের বানোয়াট গল্প এবং আক্রমণের মিথ্যা অজুহাত দিয়ে ভরিয়ে দেয়। এর উদ্দেশ্য ছিল ইউক্রেনের জনগণ এবং তাদের আন্তর্জাতিক মিত্রদের মধ্যে বিভ্রান্তি ছড়ানো এবং মনোবল ভেঙে দেওয়া। এই ডিজিটাল হামলা যেকোনো কামান হামলার মতোই সুচিন্তিত ছিল।
এই কৌশল এখন আর সাধারণ মিথ্যা ছড়ানোর মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। আধুনিক তথ্য-যুদ্ধ 'ফ্লাডিং দ্য জোন' নীতিতে চলে, যার উদ্দেশ্য হলো নাগরিকদের ওপর এত বেশি পরস্পরবিরোধী তথ্য চাপিয়ে দেওয়া, যাতে তারা পুরোপুরি আগ্রহ হারিয়ে ফেলে এবং এই সিদ্ধান্তে আসে যে সত্যিটা জানা অসম্ভব। রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় চলা ট্রোল ফার্মগুলো এমন কনটেন্ট তৈরি ও প্রচার করে যা সমাজে আগে থেকেই থাকা বিভেদকে কাজে লাগায়। তারা রাজনীতি, বর্ণ বা জনস্বাস্থ্য নিয়ে দেশের অভ্যন্তরীণ বিতর্ককে তিক্ত এবং অমীমাংসিত সংঘাতে পরিণত করে। তাদের সব সময় নতুন ষড়যন্ত্র তত্ত্ব আবিষ্কার করতে হয় না; অনেক সময়, দেশের ভেতরেই থাকা সবচেয়ে বিভেদ সৃষ্টিকারী ধারণাগুলোকে চিহ্নিত করে সেগুলোকে আরও উস্কে দেওয়াই তাদের সবচেয়ে কার্যকর কাজ হয়। এর ফল হলো এমন একটি সমাজ, যেখানে পারস্পরিক আস্থা কমে যায়, মেরুকরণ বাড়ে এবং শেষ পর্যন্ত বাইরের কোনো শক্তি সহজেই প্রভাব ফেলতে বা অস্থিতিশীলতা তৈরি করতে পারে।
বেশ কিছু কারণ একত্রিত হয়ে এই নতুন যুদ্ধক্ষেত্রকে এত শক্তিশালী করে তুলেছে। এর প্রধান কারণ হলো আধুনিক ইন্টারনেটের গঠন। সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্মগুলো এমন অ্যালগরিদমের ওপর ভিত্তি করে তৈরি, যা এনগেজমেন্ট বাড়ানোর জন্য ডিজাইন করা হয়েছে, এবং গবেষণায় বারবার দেখা গেছে যে, যে কনটেন্ট মানুষের মধ্যে তীব্র আবেগ—বিশেষ করে রাগ এবং ভয়—তৈরি করে, তা সবচেয়ে দ্রুত এবং সবচেয়ে বেশি ছড়ায়। দুষ্কৃতিকারীরা ভাইরাল হওয়ার জন্য নিখুঁতভাবে কনটেন্ট তৈরি করে এই ব্যবস্থার দুর্বলতাকে কাজে লাগাতে শিখেছে। এছাড়া, বিশ্বজুড়ে ঐতিহ্যবাহী ও আর্থিকভাবে সচ্ছল স্থানীয় সংবাদমাধ্যমের পতন বিভিন্ন সম্প্রদায়ের মধ্যে তথ্যের শূন্যতা তৈরি করেছে, যার ফলে নাগরিকরা যাচাইহীন উৎস এবং পক্ষপাতদুষ্ট খবরের প্রতি আরও বেশি ঝুঁকে পড়ছে। একজন প্রতিপক্ষের জন্য, অপপ্রচার চালানো তুলনামূলকভাবে অনেক কম ব্যয়বহুল এবং এটি এমনভাবে অস্বীকার করার সুযোগ দেয়, যা একদল সৈন্য পাঠানোর ক্ষেত্রে সম্ভব নয়।
এই নীরব যুদ্ধের পরিণতি সুদূরপ্রসারী এবং অত্যন্ত ক্ষতিকর। ভূ-রাজনৈতিক স্তরে, এটি সংকট মোকাবিলায় একটি দেশের সক্ষমতাকে পঙ্গু করে দেয়। যখন নাগরিকরা সাধারণ তথ্যের বিষয়ে একমত হতে পারে না, তখন কোনো সিদ্ধান্তমূলক পদক্ষেপের জন্য রাজনৈতিক ঐক্য গড়ে তোলা প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ে। এটি নির্বাচনী প্রক্রিয়া থেকে শুরু করে বিচার ব্যবস্থা পর্যন্ত গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর আস্থা নষ্ট করে দেয়, এবং একটিও গুলি না ছুড়ে এটি একটি দেশকে ভেতর থেকে দুর্বল করে ফেলে। মিত্রদের অবিশ্বস্ত বা ক্ষতিকারক হিসেবে চিত্রিত করে চালানো প্রচারণার মাধ্যমে সামরিক ও কূটনৈতিক জোটকে দুর্বল বা ভেঙে দেওয়া যায়। যখন দেশগুলো আর साझा তথ্যের ভিত্তিতে সৎ আলোচনা করতে পারে না, তখন আন্তর্জাতিক সহযোগিতার মূল ভিত্তিই হুমকির মুখে পড়ে।
এর মানবিক প্রভাবও ঠিক ততটাই গুরুতর। ক্রমাগত বিষাক্ত এবং বিভেদ সৃষ্টিকারী কনটেন্টের সংস্পর্শে থাকা উদ্বেগ এবং সামাজিক বিচ্ছিন্নতা বাড়াতে সাহায্য করে। এর সাথে বাস্তব জীবনে রাজনৈতিক সহিংসতা বৃদ্ধিরও যোগসূত্র পাওয়া গেছে, কারণ অনলাইনে উগ্রপন্থী হয়ে ওঠা ব্যক্তিরা ষড়যন্ত্র তত্ত্বে বিশ্বাস করে সহিংস কাজ করতে উদ্বুদ্ধ হয়। যখন জনস্বাস্থ্য নিয়ে জরুরি অবস্থা বা প্রাকৃতিক দুর্যোগ দেখা দেয়, তখন অপপ্রচার মারাত্মক পরিণতি ডেকে আনতে পারে, যা মানুষকে সুরক্ষা ব্যবস্থা নিতে বা জীবন রক্ষাকারী সাহায্য গ্রহণ করতে নিরুৎসাহিত করে। এই ধরনের সংঘাত কোনো শহরের ওপর দৃশ্যমান ক্ষতচিহ্ন ফেলে না, কিন্তু এটি একটি সমাজকে একত্রে ধরে রাখা সামাজিক বন্ধনে গভীর ক্ষত তৈরি করে।
এই হুমকি মোকাবিলা করার জন্য முற்றிலும் ভিন্ন ধরনের জাতীয় প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা প্রয়োজন। সরকার এবং নাগরিক সমাজ সংস্থাগুলো এর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে শুরু করেছে। উদাহরণস্বরূপ, ইউরোপীয় ইউনিয়নের ইস্ট স্ট্র্যাটকম টাস্ক ফোর্স বিশেষভাবে রাশিয়ার অপপ্রচার চিহ্নিত এবং তা খণ্ডন করার জন্য তৈরি করা হয়েছিল। অনেক দেশ এখন মিডিয়া লিটারেসি বা গণমাধ্যম সাক্ষরতা শিক্ষায় প্রচুর বিনিয়োগ করছে, যার মাধ্যমে অল্প বয়স থেকেই নাগরিকদের শেখানো হচ্ছে কীভাবে তথ্যের উৎস যাচাই করতে হয় এবং বিভ্রান্তিকর কনটেন্ট চিহ্নিত করতে হয়। প্রযুক্তি প্ল্যাটফর্মগুলোর ওপর আরও বেশি নিয়ন্ত্রক তদারকির জন্যও দাবি জোরালো হচ্ছে, যেখানে তাদের অ্যালগরিদম কীভাবে কাজ করে সে সম্পর্কে আরও স্বচ্ছতা এবং সমন্বিত ভুয়া কার্যকলাপের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানানো হচ্ছে। এই প্রচেষ্টাগুলোর লক্ষ্য হলো সামাজিক প্রতিরোধ ক্ষমতা গড়ে তোলা, যাতে জনগণ সহজে প্রভাবিত না হয়।
শেষ পর্যন্ত, অপপ্রচারের সবচেয়ে শক্তিশালী প্রতিষেধক হলো একটি শক্তিশালী, স্বাধীন এবং বিশ্বস্ত গণমাধ্যম। পেশাদার সাংবাদিকদের কঠোর পরিশ্রম—যেমন তথ্য যাচাই করা, প্রেক্ষাপট সরবরাহ করা এবং ক্ষমতাসীনদের জবাবদিহি করা—মিথ্যার স্রোতের বিরুদ্ধে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিবন্ধক হিসেবে কাজ করে। এই কাজকে সমর্থন করা এখন আর কেবল নাগরিক দায়িত্ব নয়; এটি একটি কৌশলগত প্রতিরক্ষা পদক্ষেপ। এমন এক যুগে যেখানে যুদ্ধক্ষেত্র সর্বত্র, সেখানে সত্যের জন্য লড়াই এমন এক সংঘাত যা আমাদের সবাইকেই জড়িত করে। আমাদের সমাজকে রক্ষা করার জন্য এখন কেবল শক্তিশালী সামরিক বাহিনীই যথেষ্ট নয়, বরং এমন তথ্য-সচেতন এবং সহনশীল নাগরিক প্রয়োজন, যারা তাদের মনোযোগ আকর্ষণের এই দৈনন্দিন যুদ্ধে সত্যকে মিথ্যা থেকে আলাদা করতে সক্ষম।