বেসরকারি সেনাবাহিনী নীরবে আধুনিক যুদ্ধের নিয়ম বদলে দিচ্ছে

২৮ মার্চ, ২০২৬

বেসরকারি সেনাবাহিনী নীরবে আধুনিক যুদ্ধের নিয়ম বদলে দিচ্ছে

যুদ্ধের কথা ভাবলে আমাদের চোখে প্রায়শই ভেসে ওঠে জাতীয় উর্দি পরা সৈন্যদের ছবি, যারা দেশের পতাকার জন্য লড়ে এবং প্রাণ দেয়। রাষ্ট্রীয় সংঘাতের শত শত বছরের ইতিহাসে গেঁথে থাকা এই ছবিটি এখন দ্রুত পুরনো হয়ে যাচ্ছে। ছায়া থেকে সম্মুখ সমরে উঠে এসেছে এক নতুন ধরনের যোদ্ধা: বেসরকারি সামরিক ঠিকাদার। কর্পোরেট সংস্থার অধীনে কাজ করা এবং শেয়ারহোল্ডারদের কাছে দায়বদ্ধ থাকা এই আধুনিক ভাড়াটে যোদ্ধারা শুধু জাতীয় সেনাবাহিনীকে সহায়তা করছে না; তারা যুদ্ধের প্রকৃতিকেই পুরোপুরি বদলে দিচ্ছে। এর ফলে সরকারি সেবা এবং ব্যক্তিগত লাভের মধ্যেকার পার্থক্য ঝাপসা হয়ে যাচ্ছে।

এই পরিবর্তনের মাত্রা চমকে দেওয়ার মতো। বেসরকারি সামরিক ও নিরাপত্তা পরিষেবা খাতের বিশ্ববাজারের মূল্য বছরে ২০০ বিলিয়ন ডলারের বেশি। ধারণা করা হচ্ছে, আগামী দশকে এটি প্রায় দ্বিগুণ হবে। এটি কোনো ছোটখাটো শিল্প নয় যা একপাশে লুকিয়ে কাজ করে। বরং এটি বিশ্বজুড়ে প্রভাব ফেলা এক শক্তিশালী অর্থনৈতিক শক্তি। ইরাকের মরুভূমিতে ব্ল্যাকওয়াটার (এখন অ্যাকাডেমি) এর মতো সংস্থাগুলো বিতর্কিত কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিল। আবার আফ্রিকা ও ইউক্রেনের জটিল যুদ্ধক্ষেত্রে ওয়াগনার গ্রুপ রাষ্ট্রীয় নীতির হাতিয়ার হিসেবে কাজ করেছে। সব জায়গাতেই বেসরকারি সেনাবাহিনী একবিংশ শতাব্দীর যুদ্ধের এক অন্যতম প্রধান বৈশিষ্ট্য হয়ে উঠেছে। স্টকহোম ইন্টারন্যাশনাল পিস রিসার্চ ইনস্টিটিউট (SIPRI)-এর মতো প্রতিষ্ঠানের গবেষণা এই ধারাটি পর্যবেক্ষণ করছে। এই গবেষণা দেখায় যে, রাষ্ট্রগুলো রসদ সরবরাহ এবং প্রশিক্ষণ থেকে শুরু করে সরাসরি যুদ্ধ পরিচালনার মতো গুরুত্বপূর্ণ সামরিক কাজগুলোও ক্রমবর্ধমানভাবে বাইরের সংস্থাকে দিয়ে করাচ্ছে।

এই উত্থানের পেছনে বেশ কয়েকটি কারণ রয়েছে। সরকারগুলোর জন্য, বিশেষ করে গণতান্ত্রিক দেশগুলোতে, বেসরকারি ঠিকাদাররা রাজনৈতিক সুবিধার এক শক্তিশালী হাতিয়ার, যার মাধ্যমে তারা দায় এড়ানোর সুযোগ পায়। জাতীয় সেনার বদলে ঠিকাদারদের পাঠালে হতাহতের ঘটনায় রাজনীতিবিদরা জনগণের ক্ষোভ থেকে বাঁচতে পারেন, কারণ ঠিকাদারদের মৃত্যু প্রায়শই সরকারি সামরিক হিসাবের অন্তর্ভুক্ত করা হয় না। এর ফলে দেশের ভেতরে কম রাজনৈতিক ঝামেলা মাথায় নিয়ে সামরিক অভিযানে জড়ানো যায়। এছাড়াও, ঠান্ডা যুদ্ধের অবসানের পর বিশ্বজুড়ে স্থায়ী সেনাবাহিনীগুলোর আকার ব্যাপকভাবে কমানো হয়। এর ফলে বিশ্বজুড়ে ভাড়ায় কাজ করার জন্য বহু প্রশিক্ষিত ও অভিজ্ঞ প্রাক্তন সেনার এক বিশাল ভান্ডার তৈরি হয়। এই ঠিকাদাররা এমন বিশেষ দক্ষতা দিতে পারে যা হয়তো কোনো প্রচলিত সেনাবাহিনীর নেই। এর ফলে অর্থের বিনিময়ে একটি নমনীয় এবং দ্রুত মোতায়েনযোগ্য বাহিনী পাওয়া যায়।

কিন্তু এই সুবিধার জন্য চড়া মূল্য দিতে হয়, বিশেষ করে জবাবদিহিতার অভাবের মধ্য দিয়ে। যখন কোনো রাষ্ট্রীয় সেনা অপরাধ করে, তখন তাদের বিচারের জন্য নির্দিষ্ট আইনি কাঠামো থাকে, যেমন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে ইউনিফর্ম কোড অফ মিলিটারি জাস্টিস। কিন্তু যখন একজন বেসরকারি ঠিকাদার একই কাজ করে, তখন ন্যায়বিচারের পথটি ঘোলাটে ও কঠিন হয়ে পড়ে। বাগদাদে ২০০৭ সালের কুখ্যাত নিসুর স্কয়ার হত্যাকাণ্ড এই সমস্যার এক ভয়াবহ উদাহরণ। ব্ল্যাকওয়াটারের ঠিকাদাররা নিরস্ত্র ইরাকি বেসামরিক নাগরিকদের ওপর গুলি চালায়, এতে ১৭ জন নিহত এবং ২০ জন আহত হয়। এর পরের আইনি লড়াই বছরজুড়ে একাধিক মহাদেশে চলেছিল। এটি চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয় যে, যুদ্ধক্ষেত্রে বেসরকারি সামরিক কর্মীদের দ্বারা সংঘটিত নৃশংসতার জন্য তাদের জবাবদিহি করানো কতটা কঠিন। এই আইনি ধূসর এলাকা এক ধরনের বিচারহীনতার সংস্কৃতি তৈরি করে, যা যুদ্ধক্ষেত্রে আরও বেশি নৃশংসতার জন্ম দিতে পারে।

এর প্রভাব শুধু ব্যক্তিগত সহিংসতার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। বেসরকারি সেনাবাহিনীর উত্থান রাষ্ট্রের বৈধ শক্তি প্রয়োগের একচেটিয়া অধিকারের ধারণাটিকেই ক্ষয় করে দেয়। এই ধারণাটি শত শত বছর ধরে আধুনিক আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ভিত্তিপ্রস্তর ছিল। দুর্বল রাষ্ট্রগুলোতে, বিশেষ করে আফ্রিকা জুড়ে, শক্তিশালী PMC-গুলো নিয়ন্ত্রকের ভূমিকা পালন করছে। তারা বন্ধুভাবাপন্ন সরকারকে ক্ষমতায় টিকিয়ে রাখে অথবা অপছন্দের সরকারকে অস্থিতিশীল করে তোলে। প্রায়শই এর বিনিময়ে তারা হীরা, তেল বা খনিজের মতো প্রাকৃতিক সম্পদের লাভজনক উৎসের দখল পায়। তারা কার্যকরভাবে কর্পোরেট যুদ্ধবাজদের মতো কাজ করতে পারে এবং নিজেদের লাভের জন্য এমন সব উদ্দেশ্য পূরণ করে যা দীর্ঘমেয়াদী শান্তি ও স্থিতিশীলতার পরিপন্থী হতে পারে। ভাড়াটে যোদ্ধা ব্যবহারের বিষয়ে জাতিসংঘের ওয়ার্কিং গ্রুপের একটি প্রতিবেদনে বারবার সতর্ক করা হয়েছে যে, এই গোষ্ঠীগুলো সংঘাতকে দীর্ঘায়িত করতে পারে, কারণ তাদের ব্যবসার মডেলটি স্থায়ী শান্তির ওপর নয়, বরং অস্থিতিশীলতার ওপর নির্ভর করে গড়ে ওঠে।

এই চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করা একটি জটিল আন্তর্জাতিক ধাঁধা। কিছু প্রচেষ্টা নেওয়া হয়েছে, যেমন ম্যঁট্রো ডকুমেন্ট, যেখানে PMC-দের কার্যক্রম সম্পর্কে রাষ্ট্রগুলোর আইনি বাধ্যবাধকতার রূপরেখা দেওয়া হয়েছে। যদিও ৫০টিরও বেশি দেশ এতে স্বাক্ষর করেছে, এটি কোনো বাধ্যতামূলক চুক্তি নয় এবং এর কোনো বাস্তব প্রয়োগকারী ব্যবস্থাও নেই। একইভাবে, আচরণবিধি মেনে চলার জন্য শিল্প-খাতের নিজস্ব উদ্যোগগুলোও স্বেচ্ছাধীন এবং প্রায়শই সবচেয়ে বড় অপরাধীদের নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থ হয়। এর একমাত্র অর্থপূর্ণ সমাধান হলো আরও শক্তিশালী জাতীয় আইন প্রণয়ন করা। এই আইনে ঠিকাদারদের আইনি মর্যাদা স্পষ্টভাবে সংজ্ঞায়িত করতে হবে, সমস্ত চুক্তির জন্য শক্তিশালী তদারকি ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করতে হবে, এবং বিদেশে নিজ দেশের নাগরিকদের দ্বারা সংঘটিত অপরাধের বিচারের জন্য সুস্পষ্ট এখতিয়ারের পথ তৈরি করতে হবে, তাদের নিয়োগকর্তা যেই হোক না কেন। এটি ছাড়া, এই ব্যবস্থাটি জনগণের কাছে জবাবদিহিতার চেয়ে কর্পোরেট গোপনীয়তাকেই বেশি গুরুত্ব দিতে থাকবে।

পরিশেষে, যুদ্ধের এই বেসরকারিকরণ একটি গভীর এবং উদ্বেগজনক পরিবর্তন। এটি দেখায় যে মানবজাতি কীভাবে সংঘবদ্ধ সহিংসতায় লিপ্ত হচ্ছে, তার ধরনে বড় বদল এসেছে। এটি যুদ্ধকে এক ভয়াবহ রাজনৈতিক প্রয়োজন থেকে একটি বাণিজ্যিক উদ্যোগে পরিণত করে, যা বাজারের যুক্তি এবং শেয়ারহোল্ডারদের লাভের দ্বারা চালিত হয়। দেশের জন্য লড়াই করা সৈনিকের জায়গা নিচ্ছে চুক্তির জন্য লড়াই করা কর্মী, এবং এই নীরব বিপ্লবের পরিণতি কেবল প্রকাশ পেতে শুরু করেছে। যতদিন সংঘাত থেকে লাভ করার সুযোগ থাকবে, ততদিন এই ছায়া সেনাবাহিনীর চাহিদাও থাকবে। এটি আমাদের মৌলিক ধারণাগুলোকেই চ্যালেঞ্জ করবে: কাদের যুদ্ধ করার অধিকার আছে এবং সবকিছু ভুল হলে দায়ভার কার ওপর বর্তাবে।

Publication

The World Dispatch

Source: Editorial Desk

Category: Conflict & War