গর্ভপাতের রাজনীতি নতুন করে আঁকছে আমেরিকার ক্ষমতার মানচিত্র
২ এপ্রিল, ২০২৬
‘রো বনাম ওয়েড’ রায় বাতিলের পর গর্ভপাত ইস্যুটি মিলিয়ে যায়নি। বরং এটি এখন মার্কিন রাজনীতির অন্যতম শক্তিশালী বিষয় হয়ে উঠেছে। নির্বাচন, আইন ও দলীয় কৌশল—সবকিছুকেই এটি নতুন রূপ দিচ্ছে।
অনেকের ধারণা ছিল, সুপ্রিম কোর্ট ‘রো বনাম ওয়েড’ রায় বাতিল করে দিলে গর্ভপাতের বিষয়টি রাজনৈতিকভাবে গুরুত্ব হারাবে। কিন্তু সেই ধারণা ভুল ছিল। এই রায় বাতিলের ফলে বিতর্কটি শেষ হয়ে যায়নি, বরং আরও বিস্ফোরিত হয়েছে। যা এতদিন একটি জাতীয় আইনি লড়াই ছিল, তা এখন প্রতিটি রাজ্যে ক্ষমতার দ্বন্দ্বে পরিণত হয়েছে। দুই দলের রাজনীতিবিদরা এখন একটি কঠিন সত্য শিখছেন: গর্ভপাত কোনো ছোটখাটো সাংস্কৃতিক বিষয় নয়। এটি এখন একটি বড় পরীক্ষা, যা ঠিক করে দেয় সরকার কে নিয়ন্ত্রণ করবে, কাদের অধিকার গুরুত্ব পাবে এবং ব্যক্তিগত চিকিৎসার বিষয়ে নির্বাচিত নেতাদের মানুষ বিশ্বাস করতে পারে কি না।
এর প্রমাণ উপেক্ষা করা কঠিন। ২০২২ সালের ডবস সিদ্ধান্তের পর থেকে গর্ভপাতের অধিকার সমর্থকরা নির্বাচনে ও গণভোটে একের পর এক জয় পেয়েছেন। ২০২২ সালে কানসাসের মতো রাজ্যে, যেখানে ডোনাল্ড ট্রাম্প সহজেই জিতেছিলেন, সেখানকার ভোটাররা গর্ভপাত-বিরোধী একটি সাংবিধানিক সংশোধনী প্রত্যাখ্যান করেন। ২০২৩ সালে ওহাওয়োতে রিপাবলিকান নেতাদের তীব্র বিরোধিতা সত্ত্বেও ভোটাররা গর্ভপাতের অধিকার রক্ষার পক্ষে রায় দেন। ২০২২ সালে মিশিগানের ভোটাররা প্রজনন অধিকারের পক্ষে একটি সংশোধনী সমর্থন করেন। একই বছর কেন্টাকির ভোটাররাও গর্ভপাত-বিরোধী একটি প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেন। এগুলি শুধু উদার রাজ্যগুলোর বিচ্ছিন্ন ফলাফল ছিল না। এর মাধ্যমে রাজনৈতিক মহলের জন্য আরও বড় একটি বার্তা ছিল: যখন গর্ভপাতের অধিকার নিয়ে সরাসরি ভোটারদের কাছে যাওয়া হয়, তখন গর্ভপাত-বিরোধী আন্দোলন প্রায়ই বাধার মুখে পড়ে।
এই চিত্র নির্বাচনী রাজনীতিতেও দেখা গেছে। ২০২২ সালের মধ্যবর্তী নির্বাচনের পর এক্সিট পোল এবং বিভিন্ন বিশ্লেষণে দেখা যায় যে, গর্ভপাতের বিষয়টি ভোটারদের উদ্বেগের তালিকায় বেশ উপরে ছিল, বিশেষ করে নারী ও তরুণ ভোটারদের মধ্যে। ওই নির্বাচনে ডেমোক্র্যাটরা পূর্বাভাসের চেয়ে অনেক ভালো ফল করে এবং এর একটি বড় কারণ হিসেবে গর্ভপাত ইস্যুটিকে দেখা হয়। তার মানে এই নয় যে গর্ভপাতই একমাত্র কারণ ছিল। মুদ্রাস্ফীতি, প্রার্থীর যোগ্যতা এবং নির্বাচনী কারচুপির অভিযোগের মতো বিষয়গুলোও গুরুত্বপূর্ণ ছিল। কিন্তু ডবস সিদ্ধান্তের প্রভাব দ্রুত মিলিয়ে যাবে, এই ধারণাটি প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই ভেঙে পড়ে। কারণ এর পরিণতি ছিল உடனടി এবং বাস্তব।
এই পরিণতিগুলো কোনো তাত্ত্বিক বিষয় ছিল না। এগুলো ছিল বিভিন্ন রাজ্যে গর্ভপাত নিষিদ্ধ করা, ক্লিনিক বন্ধ করে দেওয়া, এবং গর্ভাবস্থায় জটিলতার শিকার নারীদের চিকিৎসা না পাওয়ার মতো বাস্তব ঘটনা। টেক্সাসে, যেখানে ডবস রায়ের আগেই গর্ভপাত কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করা হয়েছিল, সেখানকার আইন এতটাই আক্রমণাত্মক যে অনেক নারী জানিয়েছেন, তাদের শারীরিক অবস্থা আরও খারাপ না হওয়া পর্যন্ত তারা চিকিৎসা পাননি। কঠোর নিষেধাজ্ঞা থাকা অন্যান্য রাজ্য থেকেও একই ধরনের ভয় ও বিভ্রান্তির খবর পাওয়া গেছে। আমেরিকান কলেজ অফ অবস্টেট্রিশিয়ানস অ্যান্ড গাইনোকোলজিস্টস-সহ বিভিন্ন মেডিকেল সংস্থা সতর্ক করেছে যে, গর্ভপাত আইনের ভাষা অস্পষ্ট হলে জরুরি চিকিৎসায় বাধা সৃষ্টি হতে পারে এবং রোগীদের জীবন ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে। নীতি যখন ব্যক্তিগত হয়ে ওঠে, তখন রাজনীতিও আরও শক্তিশালী হয়ে যায়।
এই পরিস্থিতিতে পুরনো রাজনৈতিক কৌশল ভেঙে পড়েছে। কয়েক দশক ধরে অনেক রিপাবলিকান প্রার্থী গর্ভপাতকে একটি প্রতীকী বিষয় হিসেবে ব্যবহার করতেন। তারা ‘রো বনাম ওয়েড’ রায়ের বিরুদ্ধে প্রচারণা চালাতেন, কিন্তু জানতেন যে এই রায়ের কারণে দেশজুড়ে গর্ভপাতের একটি ন্যূনতম অধিকার বজায় থাকবে। ডবস সিদ্ধান্ত সেই রক্ষাকবচটি সরিয়ে দিয়েছে। এখন রিপাবলিকান কর্মকর্তারা শুধু নৈতিক যুক্তি দিচ্ছেন না, তারা সরাসরি আইন তৈরি করছেন। এর ফলে ভোটাররা দেখতে পাচ্ছেন যে প্রায়-সম্পূর্ণ নিষেধাজ্ঞা বা ধর্ষণের ক্ষেত্রে সীমিত ছাড়ের মতো বিষয়গুলো বাস্তবে কেমন। এটি রিপাবলিকান জোটের ভেতরে একটি গভীর বিভেদ তৈরি করেছে। দলের কর্মীরা কঠোর নিষেধাজ্ঞা চান, কিন্তু সাধারণ ভোটারদের অনেকেই তা চান না।
ডেমোক্র্যাটরা এই বিভেদ থেকে সুবিধা পেয়েছে, কিন্তু তাদের আত্মতুষ্টিতে ভোগার কারণ নেই। গর্ভপাত ইস্যুতে তাদের সুবিধা বাস্তব, তবে এটি অসীম নয়। যারা গর্ভপাতের অধিকার সমর্থন করেন, তারা যে মুদ্রাস্ফীতি, অভিবাসন বা অপরাধ দমনের মতো বিষয়েও ডেমোক্র্যাটদের বিশ্বাস করবেন, এমন কোনো কথা নেই। তাছাড়া, সাধারণভাবে গর্ভপাতের অধিকার সমর্থন করা এবং বিভিন্ন সংস্থার সব দাবি মেনে নেওয়ার মধ্যে পার্থক্য আছে। জনমত সব সময় দলীয় স্লোগানের চেয়ে অনেক বেশি জটিল। গ্যালাপ এবং পিউ রিসার্চ সেন্টারের মতো সংস্থাগুলো ধারাবাহিকভাবে দেখেছে যে,大多数 মানুষ গর্ভপাত নিষিদ্ধ করার বিরোধী, কিন্তু গর্ভাবস্থার শেষের দিকে গর্ভপাত বা সরকারি অর্থায়নের মতো বিষয়ে তাদের মতামত ভিন্ন।
তবে একটি বিষয় স্পষ্ট। ডবস-পরবর্তী সময়ে ক্ষমতা জাতীয় পর্যায়ের পরামর্শদাতাদের হাত থেকে সরে গিয়ে রাজ্যপাল, রাজ্যের আইনপ্রণেতা, বিচারক এবং অ্যাটর্নি জেনারেলদের হাতে চলে গেছে। এটি আর শুধু ওয়াশিংটনের গল্প নয়। এটি এখন অ্যারিজোনা, উইসকনসিন, ফ্লোরিডা, ওহাইয়ো, টেক্সাস এবং নর্থ ক্যারোলাইনার গল্প। পুরনো আইন আবার ফিরিয়ে আনা হচ্ছে, নতুন সাংবিধানিক সংশোধনী প্রস্তাব করা হচ্ছে এবং রাজ্যগুলোর সুপ্রিম কোর্ট রাজনৈতিক যুদ্ধক্ষেত্রে পরিণত হয়েছে। অনেক রাজ্যে এখন বিচার বিভাগীয় নির্বাচন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে, কারণ বিচারকরাই সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন যে গর্ভপাত নিষেধাজ্ঞা বলবৎ থাকবে কি না বা ভোটাররা গর্ভপাতের অধিকারকে রাজ্যের সংবিধানে অন্তর্ভুক্ত করতে পারবেন কি না।
এই পরিবর্তনের প্রভাব শুধু গর্ভপাতের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই। এটি ভোটারদের অংশগ্রহণ, রাজনৈতিক অনুদান, নির্বাচনী বিজ্ঞাপন এবং দুই দলের আইনি কৌশলকেও বদলে দিচ্ছে। এটি জনগণের আস্থার সংকটকেও আরও গভীর করছে। অনেক আমেরিকানকে বলা হয়েছিল যে গর্ভপাতের বিষয়টি রাজ্যগুলোর হাতে ছেড়ে দিলে দেশে শান্তি ফিরে আসবে। কিন্তু বাস্তবে এটি আইনি বিশৃঙ্খলা এবং রাজনৈতিক সংঘাত তৈরি করেছে। একটি রাজ্যের একজন নারী সাংবিধানিকভাবে সুরক্ষিত গর্ভপাতের অধিকার পেতে পারেন, আবার তার প্রতিবেশী রাজ্যের একজন নারীকে প্রায়-সম্পূর্ণ নিষেধাজ্ঞার মুখোমুখি হতে হতে পারে। এটি কোনো স্থিতিশীল পরিস্থিতি নয়, বরং একই দেশে নাগরিকদের জন্য অসম অধিকারের এক মানচিত্র।
যারা কঠোর গর্ভপাত নিষেধাজ্ঞার সমর্থক, তারা যুক্তি দেন যে এটাই গণতন্ত্র। একদিক থেকে তাদের কথা ঠিক। যে সিদ্ধান্তগুলো একসময় আদালত নিত, এখন সেগুলো নির্বাচিত প্রতিনিধি এবং ভোটাররা নিচ্ছেন। কিন্তু গণতন্ত্র মানে শুধু সংখ্যাগরিষ্ঠের ক্ষমতা চাপিয়ে দেওয়া নয়। এর জন্য বৈধতা এবং জনগণের সম্মতিও প্রয়োজন। যদি নিষেধাজ্ঞার কারণে চিকিৎসা সংকট এবং জনরোষ তৈরি হতে থাকে, তবে গর্ভপাত-বিরোধী আন্দোলন হয়তো একসময় বুঝতে পারবে যে আদালতে জেতার চেয়ে জনগণের সমর্থন ধরে রাখা অনেক বেশি কঠিন।
রাজনীতিবিদদের জন্য স্পষ্ট পরামর্শ হলো, ঘুরিয়ে কথা বলা বন্ধ করা। ভোটারদের সত্যটা জানা উচিত। যদি কোনো প্রার্থী ছয় সপ্তাহের পর গর্ভপাত নিষিদ্ধ করতে চান, তবে তার সেটা পরিষ্কারভাবে বলা উচিত এবং এর পরিণতি ব্যাখ্যা করা উচিত। একইভাবে, যদি কেউ নির্দিষ্ট সময়সীমার পর গর্ভপাত সীমিত করার পক্ষে থাকেন, তবে সেটাও স্পষ্ট করে বলা দরকার। এখন আর অস্পষ্ট নৈতিকতার কথা বলার দিন নেই। আইনপ্রণেতাদের উচিত চিকিৎসাগত ছাড়ের বিষয়টি পরিষ্কারভাবে লেখা, যাতে চিকিৎসকরা শাস্তির ভয় ছাড়াই কাজ করতে পারেন। কংগ্রেস এখনও দলীয় কোন্দলে আটকে আছে, কিন্তু কেন্দ্রীয় সরকার ওষুধের নিয়ম, গোপনীয়তার আইন এবং বিচারক নিয়োগের মাধ্যমে গর্ভপাতের অধিকারে এখনও প্রভাব ফেলে।
এর চেয়েও গভীর পরামর্শটি আরও সহজ। গর্ভপাতকে একটি মামুলি বিষয় হিসেবে না দেখে এটিকে একটি প্রধান শাসনতান্ত্রিক বিষয় হিসেবে দেখুন। এটি পরিবার, চিকিৎসা, ব্যক্তিগত গোপনীয়তা এবং রাষ্ট্রের বিশ্বাসযোগ্যতার সঙ্গে জড়িত। আমেরিকানরা হয়তো গর্ভপাত নিয়ে কখনও পুরোপুরি একমত হবে না। কিন্তু যারা চরমপন্থী কথা বলে এবং বিশৃঙ্খলভাবে শাসন করে, তাদের প্রতি মানুষ ক্রমশ অসহিষ্ণু হয়ে উঠছে।
‘রো বনাম ওয়েড’ পরবর্তী যুগ একটি বিতর্কের অবসান ঘটাবে বলে মনে করা হয়েছিল। পরিবর্তে, এটি আমেরিকান রাজনীতির একটি মূল সত্যকে সামনে এনেছে: যখন রাষ্ট্র মানুষের জীবনের সবচেয়ে ব্যক্তিগত অংশে নিয়ন্ত্রণ বাড়াতে চায়, তখন ভোটাররা শুধু তা লক্ষ্যই করে না; তারা সংগঠিত হয়, প্রতিরোধ করে এবং রাজনৈতিক মানচিত্র নতুন করে আঁকে। ঠিক এটাই এখন ঘটছে।
Source: Editorial Desk