ইসরায়েলের বন্ধু ও শত্রু: আসল চিত্র ধারণার চেয়ে অনেক বেশি জটিল

১ এপ্রিল, ২০২৬

ইসরায়েলের বন্ধু ও শত্রু: আসল চিত্র ধারণার চেয়ে অনেক বেশি জটিল

অনেকেই বিশ্বে ইসরায়েলের অবস্থানকে একটি সহজ বিষয় বলে মনে করেন। সেই ধারণা অনুযায়ী, মানচিত্রটি বেশ স্পষ্ট: মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং হাতেগোনা কয়েকটি পশ্চিমা দেশ হলো বন্ধু, ইরান ও তার সহযোগীরা শত্রু, এবং বাকি সবাই মাঝামাঝি অবস্থানে রয়েছে। কিন্তু আসল কূটনৈতিক মানচিত্রটি আঁকা বেশ কঠিন। ইসরায়েলের বৈদেশিক সম্পর্ক এখন আর স্থায়ী বন্ধুত্বের ওপর নির্ভরশীল নয়। বরং তা নির্ধারিত হচ্ছে বিভিন্ন স্বার্থের মেলবন্ধন, অভ্যন্তরীণ রাজনীতি, বাণিজ্যিক সম্পর্ক, নিরাপত্তা সংক্রান্ত ভয় এবং যুদ্ধ নিয়ে জনগণের ক্ষোভের ওপর ভিত্তি করে। এই বিষয়টি মধ্যপ্রাচ্যের বাইরেও গুরুত্বপূর্ণ, কারণ ইসরায়েলের মিত্রতা এবং শত্রুতা এখন বৃহত্তর আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার শক্তিকে পরীক্ষা করছে।

এই জটিলতার সবচেয়ে বড় প্রমাণ হলো বিভিন্ন দেশের ভোটিং রেকর্ড, বাণিজ্য পরিসংখ্যান এবং নিরাপত্তা সম্পর্ক, যা প্রায়শই ভিন্ন ভিন্ন দিকে চালিত হয়। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এখন পর্যন্ত ইসরায়েলের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার। মার্কিন সরকারের দীর্ঘদিনের তথ্য অনুযায়ী, ওয়াশিংটন বছরের পর বছর ধরে ইসরায়েলকে শত শত কোটি ডলারের সামরিক সহায়তা দিয়েছে। বর্তমান ১০ বছরের সমঝোতা স্মারক অনুযায়ী, দেশটি বছরে ৩.৮ বিলিয়ন ডলার নিরাপত্তা সহায়তা পায়। কিন্তু বসতি স্থাপন নীতি, গাজায় বেসামরিক মানুষের ক্ষতি এবং ফিলিস্তিন রাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ নিয়ে এই সম্পর্কেও টানাপোড়েন দেখা দিয়েছে। ইউরোপে, জার্মানি ইসরায়েলের নিরাপত্তাকে নিজেদের রাষ্ট্রের মূল স্বার্থ হিসেবে দেখে এবং অন্যতম প্রধান অস্ত্র সরবরাহকারী হিসেবে রয়েছে। অন্যদিকে স্পেন, আয়ারল্যান্ড এবং বেলজিয়ামের মতো দেশগুলো ইসরায়েলের সামরিক আচরণের বিরুদ্ধে কঠোর প্রকাশ্য অবস্থান নিয়েছে। ইউরোপীয় ইউনিয়ন作为一个 ব্লক ইসরায়েলের অন্যতম বৃহৎ বাণিজ্যিক অংশীদার হলেও রাজনৈতিকভাবে গভীরভাবে বিভক্ত।

একই চিত্র আরব বিশ্বেও দেখা যায়। আব্রাহাম অ্যাকর্ডস সংযুক্ত আরব আমিরাত, বাহরাইন এবং পরে মরক্কোর সাথে ইসরায়েলের সম্পর্ক স্বাভাবিক করে এই অঞ্চলের কূটনৈতিক চিত্র বদলে দিয়েছে। সম্পর্ক স্বাভাবিক হওয়ার পর ইসরায়েল ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের মধ্যে বাণিজ্য দ্রুত বৃদ্ধি পায়। সরকারি ও ব্যবসায়িক প্রতিবেদন অনুসারে, কয়েক বছরের মধ্যেই তা শত শত কোটি ডলারে পৌঁছায়। নিরাপত্তা ও প্রযুক্তিগত সম্পর্কও প্রসারিত হয়। কিন্তু এই সরকারগুলোকেই গাজা যুদ্ধের কারণে জনগণের ক্ষোভের মুখে পড়তে হয়েছে। জর্ডান ও মিশর, যাদের সাথে ইসরায়েলের কয়েক দশকের শান্তি চুক্তি রয়েছে, তারা নিরাপত্তা সমন্বয় চালিয়ে যাচ্ছে। কারণ তারা এটিকে সীমান্ত স্থিতিশীলতা এবং আঞ্চলিক নিয়ন্ত্রণের জন্য জরুরি বলে মনে করে। একই সময়ে, উভয় দেশের সরকার ইসরায়েলি নীতির প্রতি গভীর অভ্যন্তরীণ বিরোধিতার সম্মুখীন, যা এই শান্তিকে শীতল, সংকীর্ণ এবং রাজনৈতিকভাবে ভঙ্গুর করে তুলেছে।

ইসরায়েলের বন্ধুরা যদি আপাতদৃষ্টির চেয়ে বেশি শর্তাধীন হয়, তবে তার শত্রুরাও কোনো একক শিবির নয়। ইরান হলো সবচেয়ে স্পষ্ট এবং ঘোর বিরোধী। লেবাননে হিজবুল্লাহ, সিরিয়ায় সশস্ত্র গোষ্ঠী, ইরাকে মিলিশিয়া এবং হামাস ও প্যালেস্টাইনিয়ান ইসলামিক জিহাদকে সমর্থনের কারণে ইরান এক দীর্ঘ আঞ্চলিক সংঘাতের কেন্দ্রে রয়েছে। ইসরায়েলি কর্মকর্তারা বারবার ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচিকে অস্তিত্বের জন্য হুমকি হিসেবে বর্ণনা করেছেন। আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থাও সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ইরানের সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের মজুদ বৃদ্ধির প্রমাণ দিয়েছে। কিন্তু ইরান ও তার সহযোগী সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর বাইরে শত্রুর সংজ্ঞাটি আর ততটা স্পষ্ট থাকে না। উদাহরণস্বরূপ, তুরস্ক ন্যাটোর সদস্য, যার সাথে ইসরায়েলের একসময় ঘনিষ্ঠ বাণিজ্য ছিল, আবার কখনও প্রকাশ্য কূটনৈতিক শত্রুতাও ছিল। এমনকি যখন রাজনৈতিক বাগাড়ম্বর কঠোর হয়েছে, তখনও বাণিজ্যিক আদান-প্রদান প্রায়শই উল্লেখযোগ্য পর্যায়ে অব্যাহত ছিল। এটি বন্ধুত্ব নয়, তবে মানুষ যেমনটা ভাবে, তেমন সম্পূর্ণ বিচ্ছেদও নয়।

এরপর রয়েছে সেই সব দেশ, যাদের প্রায়ই নিরপেক্ষ বলা হয়, যদিও নিরপেক্ষতা নিজেই এক ধরনের শক্তিতে পরিণত হয়েছে। ভারত এর একটি ভালো উদাহরণ। গত দুই দশকে দেশটি ইসরায়েলের সাথে শক্তিশালী প্রতিরক্ষা ও প্রযুক্তি সম্পর্ক গড়ে তুলেছে এবং ইসরায়েলি সামরিক সরঞ্জামের অন্যতম বড় ক্রেতা। একই সাথে, নয়াদিল্লি আরব দেশগুলোর সাথেও যোগাযোগ রক্ষা করেছে এবং আন্তর্জাতিক মঞ্চে দ্বি-রাষ্ট্র সমাধানের পক্ষে সমর্থন জানিয়েছে। চীন আরেকটি উদাহরণ। দেশটি নৈতিকভাবে নিরপেক্ষ না হলেও, প্রায়শই নিজেকে সব পক্ষের জন্য কূটনৈতিকভাবে উন্মুক্ত হিসেবে উপস্থাপন করে এবং অঞ্চলজুড়ে অর্থনৈতিক সম্পর্ক বজায় রাখে। বেইজিং বন্দর, জ্বালানি পথ এবং পরিকাঠামোতে ক্রমবর্ধমান আগ্রহী এবং ওয়াশিংটনের বিকল্প মধ্যস্থতাকারী হিসেবে নিজেকে উপস্থাপন করে লাভবান হতে চায়। রাশিয়া, ইউক্রেনে নিজের যুদ্ধ এবং ইরানের সাথে পরিবর্তনশীল সম্পর্ক সত্ত্বেও, বিভিন্ন সময়ে ইসরায়েলের সাথে যোগাযোগের পথ খোলা রাখার চেষ্টা করেছে, যদিও এই অঞ্চলের অন্যত্র সামরিক ও রাজনৈতিক সম্পর্ক গভীর করেছে।

এই অস্থিতিশীল মানচিত্রের কারণ বিভ্রান্তি নয়, বরং এক নতুন ধরনের আন্তর্জাতিক রাজনীতি। দেশগুলো এখন পুরনো মতাদর্শের ভিত্তিতে নয়, বরং তাৎক্ষণিক কৌশলগত স্বার্থের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নিচ্ছে। অনেক পশ্চিমা সরকারের জন্য, ইসরায়েলের প্রতি সমর্থন প্রতিরক্ষা সহযোগিতা, গোয়েন্দা তথ্য বিনিময় এবং অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক ইতিহাসের সাথে জড়িত, বিশেষ করে হলোকাস্টের পর থেকে। উপসাগরীয় দেশগুলোর জন্য, ইসরায়েলের সাথে নীরব বা আনুষ্ঠানিক সম্পর্ক ইরানের বিষয়ে উদ্বেগ, উন্নত প্রযুক্তিতে আগ্রহ এবং ওয়াশিংটনের সাথে ঘনিষ্ঠ হওয়ার ইচ্ছার প্রতিফলন। ভারত ও চীনের মতো উদীয়মান শক্তিগুলোর লক্ষ্য হলো নমনীয়তা বজায় রাখা। তারা অন্যের আঞ্চলিক সংঘাতে জড়িয়ে পড়তে চায় না। তারা জ্বালানি নিরাপত্তা, বিনিয়োগের সুযোগ এবং কূটনৈতিক পরিসর চায়।

জনমত একটি বড় কারণ, যার জন্য সরকারি নীতি এখন এতটা টানাপোড়েনের মধ্যে রয়েছে। অনেক দেশে সরকারের এক ধরনের কৌশলগত স্বার্থ রয়েছে, আর তাদের নাগরিকদের রয়েছে আরেক ধরনের নৈতিক প্রতিক্রিয়া। গাজা যুদ্ধের পর এই ব্যবধান আরও বেড়েছে। ইউরোপ, উত্তর আমেরিকা, লাতিন আমেরিকা, আফ্রিকা ও এশিয়ার বড় শহরগুলোতে ব্যাপক বিক্ষোভে যুদ্ধবিরতি বা ফিলিস্তিনি বেসামরিক নাগরিকদের দুর্ভোগের বিষয়ে কঠোর পদক্ষেপের দাবি উঠেছে। আন্তর্জাতিক আদালতে মামলা এবং জাতিসংঘের বিতর্ক সরকারের জন্য এই বিষয়টিকে একটি সংকীর্ণ দ্বিপাক্ষিক বিষয় হিসেবে দেখা কঠিন করে তুলেছে। এমনকি যে রাষ্ট্রগুলো ইসরায়েলের সাথে ঘনিষ্ঠ নিরাপত্তা সম্পর্ক রাখতে চায়, তারাও এখন আইনি, নির্বাচনী এবং সুনামের দিক থেকে ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছে, যদি তারা মানবিক উদ্বেগের প্রতি উদাসীন বলে পরিচিত হয়।

এর পরিণতি গুরুতর। ইসরায়েলের জন্য, বিপদ কেবল শত্রুদের কাছ থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়া নয়, অংশীদারদের মধ্যেও সমর্থন কমে যাওয়া। একটি দেশ কিছু মিত্রের কাছ থেকে সামরিক সমর্থন বজায় রাখতে পারলেও আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান, বাণিজ্য আলোচনা, অ্যাকাডেমিক যোগাযোগ এবং জনসমর্থনের ক্ষেত্রে কূটনৈতিক পরিসর হারাতে পারে। এটি সূক্ষ্মভাবে প্রতিরোধ ক্ষমতাকে দুর্বল করে। এটি একসময় সম্ভাবনাময় বলে মনে হওয়া আঞ্চলিক প্রকল্পগুলোকেও প্রভাবিত করে, যার মধ্যে রয়েছে পরিবহন করিডোর, জ্বালানি সহযোগিতা এবং সৌদি আরবের মতো আরব দেশগুলোর সাথে বৃহত্তর সম্পর্ক স্বাভাবিকীকরণ। বৃহত্তর বিশ্বের জন্য, বিষয়টি আরও বড়। আন্তর্জাতিক আইন ধারাবাহিকভাবে প্রয়োগ করা হয় নাকি বেছে বেছে প্রয়োগ করা হয়, ইসরায়েল তার একটি স্পষ্ট পরীক্ষায় পরিণত হয়েছে। গ্লোবাল সাউথের অনেক দেশ ইতিমধ্যেই বিশ্বাস করে যে, পশ্চিমা ঘনিষ্ঠ অংশীদারদের চেয়ে দুর্বল রাষ্ট্রগুলোর বিরুদ্ধে বৈশ্বিক নিয়মগুলো আরও কঠোরভাবে প্রয়োগ করা হয়। জাতিসংঘে প্রতিটি নতুন ভোট এই ধারণাকে আরও শক্তিশালী করে।

একটি স্থিতিশীল ভবিষ্যতের জন্য প্রতিটি দেশকে বন্ধু, শত্রু বা নিরপেক্ষ হিসেবে চিহ্নিত করার মিথ্যা স্বস্তি থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। ইসরায়েলের সাথে সম্পর্ক রাখা সরকারগুলোর আরও স্পষ্ট মানদণ্ড প্রয়োজন। এর অর্থ হলো বেসামরিক নাগরিকদের সুরক্ষা সমর্থন করা, বিশ্বাসযোগ্য কূটনীতিকে সমর্থন করা এবং আইনি নীতিগুলো ধারাবাহিকভাবে প্রয়োগ করা, कर्তা মার্কিন মিত্র, ইরানের প্রক্সি বা কোনো আঞ্চলিক রাষ্ট্র যেই হোক না কেন। এর অর্থ এটাও স্বীকার করা যে, ফিলিস্তিন সংকটের অগ্রগতি ছাড়া সম্পর্ক স্বাভাবিকীকরণের একটি সীমা রয়েছে। গত কয়েক বছর দেখিয়েছে যে অর্থনৈতিক চুক্তি এবং গোয়েন্দা অংশীদারিত্ব নীরবে গভীর হতে পারে, কিন্তু তারা সংঘাতের রাজনৈতিক মূলকে মুছে ফেলতে পারে না।

বিশ্বে ইসরায়েলের অবস্থান কোনো সরল মানচিত্রে স্থির নয়। এটি সমর্থন, অসন্তোষ, নির্ভরতা এবং সতর্কতার এক জালে আবদ্ধ। কিছু রাষ্ট্র একে অস্ত্র দেয়, কিছু এর নিন্দা করে, এবং অনেকেই বিভিন্ন মঞ্চে দুটোই করে। এটাই তার বৈশ্বিক অবস্থানের আসল চিত্র। বিশ্ব আর দেশগুলোকে সুস্পষ্ট শিবিরে ভাগ করছে না। বরং প্রতিটি সম্পর্কের মূল্য কতটুকু, প্রতিটি সরকার নিজ দেশে কী রক্ষা করতে পারে, এবং পুরনো জোটগুলো নতুন চাপের মুখে আর কতদিন টিকতে পারে, তা পরিমাপ করছে। এই পরিবর্তনশীল প্রেক্ষাপটে, সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দেশগুলো হয়তো ইসরায়েলের সবচেয়ে সোচ্চার বন্ধু বা कट्टर শত্রু নয়, বরং সেই দেশগুলো যারা কোনো নির্দিষ্ট পক্ষ নেয়নি এবং সিদ্ধান্ত নিচ্ছে যে পুরনো ভারসাম্য আর কতদিন টিকিয়ে রাখা সম্ভব।

Publication

The World Dispatch

Source: Editorial Desk

Category: World