মাস্টারবেশন: অভ্যাসের চেয়ে একে ঘিরে থাকা লজ্জাই যৌনস্বাস্থ্যের বেশি ক্ষতি করছে

১ এপ্রিল, ২০২৬

মাস্টারবেশন: অভ্যাসের চেয়ে একে ঘিরে থাকা লজ্জাই যৌনস্বাস্থ্যের বেশি ক্ষতি করছে

প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে অনেক প্রাপ্তবয়স্ক মানুষকে একই কথা শেখানো হয়েছে। তাদের বলা হতো, মাস্টারবেশন একটি খারাপ অভ্যাস, দুর্বলতার লক্ষণ কিংবা স্বাস্থ্য ও নৈতিকতার জন্য হুমকিস্বরূপ। পরিবার, স্কুল, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান এবং অনলাইন দুনিয়ায় এই ধারণা এখনও টিকে আছে। তবে আশ্চর্যের বিষয় হলো, মূলধারার চিকিৎসা বিজ্ঞান মাস্টারবেশনকে মোটেও ক্ষতিকর মনে করে না। বরং যৌনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা দীর্ঘদিন ধরেই বলে আসছেন, এটি সব বয়সের, লিঙ্গের এবং বিবাহিত বা অবিবাহিত সবার জন্যই একটি খুব সাধারণ ও স্বাভাবিক আচরণ। জনস্বার্থের আসল সমস্যা এই কাজটি নয়, বরং এর সাথে জুড়ে থাকা লজ্জা।

এই বিষয়টা নিয়ে কথা বলা জরুরি। কারণ লজ্জা শুধু মনের ভেতরেই সীমাবদ্ধ থাকে না। মানুষ নিজের শরীর সম্পর্কে কী জানে, সঙ্গীর সাথে কীভাবে কথা বলে, চিকিৎসকের কাছে যায় কি না এবং নিজেকে কীভাবে বিচার করে—এই সবকিছুর ওপরই লজ্জার প্রভাব পড়ে। আমাদের সমাজ আগের চেয়ে যৌনতা নিয়ে অনেক বেশি খোলামেলা। তবুও মাস্টারবেশন নিয়ে কথা বলতে গেলে আজও এক ধরনের অস্বস্তি বা নৈতিক ভয় কাজ করে। এই নীরবতার কারণে মানুষের মনে পুরোনো ভুল ধারণাগুলো থেকেই যায়। অথচ ঠিক এই সময়েই সঠিক এবং বাস্তবসম্মত যৌনস্বাস্থ্য বিষয়ক তথ্য সবচেয়ে বেশি দরকার।

গবেষণায় একটি বিষয় সবসময়ই পরিষ্কার: মাস্টারবেশন খুবই সাধারণ একটি বিষয়। আমেরিকা, ইউরোপ এবং অস্ট্রেলিয়ার বিভিন্ন জাতীয় জরিপ থেকে দেখা যায়, বিপুল সংখ্যক প্রাপ্তবয়স্ক মানুষ মাস্টারবেশন করেন। তবে বয়স, লিঙ্গ এবং সম্পর্কের অবস্থার ওপর ভিত্তি করে এর হার ভিন্ন হতে পারে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা এবং অন্যান্য জনস্বাস্থ্য প্রতিষ্ঠান যৌন সুস্থতাকে সামগ্রিক স্বাস্থ্যেরই একটি অংশ বলে মনে করে। তাদের মতে, একাকী যৌন আচরণ কোনো রোগ নয়, বরং এটি যৌনতারই একটি স্বাভাবিক প্রকাশ।

চিকিৎসা প্রতিষ্ঠানগুলোও পুরোনো দিনের ভয়ের কথাগুলো উড়িয়ে দিয়েছে। মাস্টারবেশন করলে অন্ধ হয়ে যায়, সন্তান হয় না, শরীর দুর্বল হয়ে পড়ে বা মানসিক সমস্যা দেখা দেয়—এমন অনেক ভুল ধারণা সমাজে প্রচলিত আছে। কিন্তু এর পক্ষে কোনো নির্ভরযোগ্য প্রমাণ নেই। ক্লিভল্যান্ড ক্লিনিক, মেয়ো ক্লিনিক এবং ব্রিটেনের ন্যাশনাল হেলথ সার্ভিসের মতো বড় বড় স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানগুলো বলছে, মাস্টারবেশন সাধারণত সম্পূর্ণ নিরাপদ। এটি তখনই সমস্যার কারণ হতে পারে, যখন এটি আসক্তিতে পরিণত হয়। অথবা যখন এটি দৈনন্দিন জীবনে বাধা সৃষ্টি করে, মানসিক চাপ বাড়ায় বা অনিরাপদ উপায়ের কারণে কোনো আঘাত লাগে। আর এই ব্যাপারটা কাজটিকে সরাসরি খারাপ বলার চেয়ে একেবারেই আলাদা।

তাহলে এই কলঙ্ক বা স্টিগমা এখনও এত প্রবল কেন? এর পেছনের একটি কারণ হলো ইতিহাস। ১৮ এবং ১৯ শতকের পশ্চিমা চিকিৎসা ও নৈতিক শিক্ষায় মাস্টারবেশনকে বিপজ্জনক হিসেবে দেখা হতো। আত্মনিয়ন্ত্রণ, ধর্ম এবং সামাজিক শৃঙ্খলার মতো বিষয়গুলোর সাথে এই ভয়ের সম্পর্ক ছিল। অনেক সংস্কৃতিতেই এমন ভীতি ছিল, শুধু ধরনটা ছিল আলাদা। সময়ের সাথে সাথে ভাষার পরিবর্তন হলেও মূল বার্তা একই ছিল: যৌন আনন্দ কেবল নির্দিষ্ট গণ্ডির মধ্যেই গ্রহণযোগ্য। সাধারণত বিয়ের পর এবং সন্তান জন্মদানের উদ্দেশ্যেই এটি সমর্থন করা হতো। এর বাইরের কোনো ব্যক্তিগত কাজকে সহজেই 'বিচ্যুতি' বা খারাপ বলে আখ্যা দেওয়া হতো।

আধুনিক ডিজিটাল সংস্কৃতি এই পুরোনো বিশ্বাসগুলো মুছে ফেলতে পারেনি। বরং কোনো কোনো ক্ষেত্রে এটি সেগুলোকে নতুন করে ফিরিয়ে এনেছে। সোশ্যাল মিডিয়ায় অনেক ওয়েলনেস ইনফ্লুয়েন্সার বা তথাকথিত 'মাসকুলিনিটি কোচ' আত্মবিশ্বাসের সাথে ভিত্তিহীন দাবি ছড়াচ্ছেন। কেউ কেউ মাস্টারবেশনকে কাজের প্রতি আগ্রহ কমার কারণ হিসেবে দায়ী করেন। আবার অনেকে বলেন, এটি শারীরিক শক্তি, সম্পর্ক বা পুরুষত্ব নষ্ট করে দেয়। আবার কেউ কেউ মনে করেন, মাস্টারবেশন থেকে বিরত থাকলেই সব সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে। একাকীত্ব, বিষণ্ণতা, অতিরিক্ত পর্ন আসক্তি বা আত্মবিশ্বাসের অভাবের মতো বাস্তব সমস্যাগুলোর সহজ সমাধান দেয় বলে এই কথাগুলো খুব দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। কিন্তু সব ধরনের মানসিক বা যৌন সমস্যার জন্য মাস্টারবেশনকে দায়ী করা আর সেই সমস্যাগুলো গভীরভাবে বোঝা এক জিনিস নয়।

এর পরিণতি মারাত্মক হতে পারে। মাস্টারবেশন নিয়ে লজ্জা মানুষের মনে অপরাধবোধ, দুশ্চিন্তা এবং নিজের শরীর সম্পর্কে ভুল ধারণার জন্ম দেয়। যেসব সমাজে যৌনশিক্ষার অভাব রয়েছে, সেখানে এই সমস্যা আরও বেশি। যৌনবিজ্ঞান ও মানসিক স্বাস্থ্যের গবেষণায় দেখা গেছে, যারা মাস্টারবেশন সম্পর্কে নেতিবাচক ধারণা পোষণ করেন, তারা যৌনতা নিয়ে বেশি অপরাধবোধ এবং মানসিক কষ্টে ভোগেন। বাস্তবে এর মানে হলো, ওই মানুষগুলো নিজের ভালো লাগা নিয়ে সঙ্গীর সাথে কথা বলতে পারেন না। কোনো ব্যথা বা সমস্যা বুঝতে পারেন না। আবার লজ্জায় কারও কাছে সাহায্যও চাইতে পারেন না। যে ব্যক্তি নিজের যৌনতাকে ভয় পেতে শিখেছে, সে সঙ্গীর সাথে মিলিত হওয়ার সময় আত্মবিশ্বাসের বদলে বিভ্রান্তিতে ভোগে।

এই প্রভাব সম্পর্কের ভেতরেও দেখা যেতে পারে। অনেকেই ভয় পান যে, সঙ্গী মাস্টারবেশন করলে হয়তো সম্পর্কে তার কোনো অতৃপ্তি আছে। কিন্তু এটি সম্পূর্ণ ভুল ধারণা। অনেক থেরাপিস্ট বলেন, সুস্থ যৌনজীবনের পাশাপাশি মাস্টারবেশনের অভ্যাস থাকতেই পারে। অনেকের কাছে এটি সঙ্গীর সাথে চাহিদার পার্থক্য মেটানোর একটি উপায়। এছাড়াও মানসিক চাপ কমানো, ভালো ঘুম হওয়া বা নিজের শরীরের সাথে যুক্ত থাকার জন্য অনেকেই এটি করেন। বিশেষ করে অসুস্থতা, গর্ভাবস্থার পরে বা জীবনে সঙ্গী না থাকার সময় এটি সাহায্য করতে পারে। সমস্যা আসলে একাকী এই আনন্দ থেকে তৈরি হয় না। সমস্যা তৈরি হয় লুকোচুরি, অসততা, আসক্তি বা পারস্পরিক বোঝাপড়ার অভাব থেকে। এগুলো আসলে সম্পর্কের সমস্যা। এর মানে এই নয় যে মাস্টারবেশন নিজেই কোনো ক্ষতিকর কাজ।

লজ্জা যখন মৌলিক শিক্ষায় বাধা দেয়, তখন জনস্বাস্থ্যেরও অনেক বড় ক্ষতি হয়। অনেক জায়গায় যৌনশিক্ষায় শুধু গর্ভাবস্থা এবং রোগ প্রতিরোধ নিয়েই আলোচনা করা হয়। সেখানে আনন্দ, সম্মতি, উত্তেজনা বা শারীরিক গঠন নিয়ে কোনো কথাই বলা হয় না। এর ফলে প্রাপ্তবয়স্কদের মধ্যে বড় ধরনের অজ্ঞতা থেকে যায়। বিভিন্ন দেশের গবেষণায় দেখা গেছে, অনেক নারী নিজের ক্লাইটোরিস এবং যৌন অনুভূতি সম্পর্কে খুব সামান্য জ্ঞান নিয়েই বড় হন। এর পরিণতি বেশ খারাপ। এতে এমন এক ধারণার জন্ম হয় যে, নারীর আনন্দ পাওয়াটা খুব একটা জরুরি নয় বা এটি একটি রহস্যময় বিষয়। এর ফলে পুরুষদের তুলনায় নারীদের মাস্টারবেশনকে আরও বড় নিষিদ্ধ বিষয় বা ট্যাবু হিসেবে দেখা হয়। একে কোনোভাবেই শালীনতা বলা যায় না। এটি আসলে শালীনতার মোড়কে লুকিয়ে থাকা এক ধরনের বৈষম্য।

এর মানে এই নয় যে মাস্টারবেশনের সব ধরনই স্বাস্থ্যকর। অন্য যেকোনো আচরণের মতো যৌন আচরণও সমস্যা হয়ে দাঁড়াতে পারে। বিশেষ করে যখন এটি আসক্তিতে রূপ নেয়, বাস্তব জীবন থেকে পালানোর উপায় হিসেবে ব্যবহৃত হয়, ক্ষতিকর কনটেন্ট বা পর্নোগ্রাফির সাথে যুক্ত থাকে কিংবা শরীরে আঘাতের সৃষ্টি করে। মানসিক স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা এখন এসব ক্ষেত্রে খুব সাবধানে কথা বলেন। তাদের চিন্তার বিষয় এটি নয় যে, কেউ নৈতিকভাবে নিচে নেমে গেছে কি না। বরং তারা দেখেন আচরণটি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেছে কি না, মানসিক চাপ বাড়াচ্ছে কি না বা দৈনন্দিন কাজ ও সম্পর্কে প্রভাব ফেলছে কি না। এটি বিচারের একটি অনেক ভালো উপায়। কারণ এটি বংশপরম্পরায় পাওয়া ভয়ের ওপর ভিত্তি করে নয়, বরং প্রমাণ এবং বাস্তব ক্ষতির ওপর জোর দেয়।

একটি ভালো সমাধানের শুরু হতে পারে পরিষ্কার ও সহজ ভাষার মাধ্যমে। অভিভাবক, শিক্ষক, চিকিৎসক এবং সংবাদমাধ্যমগুলোর উচিত মাস্টারবেশনকে নোংরা বা তুচ্ছ বিষয় হিসেবে না দেখা। স্বাস্থ্যের অন্য বিষয়গুলো নিয়ে যেভাবে আলোচনা করা হয়, এটি নিয়েও সেভাবেই সহজ ও শান্তভাবে কথা বলা উচিত। যৌনশিক্ষায় পরিষ্কারভাবে জানানো উচিত যে মাস্টারবেশন একটি সাধারণ বিষয়। এর সাথে ব্যক্তিগত গোপনীয়তা এবং সম্মতির বিষয়গুলোও শেখাতে হবে। মনে কোনো ফ্যান্টাসি বা কল্পনা আসা মানেই তা বাস্তবে করার ইচ্ছা প্রকাশ করে না। আর কোনো আচরণ যদি আসক্তির পর্যায়ে চলে যায় বা অনিরাপদ মনে হয়, তবে সাহায্য চাওয়া উচিত। চিকিৎসকদের উচিত কোনো রকম বিচার না করেই রোগীর যৌন সুস্থতা নিয়ে কথা বলা। আবার সঙ্গীর কোনো ব্যক্তিগত আচরণকে সরাসরি বিশ্বাসঘাতকতা মনে না করে, নিজেদের প্রত্যাশাগুলো নিয়ে খোলাখুলি কথা বলা উচিত।

সমাজের এই বড় পরিবর্তনটা ধীরে ধীরে হতে পারে, কিন্তু এটি খুবই জরুরি। প্রাপ্তবয়স্কদের নিজের শরীর নিয়ে ভয় দেখালে তারা কখনোই সুস্থ থাকতে পারবে না। তারা তখনই সুস্থ হতে পারবে, যখন তারা ভিত্তিহীন ধারণাকে প্রমাণ থেকে এবং অপরাধবোধকে আসল ঝুঁকি থেকে আলাদা করতে শিখবে। দশকের পর দশক ধরে চলা গবেষণার মূল শিক্ষা এটা নয় যে, সব ক্ষেত্রেই মাস্টারবেশনকে উৎসাহিত বা উদযাপন করতে হবে। বিষয়টা এর চেয়েও অনেক সহজ। একটি সাধারণ মানব আচরণ কেবল এই কারণে বিপজ্জনক হয়ে যায় না যে, সমাজ বিষয়টি নিয়ে লজ্জিত।

এই আলোচনা শুধু শোবার ঘরের চার দেয়ালেই সীমাবদ্ধ থাকা উচিত নয়। যৌনতা বিষয়ক জ্ঞানে যখন লজ্জা বাধা হয়ে দাঁড়ায়, তখন সেখানে জায়গা করে নেয় ভুল তথ্য। এর ফলে মানুষ সম্পর্ক, চিকিৎসকের পরামর্শ এবং ব্যক্তিগত জীবনে এমন এক ভয় নিয়ে বাঁচে, যা সহজেই এড়ানো যেত। একটি সচেতন ও পরিণত সমাজের উচিত প্রমাণের ভিত্তিতে কথা বলা। আর প্রমাণ বলে: মাস্টারবেশন নিজে থেকে কোনো খারাপ কিছু নয়, কিন্তু একে ঘিরে থাকা নীরবতা এবং কলঙ্কই মানুষের সবচেয়ে বেশি ক্ষতি করে।

Publication

The World Dispatch

Source: Editorial Desk

Category: Adult