ইরানের সঙ্গে যুদ্ধে 'জেতার' আসল অর্থ কী
১ এপ্রিল, ২০২৬

ইরানের সঙ্গে যুদ্ধের সবচেয়ে বড় ভুল ধারণা হলো— এর জয় খুব সহজেই বোঝা যাবে। অনেকেই স্পষ্ট একটি সামরিক বিজয়ের কথা ভাবেন। যেমন: ধ্বংস হয়ে যাওয়া মিসাইল সাইট, পরমাণু কেন্দ্র, দুর্বল হয়ে পড়া সামরিক কমান্ডার এবং বাধ্য হয়ে পিছু হঠার দৃশ্য। কিন্তু আধুনিক যুদ্ধ, বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্যে, এত সহজে শেষ হয় না। আসল প্রশ্ন এটা নয় যে শক্তিশালী কোনো সামরিক বাহিনী ইরানে হামলা চালাতে পারবে কি না। বরং প্রশ্ন হলো, কোনো বহিরাগত শক্তি বড় ধরনের আঞ্চলিক সংঘাত উসকে না দিয়ে নিজেদের রাজনৈতিক লক্ষ্য অর্জন করতে পারবে কি না। কারণ এই বৃহত্তর সংঘাতের মাশুল মূল সমস্যার চেয়েও অনেক বেশি হতে পারে।
এই পার্থক্যটা বোঝা জরুরি। কারণ ইরান ২০০৩ সালের ইরাক বা ২০০১ সালের আফগানিস্তান নয়। এটি কোনো ছোট ও বিচ্ছিন্ন রাষ্ট্রও নয়। প্রায় ৯ কোটি মানুষের এই দেশে অনেক অভ্যন্তরীণ বিভেদ রয়েছে। তবে বিদেশি চাপের মুখে জাতীয়তাবাদ ও প্রতিরোধের এক দীর্ঘ ইতিহাসও তাদের আছে। তাদের মূল কৌশল হলো শক্তিশালী শত্রুদের হারিয়ে দেওয়ার বদলে তাদের সামনে টিকে থাকা। গত কয়েক দশক ধরে তেহরান মিসাইল, ড্রোন, প্রক্সি মিলিশিয়া, সাইবার টুল এবং সমুদ্রে বাধা সৃষ্টির সক্ষমতার পেছনে প্রচুর বিনিয়োগ করেছে। এসব হাতিয়ার হলিউড সিনেমার মতো যুদ্ধ জেতার জন্য তৈরি হয়নি। বরং এগুলো তৈরি হয়েছে শত্রুকে চরম মূল্য চোকাতে বাধ্য করার জন্য।
এর প্রমাণ এখনই দেখা যাচ্ছে। ইরান ও তার মিত্ররা প্রমাণ করেছে যে, তারা বাণিজ্যিক জাহাজের রুটে হুমকি তৈরি করতে পারে। ইরাক ও সিরিয়ায় থাকা মার্কিন ঘাঁটিতে হামলা করতে পারে। হিজবুল্লাহ এবং হুথিদের মতো গোষ্ঠীকে অস্ত্র দিতে পারে। এছাড়া পরোক্ষ সংঘাতের মাধ্যমে ইসরায়েল এবং উপসাগরীয় দেশগুলোর ওপর চাপ বজায় রাখতে পারে। ইউএস এনার্জি ইনফরমেশন অ্যাডমিনিস্ট্রেশন (EIA) দীর্ঘদিন ধরেই হরমুজ প্রণালিকে বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ তেলের চেকপয়েন্ট হিসেবে চিহ্নিত করে আসছে। কোনো কোনো বছর বিশ্বের মোট জ্বালানি তেলের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ এই পথেই পরিবহন করা হয়েছে। তার মানে এই নয় যে ইরান চাইলেই দীর্ঘদিন এই পথ বন্ধ রাখতে পারবে। মার্কিন নৌবাহিনী এবং তাদের মিত্রদের নৌবহর অনেক বেশি শক্তিশালী। কিন্তু সাময়িক বাধা বা শুধু এর ভয়ও জাহাজের ইন্স্যুরেন্সের খরচ বাড়িয়ে দিতে পারে। ফলে বিশ্বজুড়ে জ্বালানির দাম বেড়ে যায় এবং বাজারে অস্থিরতা তৈরি হয়।
ইতিহাস আমাদের শেখায়, সাফল্যকে ছোট পরিসরে মাপা ঠিক নয়। ২০০৩ সালে যুক্তরাষ্ট্র খুব সহজেই সাদ্দাম হোসেনের সরকারকে সরিয়ে দিয়েছিল। কিন্তু এরপর যা ঘটেছিল, তা নিয়ন্ত্রণ করা তাদের জন্য মোটেও সহজ ছিল না। ব্রাউন ইউনিভার্সিটির ‘কস্টস অফ ওয়ার’ প্রজেক্টের হিসাব অনুযায়ী, ৯/১১ পরবর্তী যুদ্ধগুলোতে সরাসরি লাখো মানুষের মৃত্যু হয়েছে এবং ট্রিলিয়ন ট্রিলিয়ন ডলার খরচ হয়েছে। পাশাপাশি এক প্রজন্মের জন্য সমাজ ব্যবস্থাকে অস্থিতিশীল করে তুলেছে। ইরানের ক্ষেত্রে যুদ্ধক্ষেত্রটি হয়তো ভিন্ন হবে। তবে শিক্ষাটি একই— যুদ্ধের শুরুর দিককার কৌশলগত সাফল্য অনেক সময় ভবিষ্যতের বড় ব্যর্থতাকে আড়াল করে দেয়।
এমনকি ইরানের পরমাণু কর্মসূচিকে লক্ষ্য করে ছোট পরিসরে হামলা চালালেও তার ফল কী হবে তা অনিশ্চিত। বিমান হামলা করে স্থাপনাগুলো হয়তো ক্ষতিগ্রস্ত করা যায়, বিশেষজ্ঞদের হত্যা করা যায় এবং পুরো প্রক্রিয়াকে কিছুটা পিছিয়ে দেওয়া যায়। তবে ‘ইন্টারন্যাশনাল ইন্সটিটিউট ফর স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজ’ এবং অন্যান্য নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞরা বারবার বলেছেন, বিভিন্ন জায়গায় ছড়িয়ে থাকা পরমাণু কর্মসূচি শুধু বিমান হামলা দিয়ে ধ্বংস করা কঠিন। মাটির নিচের স্থাপনা, কারিগরি জ্ঞান এবং নতুন করে গড়ে তোলার রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত— এসব কিছু বোমার আঘাতের পরও টিকে থাকতে পারে। বরং সামরিক হামলা ইরানের ভেতরে এই যুক্তিকেই আরও জোরালো করবে যে, ভবিষ্যতে এ ধরনের আক্রমণ ঠেকাতে আরও উন্নত প্রতিরোধ ব্যবস্থা দরকার।
এখানেই সমস্যার মূল কারণটি লুকিয়ে আছে। 'জেতা' নিয়ে আলোচনা সাধারণত সামরিক শক্তির হিসাব দিয়ে শুরু হয়। কিন্তু আসল লড়াইটা রাজনৈতিক। ইরানের নেতারা বছরের পর বছর ধরে নিজেদের দুর্বলতাকে হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করতে শিখেছেন। অবরোধের কারণে তাদের অর্থনীতি মারাত্মক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। মূল্যস্ফীতি ও বেকারত্ব সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনকে কঠিন করে তুলেছে। বিক্ষোভ থেকে স্পষ্ট বোঝা যায় জনগণের মনে কতটা ক্ষোভ জমে আছে। তবুও বাইরের চাপ তাদের আত্মসমর্পণ করাতে পারেনি। উল্টো, এটি কট্টরপন্থিদের এই যুক্তি দেখাতে সাহায্য করে যে— আপস করার মানেই হলো অপমানিত হওয়া। চাপের মুখে কোনো রাষ্ট্র দুর্বল হতে পারে, তবে তা আগের চেয়ে আরও বেশি ভয়ংকরও হয়ে উঠতে পারে।
এ কারণেই ইরানের আঞ্চলিক নেটওয়ার্ক এত বেশি গুরুত্বপূর্ণ। তেহরান শুধু নিজের সামরিক বাহিনীর ওপর নির্ভর করে না। তারা লেবানন, ইরাক, সিরিয়া ও ইয়েমেন জুড়ে সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক গড়তে বছরের পর বছর সময় ব্যয় করেছে। এই জোটগুলো যে সবসময় তাদের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে থাকে, তা নয়। অনেকেরই নিজস্ব লক্ষ্য রয়েছে। তবে তারা ইরানের জন্য একটি কৌশলগত গভীরতা তৈরি করে। ইরানে হামলা হলে তার জবাব হয়তো একটি ফ্রন্ট থেকে আসবে না। অনেক দিক থেকেই হামলা হতে পারে। তার মানে হলো— ইসরায়েলের শহর, মার্কিন ঘাঁটি, লোহিত সাগরের বাণিজ্যিক পথ, উপসাগরীয় শক্তির জ্বালানি অবকাঠামো এবং আগে থেকেই অস্থিতিশীল দেশগুলো— সবই যুদ্ধক্ষেত্রে পরিণত হতে পারে।
সাধারণ মানুষের জন্য এখানেই সবচেয়ে বড় ভোগান্তি তৈরি হয়। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে লোহিত সাগরে জাহাজ চলাচলে বাধা এবং আঞ্চলিক উত্তেজনার কারণে সাধারণ মানুষের জীবনে প্রভাব পড়েছে। জ্বালানির দাম, পণ্য পরিবহনের খরচ এবং মূল্যস্ফীতি— এসবের মাধ্যমে বহু দূরের যুদ্ধও কত দ্রুত সাধারণ পরিবারগুলোর ক্ষতি করতে পারে, তা দেখা গেছে। ইউক্রেনে রাশিয়ার আগ্রাসনের পর ইউরোপ বুঝতে পেরেছে জ্বালানির সংকট কত দ্রুত ছড়ায়। আর দরিদ্র দেশগুলো তা হাড়ে হাড়ে টের পেয়েছে খাদ্যের দাম আর ঋণের বোঝার মাধ্যমে। ইরানকে ছুঁয়ে যাওয়া একটি যুদ্ধ হয়তো আরেকটি ধারাবাহিক সংকটের জন্ম দিতে পারে। বিশেষ করে এই যুদ্ধে যদি উপসাগরীয় অঞ্চলের বড় তেল ও গ্যাস উৎপাদনকারী দেশগুলো জড়িয়ে পড়ে।
এর পাশাপাশি ক্ষমতা পরিবর্তনের মিথ্যা আত্মবিশ্বাসেরও বিপদ রয়েছে। ইরানের অনেক অঞ্চলে বর্তমান রাজনৈতিক ব্যবস্থা ব্যাপক অজনপ্রিয়। কিন্তু বিদেশি হামলা মানেই আপনাআপনি কোনো উদারপন্থি সরকার তৈরি হওয়া নয়। উল্টো, এর ফলে ভয়, দমন-পীড়ন এবং বিপদের সময় সরকারের পাশে দাঁড়ানোর প্রবণতা বাড়ে। যুদ্ধের সময় রাষ্ট্র নিয়ন্ত্রণ আরও কড়া করে। নিরাপত্তা সংস্থাগুলো আরও ক্ষমতা পায়। ভিন্নমতাবলম্বীদের ওপর বিশ্বাসঘাতকতার অভিযোগ আনা হয়। ইরাক, লিবিয়া ও সিরিয়ার অভিজ্ঞতা থেকে অন্তত এই ভুল ধারণা ভেঙে যাওয়া উচিত যে, একটি রাষ্ট্রকে ধ্বংস করা আর একটি নতুন ও উন্নত রাষ্ট্র গঠন করা— দুটো এক বিষয় নয়।
তাহলে বাস্তবে 'জেতা' বলতে কী বোঝায়? এর সবচেয়ে বাস্তবসম্মত উত্তরটি বেশ সাধারণ। এর মানে হলো— পারমাণবিক অস্ত্রের বিকাশ ঠেকানো, মিত্রদেশ ও বাণিজ্যের রুট রক্ষা করা, বেসামরিক মানুষের ক্ষতি কমানো এবং একটি দীর্ঘমেয়াদি আঞ্চলিক যুদ্ধ এড়ানো। এটি কোনো নাটকীয় স্লোগান নয়। কিন্তু কাজটা শুনতে যতটা সহজ মনে হয়, বাস্তবে তার চেয়ে অনেক বেশি কঠিন। এর জন্য প্রয়োজন প্রতিরোধ, কূটনীতি, গোয়েন্দা তৎপরতা, মিসাইল ডিফেন্স, সামুদ্রিক নিরাপত্তা এবং সংকটকালীন যোগাযোগের এক সঠিক মিশ্রণ। পাশাপাশি এই সত্যটাও মেনে নেওয়া দরকার যে— সব হুমকি শুধু বোমা মেরে দূর করা যায় না।
এখান থেকে কিছু বাস্তবসম্মত শিক্ষা নেওয়ার আছে। প্রথমত, কোনো সরকার যদি শক্তি প্রয়োগের কথা ভাবে, তবে প্রথম হামলার আগেই তাদের রাজনৈতিক লক্ষ্য স্পষ্ট করতে হবে, পরে নয়। দ্বিতীয়ত, যদি সামরিক ব্যবস্থা নিতেই হয়, তবে বড় বড় প্রতিশ্রুতির বদলে স্পষ্ট ও সীমিত লক্ষ্য থাকলেই তা বেশি কাজে আসতে পারে। তৃতীয়ত, কূটনীতিকে দুর্বলতা হিসেবে দেখা উচিত নয়। ২০১৫ সালের পরমাণু চুক্তিতে অনেক ভুলত্রুটি থাকতে পারে। কিন্তু এটি প্রমাণ করেছে যে, পরিদর্শন ও বিধিনিষেধের মাধ্যমে সংঘাত যতটা কমানো যায়, শুধু বিমান হামলা দিয়ে তা সম্ভব নয়। আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থার (IAEA) একটি নজরদারির ভূমিকা ছিল, যার ফলে বিশ্ব জানতে পারত ভেতরে কী হচ্ছে, যা পরে হারিয়ে গেছে। কোনো চুক্তিই হয়তো সব আঞ্চলিক সংঘাত মেটাতে পারবে না। কিন্তু সব জয় করে ফেলার ঘোষণার চেয়ে, যাচাইযোগ্য বিধিনিষেধ অনেক বেশি টেকসই হয়।
আঞ্চলিক শক্তিগুলোর জন্যও সংঘাত থেকে বেরিয়ে আসার পথ বা অফ-র্যাম্প থাকা জরুরি। এর মানে হলো হটলাইন, ব্যাক চ্যানেল বা গোপন যোগাযোগ ব্যবস্থা এবং রাষ্ট্র ও প্রক্সি গোষ্ঠীগুলোর ওপর চাপ প্রয়োগের ব্যবস্থা রাখা। এর মানে হলো— উপসাগরীয় দেশ, ইসরায়েল, ইউরোপীয় সরকার এবং ওয়াশিংটনকে তাৎক্ষণিক প্রতিশোধের চিন্তা বাদ দিয়ে সংঘাত কমানোর কথা ভাবতে হবে। নইলে পরিস্থিতি পরিচিত সেই পুরোনো দিকেই মোড় নেবে— যেখানে প্রতিটি পক্ষ দাবি করবে যে তারা প্রতিরোধ করছে, আর একটির পর একটি ভুলের কারণে পুরো অঞ্চলটি একটি বড় যুদ্ধের দিকে এগিয়ে যাবে।
পরিশেষে, ইরানের সঙ্গে যুদ্ধে 'জেতা' কথাটি ভুল মনে হতে পারে যদি এটি মনে করা হয় যে সব খুব সহজেই শেষ হয়ে যাবে। সামরিক শ্রেষ্ঠত্ব দিয়ে হয়তো লক্ষ্যবস্তু ধ্বংস করা যায়। কিন্তু এটি একাই স্থিতিশীল রাজনীতি, নিরাপদ সামুদ্রিক পথ, তেলের কম দাম, শান্ত সীমান্ত বা একটি নিরাপদ অঞ্চল নিশ্চিত করতে পারে না। অথচ মানুষ আসলে এসব ফলাফলই চায়। নেতারা যদি এটি ভুলে যান, তবে তারা হয়তো শুরুর যুদ্ধটা জিতে যাবেন, কিন্তু যে শান্তিটা সবচেয়ে বেশি দরকার ছিল, তাতেই হেরে বসবেন।