অ্যান্টার্কটিকায় দ্রুত গলছে বরফ, দক্ষিণ মেরু ছাড়িয়ে বিশ্বজুড়ে বাড়ছে জলবায়ু ঝুঁকি

১ এপ্রিল, ২০২৬

অ্যান্টার্কটিকায় দ্রুত গলছে বরফ, দক্ষিণ মেরু ছাড়িয়ে বিশ্বজুড়ে বাড়ছে জলবায়ু ঝুঁকি

বহু বছর ধরে অ্যান্টার্কটিকার অবস্থা দেখে মানুষের মনে জলবায়ু পরিবর্তন নিয়ে এক ধরনের ভুল ধারণা ছিল। আর্কটিক বা উত্তর মেরুর বরফ যখন দ্রুত গলছিল, তখন অ্যান্টার্কটিকার বরফের খুব একটা পরিবর্তন দেখা যায়নি। কখনো কখনো তা বেশ স্থিতিশীল মনে হতো। আগের এই চিত্রটি একটি মিথ্যা ধারণার জন্ম দিয়েছিল। মানুষ ভেবেছিল, দক্ষিণ মেরুর এই বরফরাজ্যে হয়তো বিশ্ব উষ্ণায়নের কোনো প্রভাব পড়বে না। কিন্তু ধারণাটি ভুল ছিল। গত কয়েক বছরে অ্যান্টার্কটিকা আমাদের সেই ভুল ভেঙে দিয়েছে। এই মহাদেশের চারপাশের বরফ কমে গিয়ে রেকর্ড ছুঁয়েছে। বিজ্ঞানীরা এখন বলছেন, এই পরিবর্তন বিশাল এবং আকস্মিক। একে সাধারণ কোনো ওঠানামা বলে উড়িয়ে দেওয়া যাবে না।

বরফ কমার পরিসংখ্যান বেশ চমকে দেওয়ার মতো। ২০২৩ সালে অ্যান্টার্কটিকার বরফ স্যাটেলাইট যুগের রেকর্ড অনুযায়ী সবচেয়ে নিচে নেমে আসে। স্যাটেলাইট যুগ শুরু হয়েছিল ১৯৭০-এর দশকের শেষের দিকে। যুক্তরাষ্ট্রের 'ন্যাশনাল স্নো অ্যান্ড আইস ডেটা সেন্টার'-এর তথ্য অনুযায়ী, শীতকালে বরফের পরিমাণ আগের গড় হিসাবের চেয়ে অনেক কমে গেছে। কয়েক মিলিয়ন বর্গ কিলোমিটার এলাকার বরফ উধাও হয়ে গেছে। এই ঘাটতি শুধু এক মৌসুমের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকেনি। ২০২৪ সাল পর্যন্ত অনেক অঞ্চলেই বরফ কমার এই ধারা অব্যাহত ছিল। এতে এই আশঙ্কা তৈরি হয়েছে যে, অ্যান্টার্কটিকা হয়তো আরও অস্থিতিশীল পর্যায়ে প্রবেশ করছে। যেসব গবেষক একসময় দক্ষিণ মেরুকে শুধু স্বাভাবিক পরিবর্তনের একটি জায়গা বলে মনে করতেন, তাঁরা এখন ভাবছেন সেখানে আরও বড় কোনো পরিবর্তন ঘটছে কি না।

বিষয়টি খুবই গুরুত্বপূর্ণ। কারণ এই বরফগুলো শুধু সমুদ্রে ভাসমান জমাট জল নয়। এগুলো অনেকটা সুরক্ষাকবচ বা ঢাল হিসেবে কাজ করে। চকচকে সাদা বরফ সূর্যের আলোকে মহাকাশে ফিরিয়ে দেয়। কিন্তু বরফবিহীন উন্মুক্ত অন্ধকার জল বেশি তাপ শুষে নেয়। সমুদ্র এবং বায়ুমণ্ডলের মধ্যে তাপ, আর্দ্রতা ও গ্যাসের আদান-প্রদান নিয়ন্ত্রণ করতেও সাহায্য করে এই বরফ। সুরক্ষার এই স্তরটি কমে গেলে সমুদ্র দ্রুত গরম হতে পারে। ঝড়ের আচরণ বদলে যেতে পারে। আর বছরে একবার বরফ জমার ওপর নির্ভর করে গড়ে ওঠা পুরো বাস্তুতন্ত্রও ভেঙে পড়তে পারে।

এর কারণগুলো বেশ জটিল হলেও রহস্যময় নয়। গ্রিনহাউস গ্যাসের আটকে রাখা অতিরিক্ত তাপের বিশাল অংশ শুষে নিয়েছে দক্ষিণ মহাসাগর। মানুষের কারণে সৃষ্ট উষ্ণায়ন পুরো ব্যবস্থায় অতিরিক্ত শক্তি জমা করেছে। যদিও এই শক্তি সবসময় ভূপৃষ্ঠের তাপমাত্রা সরাসরি বাড়ায় না। তবে বাতাস, সমুদ্রের স্রোত এবং আঞ্চলিক আবহাওয়ার পরিবর্তন হঠাৎ করে বরফ গলিয়ে দিতে পারে। অ্যান্টার্কটিকায় এর মানে হলো, সমুদ্রের গরম জল ওপরে উঠে এলে বরফ দ্রুত গলতে শুরু করে। এছাড়া ঝড়ো হাওয়া যখন ভঙ্গুর বরফ ভেঙে দেয় বা বাতাস যখন বরফকে পাতলা করে আরও বেশি জল উন্মুক্ত করে দেয়, তখনও বরফ দ্রুত কমে যায়।

বিজ্ঞানীরা আরও একটি বিষয়ের দিকে নির্দেশ করেছেন। সমুদ্রের গভীরের গরম জল নিচ থেকে 'আইস শেলফ' বা বরফের স্তরগুলোকে আঘাত করছে। আইস শেলফ এবং সাগরের ভাসমান বরফ এক জিনিস নয়। তবে এই ব্যবস্থাগুলো একে অপরের সঙ্গে যুক্ত। ভাসমান আইস শেলফগুলো পাতলা হয়ে গেলে এর পেছনের হিমবাহগুলো দ্রুত সমুদ্রে নেমে আসতে পারে। ব্রিটিশ অ্যান্টার্কটিক সার্ভে, নাসা এবং অন্যান্য সংস্থার গবেষণায় দেখা গেছে, পশ্চিম অ্যান্টার্কটিকার কিছু অংশ সমুদ্রের উষ্ণায়নের ঝুঁকিতে বেশি রয়েছে। সংবাদমাধ্যমে 'ডুমসডে গ্লেসিয়ার' বা 'প্রলয়ঙ্করী হিমবাহ' নামে পরিচিত থোয়াইটস গ্লেসিয়ার এর অন্যতম বড় উদাহরণ। যদিও এই নাম দিয়ে ধীর কিন্তু গুরুতর একটি প্রক্রিয়াকে অনেক সহজভাবে বোঝানো হয়। আসল ঝুঁকিটি এমন নয় যে আগামীকালই সবকিছু ভেঙে পড়বে। বরং এটি একটি অঞ্চলের ধীরে ধীরে দুর্বল হয়ে পড়া। এই অঞ্চলটি অনেক বিশাল বরফখণ্ডকে আটকে রাখে, যা গলে গেলে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে বিশ্বজুড়ে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা অনেকটাই বেড়ে যেতে পারে।

সাগরের বরফ কমার আরও কিছু তাৎক্ষণিক প্রভাব রয়েছে। খোদ অ্যান্টার্কটিকার বন্যপ্রাণীরা এর সরাসরি শিকার হচ্ছে। প্রজননের জন্য এম্পায়ার পেঙ্গুইনগুলো স্থিতিশীল বরফের ওপর নির্ভর করে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে স্যাটেলাইট বিশ্লেষণ ও সরাসরি পর্যবেক্ষণে দেখা গেছে, বরফ কমে যাওয়ায় সেখানে পেঙ্গুইনদের প্রজননে বড় ধরনের ব্যর্থতা দেখা দিচ্ছে। বেলিংশাউসেন সাগর অঞ্চলের কিছু কলোনিতে জলরোধী পালক গজানোর আগেই বরফ ভেঙে যাওয়ায় অনেক পেঙ্গুইন ছানা মারা গেছে। দক্ষিণ মহাসাগরের খাদ্যশৃঙ্খলের একেবারে নিচের দিকে থাকা 'ক্রিল' নামের ছোট প্রাণীও এই বরফের ওপর নির্ভর করে। সাগরের বরফ কমলে পেঙ্গুইন, সিল, তিমি এবং সামুদ্রিক পাখিরাও এর ভয়াবহ প্রভাব অনুভব করতে পারে।

এই ক্ষতিকর প্রভাব শুধু অ্যান্টার্কটিকাতেই সীমাবদ্ধ নেই। বৈশ্বিক জলবায়ু ব্যবস্থায় দক্ষিণ মহাসাগর বিশাল ভূমিকা পালন করে। এটি তাপ সঞ্চয় করে এবং মানুষের তৈরি কার্বন ডাই অক্সাইডের একটি বড় অংশ শুষে নেয়। এই ব্যবস্থাটি বদলে গেলে এর প্রভাব চারদিকে ছড়িয়ে পড়তে পারে। বিজ্ঞানীরা এখন গবেষণা করে দেখছেন, পাতলা বরফ এবং সমুদ্রের স্তরের পরিবর্তন সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সমুদ্রের তাপ ও কার্বন শুষে নেওয়ার ক্ষমতা কমিয়ে দিতে পারে কি না। এমনটি ঘটলে বায়ুমণ্ডলে উষ্ণতা আরও বেড়ে যাবে। তখন বিশ্ব জলবায়ু লক্ষ্যমাত্রায় পৌঁছানো আরও কঠিন হয়ে পড়বে।

সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির একটি বড় কারণের সঙ্গে বিশ্বের সব উপকূলীয় জীবন ও অ্যান্টার্কটিকা সরাসরি যুক্ত। স্থলের বরফ গললে যেভাবে সমুদ্রের জল বাড়ে, সাগরের ভাসমান বরফ গললে ঠিক সেভাবে বাড়ে না। কিন্তু যে উষ্ণ মহাসাগর সাগরের বরফ কমাচ্ছে, সেটাই অ্যান্টার্কটিকার হিমবাহ এবং আইস শেলফগুলোকে অস্থিতিশীল করে তুলতে পারে। 'ইন্টারগভর্নমেন্টাল প্যানেল অন ক্লাইমেট চেঞ্জ' সতর্ক করে বলেছে, অ্যান্টার্কটিকার বরফের স্তর কমে যাওয়া সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির ক্ষেত্রে দীর্ঘমেয়াদী সবচেয়ে বড় অনিশ্চয়তাগুলোর একটি। এই অনিশ্চয়তা মোটেও স্বস্তিদায়ক নয়। এর মানে হলো, অ্যান্টার্কটিকার পরিবেশ যদি অনুমানের চেয়ে দ্রুত বদলায়, তবে ভবিষ্যতে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা অনেক বেশি বেড়ে যেতে পারে। উপকূলীয় শহর, দ্বীপরাষ্ট্র, বন্দর এবং নিচু বদ্বীপ এলাকার জন্য এটি কেবল কোনো দূরবর্তী বৈজ্ঞানিক উদ্বেগের বিষয় নয়। এটি এমন এক গুরুতর সমস্যা, যার জন্য বড় ধরনের মূল্য চোকাতে হবে।

বাংলাদেশ থেকে শুরু করে যুক্তরাষ্ট্র পর্যন্ত অনেক দেশে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির কারণে ঝড় ও জোয়ারের সময় বন্যা পরিস্থিতি আরও খারাপ হচ্ছে। মিয়ামি, জাকার্তা এবং নীল নদের বদ্বীপের মতো জায়গাগুলোতে সামান্য জল বাড়লেও ড্রেনেজ, বাসস্থান, বীমা এবং জনকল্যাণমূলক কাজ পরিচালনা করা কঠিন হয়ে পড়ছে। এই পরিস্থিতির পেছনে শুধু অ্যান্টার্কটিকা একা দায়ী নয়। তবে এটি দীর্ঘমেয়াদী সবচেয়ে বড় কারণগুলোর একটি। যে মহাদেশটি হয়তো বেশিরভাগ মানুষ কখনোই চোখে দেখবে না, সেটিই হাজার হাজার মাইল দূরের রাস্তাঘাট, স্কুল, মিঠাজলের সরবরাহ এবং স্থানীয় বাজেটের ভবিষ্যৎ নীরবে নির্ধারণ করে দিচ্ছে।

আমাদের এখন কী করা উচিত, তা যেমন স্পষ্ট, তেমনি কঠিনও। প্রথমত, কার্বন নির্গমন কমানোই সবচেয়ে বেশি জরুরি। অ্যান্টার্কটিকার ঝুঁকি মূলত মানুষ কতটা উষ্ণতা বাড়াতে দিচ্ছে, তার ওপর নির্ভরশীল। তাপমাত্রার সামান্যতম পরিবর্তনও এখানে অনেক বড় প্রভাব ফেলে। প্যারিস চুক্তিতে বৈশ্বিক উষ্ণতা বৃদ্ধি ২ ডিগ্রি সেলসিয়াসের নিচে, বিশেষ করে ১.৫ ডিগ্রিতে সীমিত রাখার কথা বলা হয়েছিল। এর লক্ষ্য শুধু কোনো একটি অঞ্চলের তাপপ্রবাহ কমানো ছিল না। এর উদ্দেশ্য ছিল অ্যান্টার্কটিকার মতো জায়গাগুলোতে হঠাৎ করে বড় বিপর্যয়ের ঝুঁকি কমানো। কারণ এখানকার পরিবেশ ধীরে ধীরে বদলালেও, একসময় তা হঠাৎ করেই নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যেতে পারে।

দ্বিতীয়ত, মেরু অঞ্চলের বিজ্ঞান, স্যাটেলাইট, সমুদ্র পর্যবেক্ষণ এবং দীর্ঘমেয়াদী গবেষণায় সরকারগুলোকে আরও বেশি বিনিয়োগ করতে হবে। অ্যান্টার্কটিকায় গবেষণা করা বেশ কঠিন। তাই এখানকার ঝুঁকিকে সহজেই ছোট করে দেখা হয়। উন্নত তথ্য দিয়ে বিশ্ব উষ্ণায়ন থামানো যাবে না ঠিকই, তবে এর মাধ্যমে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা, মৎস্যসম্পদ, ঝড় এবং বাস্তুতন্ত্রের বিষয়ে আরও ভালো পূর্বাভাস দেওয়া সম্ভব। এছাড়া এটি নীতিনির্ধারকদের ঝুঁকিগুলো দুর্যোগে রূপ নেওয়ার আগেই প্রস্তুতি নিতে সাহায্য করতে পারে।

তৃতীয়ত, পরিস্থিতির সঙ্গে মানিয়ে নেওয়ার বিষয়টিকে ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা হিসেবে না ভেবে বর্তমানের প্রয়োজন হিসেবে দেখতে হবে। কিছু জায়গায় উপকূলীয় সুরক্ষা, জলাভূমি পুনরুদ্ধার, ভবন নির্মাণের উন্নত নিয়ম এবং এলাকা ছেড়ে যাওয়ার বাস্তবসম্মত পরিকল্পনা থাকা প্রয়োজন। শহরগুলো যত তাড়াতাড়ি এই প্রস্তুতি শুরু করবে, এগুলো তত সহজ ও সাশ্রয়ী হবে। অ্যান্টার্কটিকা থেকে চূড়ান্ত নিশ্চয়তার জন্য অপেক্ষা করার মতো সময় আর নেই।

অ্যান্টার্কটিকাকে শুধু দূরের এক বরফঢাকা জায়গা ভাবার পুরনো ধারণাটি এখন ভেঙে যাচ্ছে। সেখানে যা ঘটছে তা জলবায়ু পরিবর্তনের সাধারণ কোনো ঘটনা নয়। বরং এটি মূল গল্পেরই একটি অংশ। মহাদেশটির বরফ ধস একটি সতর্কবার্তা। পৃথিবীর সবচেয়ে বড় ব্যবস্থাগুলো মানুষের ধারণার চেয়েও অনেক দ্রুত বদলে যেতে পারে। দূরত্ব কখনো বিপদ কমায় না। জলবায়ু পরিবর্তনের এই যুগে দক্ষিণ মেরু আমাদের প্রাত্যহিক জীবনের যতটা না দূরে মনে হয়, আসলে এটি তার চেয়ে অনেক বেশি কাছে।

Publication

The World Dispatch

Source: Editorial Desk

Category: Climate