এআইয়ের কোপে সবার আগে চাকরি হারাচ্ছেন অফিসের কর্মীরা
১ এপ্রিল, ২০২৬

বছরের পর বছর ধরে মানুষের ধারণা ছিল, অটোমেশন বা স্বয়ংক্রিয় প্রযুক্তির কোপ সবার আগে পড়বে কায়িক শ্রমে। কারখানায় রোবট, রাস্তায় চালকবিহীন ট্রাক বা মালপত্র টানার কাজে মানুষের বদলে মেশিনের ব্যবহার— এসব দৃশ্য কল্পনা করা সহজ ছিল। কিন্তু এআই বা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার বর্তমান জোয়ার একেবারে অন্য গল্প বলছে। ভারী শিল্পের বদলে এখন বিভিন্ন অফিসের কর্মীরাই সবার আগে এআইয়ের কারণে চাকরি হারাচ্ছেন। যারা লেখালেখি করেন, তথ্য সাজান, রিভিউ করেন, সারাংশ তৈরি করেন, কোডিং করেন বা গ্রাহকদের উত্তর দেন— তারাই বেশি বিপদে পড়েছেন।
এই পরিবর্তনটা বেশ গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, এটি প্রযুক্তি ও কাজ নিয়ে আমাদের পুরোনো স্বস্তিদায়ক ধারণাকে ভেঙে দিয়েছে। অনেক পেশাজীবী ভাবতেন, তাদের কাজ বেশ নিরাপদ। কারণ তাদের কাজে কায়িক শ্রমের বদলে বিচারবুদ্ধি, ভাষা ও ডিজিটাল সমন্বয়ের দরকার হয়। অথচ সাম্প্রতিক জেনারেটিভ এআই সিস্টেম ও বিভিন্ন টুল ঠিক এই কাজগুলোই খুব দারুণভাবে করতে পারছে। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে এআই যে পুরো মানুষকে সরিয়ে দিচ্ছে, তা নয়। বরং বিপদটা আরও তাৎক্ষণিক ও ক্ষতিকর। মালিকরা এখন বুঝতে পারছেন, একই পরিমাণ কাজ করতে তাদের আগের চেয়ে কম কর্মী লাগছে।
বিভিন্ন খাতেই এর প্রমাণ মিলছে। প্রযুক্তি খাতের বেশ কয়েকটি কোম্পানি সরাসরি জানিয়েছে, এআইয়ের ব্যবহার বাড়াতেই তারা কর্মী ছাঁটাই করছে। এর মানে এই নয় যে, সাম্প্রতিক সব ছাঁটাইয়ের পেছনে শুধু এআই দায়ী। মহামারির সময় অনেক প্রতিষ্ঠান অতিরিক্ত কর্মী নিয়োগ দিয়েছিল। পরে সুদের হার বাড়ায় তারা খরচ কমাতে বাধ্য হয়েছে। তবে বিভিন্ন কোম্পানির বিবৃতি, বিনিয়োগকারীদের সঙ্গে বৈঠক ও নিয়োগের পরিকল্পনায় একই চিত্র ফুটে উঠছে। প্রতিষ্ঠানগুলো সাপোর্ট, অপারেশন, কনটেন্ট ও সাধারণ ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের মতো দলগুলো ছোট করছে। অন্যদিকে, তারা এআই টুল ও এআই-সংশ্লিষ্ট পদে খরচ বাড়াচ্ছে।
মিডিয়া খাত এর আরেকটি বড় উদাহরণ। নিউজরুম, মার্কেটিং বিভাগ ও কনটেন্ট স্টুডিওগুলো তাদের ফ্রিল্যান্স বাজেট ও স্থায়ী কর্মীর সংখ্যা কমিয়েছে। একইসঙ্গে তারা এমন সব এআই সিস্টেমের পরীক্ষা চালাচ্ছে, যা কপি লেখা, ট্রান্সক্রিপ্টের সারাংশ তৈরি, শিরোনাম দেওয়া বা সাধারণ ছবি তৈরির মতো কাজ করতে পারে। ২০২৩ ও ২০২৪ সালে প্রকাশনা ও বিজ্ঞাপন খাতের কর্তারা এআইকে উৎপাদনশীলতার হাতিয়ার হিসেবে তুলে ধরেছেন। তবে কর্মীদের কাছে এর অর্থ দাঁড়ায়— কাজের সুযোগ কমে যাওয়া এবং কর্মী ছাঁটাই। কাজ একেবারে গায়েব হয়ে যায়নি। বরং কম কর্মীতেই বেশি কাজ করানো হচ্ছে।
কাস্টমার সার্ভিসেও এর বড় প্রভাব পড়েছে। ব্যাংকিং, টেলিকম, রিটেইল বা সফটওয়্যারের মতো খাতে প্রাথমিক সাপোর্টের কাজে এখন ‘লার্জ ল্যাঙ্গুয়েজ মডেল’ ব্যবহার করা হচ্ছে। স্ট্যানফোর্ড ও এমআইটির মতো প্রতিষ্ঠানের গবেষণায় দেখা গেছে, কাস্টমার সাপোর্টে এআই অ্যাসিস্ট্যান্ট ব্যবহার করলে কর্মীদের উৎপাদনশীলতা বাড়ে। বিশেষ করে নতুন বা কম অভিজ্ঞ কর্মীদের ক্ষেত্রে এটি বেশ কার্যকর। এই তথ্যকে সাধারণত সুখবর হিসেবেই ধরা হয়। কাজের গতির জন্য এটি আসলেই সুখবর। কিন্তু হিসাব-নিকাশের পর এটি মালিকদের কর্মী কমানোর একটা বড় অজুহাতও হয়ে দাঁড়ায়। একজন কর্মী যদি এআই দিয়ে আগের চেয়ে বেশি সমস্যার সমাধান করতে পারেন, তবে কোম্পানিগুলো স্বাভাবিকভাবেই কম কর্মী রাখবে।
নিয়োগ ও এইচআর (মানবসম্পদ) বিভাগেও একই ধরনের চাপ দেখা যাচ্ছে। সিভি বাছাই করা, ইন্টারভিউয়ের সময় ঠিক করা, ইন্টারনাল হেল্প ডেস্ক এবং পলিসি সংক্রান্ত প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার মতো কাজগুলো এখন অনেক বেশি স্বয়ংক্রিয়। ফাইন্যান্স ও আইনি কাজগুলোও একই পথে হাঁটছে। সাধারণ অ্যানালাইসিস, ডকুমেন্ট চেক করা, ইনভয়েস প্রসেসিং বা চুক্তিপত্র লেখার কাজ পুরোপুরি মেশিনের হাতে ছেড়ে দেওয়া হচ্ছে না। কিন্তু কাজগুলো এত দ্রুত হচ্ছে যে, জুনিয়র বা নতুন কর্মীদের ছাঁটাই করাটা ম্যানেজারদের জন্য সহজ হয়ে গেছে। এতে দীর্ঘমেয়াদে বড় একটা ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে। জুনিয়র পদগুলো মূলত ক্যারিয়ারের প্রথম ধাপ। এই পদগুলো কমে গেলে ভবিষ্যতে দক্ষ কর্মীর সংকট দেখা দেবে।
শ্রম অর্থনীতিবিদরা কয়েক বছর ধরেই সতর্ক করে আসছেন যে, প্রযুক্তি কখনোই এক ধাক্কায় সব কাজ ধ্বংস করে দেয় না। এটি সাধারণত বড় কাজগুলোকে ছোট ছোট ভাগে ভাগ করে। এরপর যেসব কাজ একটা নির্দিষ্ট নিয়মে ফেলা যায়, সেগুলো মানুষের হাত থেকে কেড়ে নেয়। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) সাম্প্রতিক এক গবেষণায় বলা হয়েছে, উন্নত দেশগুলোর বড় অংশের চাকরিতে এআইয়ের প্রভাব পড়তে পারে। বিশেষ করে অফিসের কর্মীদের (হোয়াইট-কলার) কাজ বেশি ঝুঁকিতে রয়েছে। ওইসিডি-ও একই ধরনের কথা বলেছে। যেসব কাজে একই ধরনের চিন্তাভাবনা বারবার করতে হয়, সেগুলো বেশি ঝুঁকিপূর্ণ। এটাই আসল পরিবর্তন। কোন কাজগুলো ঝুঁকিতে আছে, তা এখন আর কায়িক শ্রমের ওপর নির্ভর করছে না। বরং কাজটা কতটা ছকে বাঁধা, তার ওপর নির্ভর করছে।
এই বিষয়টি থেকেই বোঝা যায়, কেন এআইয়ের কারণে একইসঙ্গে ভিন্ন ভিন্ন খাতে ছাঁটাই চলছে। লন্ডনের একজন রিক্রুটার, নিউইয়র্কের একজন জুনিয়র প্যারালিগ্যাল, সিডনির একজন কপি এডিটর আর ম্যানিলার একজন সাপোর্ট এজেন্টের কাজ একে অপরের চেয়ে সম্পূর্ণ আলাদা হতে পারে। কিন্তু তারা সবাই দিনের বেশিরভাগ সময় নির্দিষ্ট ধাঁচের তথ্য নিয়ে কাজ করেন। এআই সিস্টেমগুলো ঠিক এ ধরনের কাজেই দারুণ পারদর্শী হয়ে উঠছে। এর প্রভাব সব জায়গায় সমান না হলেও, ভবিষ্যৎ কোন দিকে যাচ্ছে তা বেশ স্পষ্ট।
এর ফলাফল শুধু চাকরি হারানোর মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই। এর একটি বড় প্রভাব হলো বেতনের ওপর চাপ। কর্মীরা চাকরি না হারালেও মালিকরা বলতে পারেন যে, এআইয়ের কারণে তাদের কাজ এখন সহজ হয়ে গেছে, তাই এর মূল্যও আগের চেয়ে কম। আরেকটি প্রভাব হলো তরুণ কর্মীদের ক্যারিয়ারে অস্থিরতা। এন্ট্রি-লেভেলের বা শুরুর দিকের অফিসের চাকরিগুলো দীর্ঘদিন ধরে মধ্যবিত্ত শ্রেণিতে ওঠার সিঁড়ি হিসেবে কাজ করেছে। এই পদগুলো কমে গেলে, নতুন পাস করা গ্র্যাজুয়েট বা যারা পেশা বদলাতে চান, তারা কাজ শেখার সুযোগ কম পাবেন। এর তৃতীয় প্রভাবটি হলো আঞ্চলিক। যদি কোম্পানিগুলো তাদের বেশিরভাগ কাজ এআই সিস্টেমের হাতে ছেড়ে দেয়, তবে যেসব শহর বা এলাকা ব্যাক-অফিস বা প্রশাসনিক কাজের ওপর নির্ভরশীল, তারা বড় ধরনের সংকটে পড়বে।
এখানে একটি নৈতিকতার প্রশ্নও জড়িত। কর্মীদের প্রায়ই বলা হয়, এআই তাদের একঘেয়ে কাজ কমিয়ে দেবে এবং আরও ভালো কাজ করার সুযোগ করে দেবে। কখনো কখনো তা সত্যিও হয়। কিন্তু বাস্তবে অনেক কর্মী প্রথমেই ভিন্ন অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হন। তাদের ওপর নজরদারি বাড়ে, কাজের গতি বাড়াতে চাপ দেওয়া হয়। পাশাপাশি তাদের মনে ভয় কাজ করে যে, উৎপাদন বাড়ার মানেই হলো সামনে আরেক দফা ছাঁটাই। যখন কর্মীদের এমন সিস্টেমকে ট্রেনিং দিতে বলা হয়, যা ভবিষ্যতে তাদের নিজেদের দলকেই ছোট করে দেবে, তখন মালিক ও কর্মীর পারস্পরিক বিশ্বাসের জায়গাটা ভাঙতে শুরু করে।
এর মানে এই নয় যে, এআইকে একটা ক্ষতিকর শক্তি হিসেবে ধরে নিয়ে একে থামিয়ে দিতে হবে। ইতিহাস ঘাঁটলে দেখা যায়, উৎপাদনশীলতার টুল মানুষের জীবনযাত্রার মান বাড়াতে পারে এবং নতুন কাজের সুযোগ তৈরি করতে পারে। তবে এই ফলাফল আপনাআপনি আসবে না। প্রতিষ্ঠানগুলো কতটা দ্রুত এই পরিবর্তনের সঙ্গে মানিয়ে নিতে পারছে, তার ওপর এটি নির্ভর করে। মানুষের চাকরি কেড়ে নেওয়ার বদলে এআই কোথায় কাজে লাগানো হবে, সে বিষয়ে কোম্পানিগুলোর সুস্পষ্ট নিয়ম থাকা দরকার। সরকারগুলো শুধু গালভরা প্রতিশ্রুতি না দিয়ে, কর্মীদের বেতনের নিশ্চয়তা, নতুন কাজের প্রশিক্ষণ বা ইন্টার্নশিপের মতো বিষয়গুলোতে আরও সহায়তা করতে পারে। স্কুল ও বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে শুধু নির্দিষ্ট কাজ শেখানোর বদলে, শিক্ষার্থীদের বিষয়ভিত্তিক জ্ঞান, মানুষের বিচারবুদ্ধি এবং টুল ব্যবহারে দক্ষ করে গড়ে তুলতে হবে।
স্বচ্ছতাও এখানে বেশ গুরুত্বপূর্ণ। অটোমেশনের কারণে যখন কর্মী কমানো হয়, তখন মালিকদের তা স্পষ্টভাবে বলা উচিত। বর্তমানে অনেক ছাঁটাইকে শুধু ‘রিস্ট্রাকচারিং’ বা ‘কাজের গতি বাড়ানোর পদক্ষেপ’ হিসেবে চালিয়ে দেওয়া হয়। এ ধরনের কথা কর্মীদের, নীতিনির্ধারকদের বা সাধারণ মানুষকে আসল ঘটনা জানতে দেয় না। সঠিক তথ্য থাকলে এ নিয়ে খোলামেলা আলোচনা করা সহজ হবে যে, এতে কার লাভ হচ্ছে, কার ক্ষতি হচ্ছে এবং কোথায় সবচেয়ে বেশি সহায়তা প্রয়োজন।
এর পেছনের শিক্ষাটা কিছুটা অস্বস্তিকর হলেও বেশ গুরুত্বপূর্ণ। এআই শুধু কাজের ধরণই বদলাচ্ছে না। এটি আমাদের ছকে বাঁধা চিন্তাভাবনার মূল্যও নতুন করে নির্ধারণ করছে। এই পরিবর্তনের ধাক্কা যে সবসময় কায়িক শ্রম বা কম শিক্ষিতদের ওপর পড়বে, তা নয়। বরং যেসব কাজ ডিজিটাল মাধ্যমে বারবার করতে হয়, সেখানেই এই প্রভাব সবচেয়ে বেশি পড়ছে। আর এ কারণেই নতুন এই ছাঁটাইয়ের গল্পটি পুরোনো অটোমেশনের গল্পের চেয়ে অনেক ব্যাপক। এআই অফিসের কর্মীদের ওপর প্রভাব ফেলবে কি না, সেই প্রশ্ন এখন আর নেই। কারণ এটি ইতোমধ্যেই প্রভাব ফেলছে। এখন আসল প্রশ্ন হলো, একদল কর্মী এই রূঢ় সত্যটা আবিষ্কার করার আগেই সমাজ এর সঠিক সমাধান বের করতে পারবে কি না। এই সত্যটা হলো— অফিস কখনোই ততটা নিরাপদ ছিল না, যতটা মনে হতো।