নতুন সংকটে কন্ডোম কোম্পানিগুলো: তরুণদের মধ্যে কেনার আগ্রহ কমছে
১ এপ্রিল, ২০২৬

বছরের পর বছর ধরে কন্ডোমের ব্যবসাকে বেশ সহজ এবং লাভজনক মনে করা হতো। জনসংখ্যা বাড়ছিল এবং জনস্বাস্থ্য বিষয়ক প্রচারণাও ছিল ব্যাপক। কারণ এই পণ্যটি দুটি বড় কাজ করে— গর্ভধারণ রোধ এবং যৌনবাহিত রোগ থেকে সুরক্ষা। সবাই ভাবত, কন্ডোমের চাহিদা কখনো কমবে না, বরং বাড়বে। কিন্তু এখন বাজার পরিস্থিতি বোঝা কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিশ্বের কয়েকটি বড় অর্থনীতিতে কন্ডোম কোম্পানিগুলো এখন এক নতুন সংকটের মুখে পড়েছে। আর সেটি হলো— অনেক তরুণ গ্রাহক এখন কন্ডোম কেনা কমিয়ে দিয়েছেন।
এই পরিবর্তন বেশ গুরুত্বপূর্ণ। কারণ কন্ডোম একই সঙ্গে জনস্বাস্থ্য এবং সাধারণ খুচরা ব্যবসার একটি বড় অংশ। ফার্মেসি, সুপারমার্কেট, ভেন্ডিং মেশিন, ই-কমার্স ও হেলথ ক্লিনিকে কন্ডোম বিক্রি হয়। কিন্তু এখন এর বিক্রির ধরন আর আগের মতো নেই। জাপানে এর সবচেয়ে স্পষ্ট উদাহরণ দেখা যায়। সেখানকার গবেষকরা জানিয়েছেন, তরুণদের মধ্যে যৌনমিলনের হার কমে গেছে। জাপান ফ্যামিলি প্ল্যানিং অ্যাসোসিয়েশনের এক দীর্ঘমেয়াদি জরিপে দেখা গেছে, অনেক বিবাহিত দম্পতি দীর্ঘদিন সেক্স না করার কথা জানিয়েছেন। ইউরোপ এবং উত্তর আমেরিকার বিভিন্ন গবেষণাতেও একই চিত্র উঠে এসেছে। বিশেষ করে মহামারির পর মানুষের সামাজিক জীবনে পরিবর্তন আসায় তরুণদের মধ্যে যৌনতা কমেছে। এর ফলে কোম্পানিগুলোর পুরনো সেই ধারণা ভেঙে গেছে যে, নতুন প্রজন্ম আগের প্রজন্মের মতোই পণ্য কিনবে।
বাজারের পরিসংখ্যান দেখলেই এর আকার এবং বর্তমান চাপের বিষয়টি বোঝা যায়। বিশ্বজুড়ে প্রতি বছর এখনো কোটি কোটি কন্ডোম বিক্রি হয়। এই বাজারটি এখনো বেশ বড়। হিসাব অনুযায়ী, বিশ্বজুড়ে কন্ডোমের বাজার বছরে ১০ থেকে ১৫ বিলিয়ন ডলারের। কিন্তু বড় এই অঙ্কের আড়ালে একটি কঠিন সত্য লুকিয়ে আছে। এর প্রবৃদ্ধি সব জায়গায় সমান নয়। যেসব দেশে বাজার আগে থেকেই প্রতিষ্ঠিত, সেখানে বিক্রি আটকে আছে। অন্যদিকে নিম্ন আয়ের দেশগুলোতে চাহিদা বেশি থাকলেও দামের বিষয়টি গ্রাহকদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ। সেখানে সরকারি কেনাকাটাই বড় ভূমিকা রাখে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO) এবং ইউএনএইডস (UNAIDS) এইচআইভি প্রতিরোধে কন্ডোমের গুরুত্বের কথা বারবার বলে আসছে। বিশেষ করে সাব-সাহারান আফ্রিকা এবং এশিয়ার কিছু অংশে। তবে ব্যবসার দিক থেকে দেখলে, জনস্বাস্থ্যের এই চাহিদা সবসময় ব্র্যান্ডের বিক্রি বাড়াতে সাহায্য করে না।
চাপ একযোগে কয়েক দিক থেকে আসছে। প্রথমটি হলো জনসংখ্যাগত পরিবর্তন। অনেক উন্নত দেশে জন্মহার কমছে এবং মানুষ দেরিতে বিয়ে করছে। দ্বিতীয়টি হলো আচরণগত পরিবর্তন। ইউএস সেন্টার ফর ডিজিজ কন্ট্রোল অ্যান্ড প্রিভেনশনের (CDC) মতো বিভিন্ন সংস্থা জানিয়েছে, আগের প্রজন্মের তুলনায় বর্তমান তরুণরা দেরিতে যৌন সম্পর্ক শুরু করছে। কিছু জরিপে দেখা গেছে, স্ক্রিনে বেশি সময় কাটানো, অর্থনৈতিক দুশ্চিন্তা এবং ডেটিংয়ের ধরনে পরিবর্তনের কারণে এমনটি হচ্ছে। মানুষ যদি সেক্স কম করে, তবে তারা কন্ডোমও কম কিনবে। এটি একটি সহজ হিসাব। তবে এর প্রভাব কোম্পানিগুলোর জন্য মারাত্মক। কারণ তারা একটি নির্দিষ্ট ব্যবহারের ওপর ভিত্তি করে তাদের উৎপাদন ও বিপণন ব্যবস্থা সাজিয়েছিল।
আরেকটি বড় সমস্যা হলো বিকল্প পদ্ধতির ব্যবহার। কন্ডোম এখন শুধু অন্য কন্ডোম ব্র্যান্ডের সাথেই প্রতিযোগিতা করছে না। বরং জন্মনিয়ন্ত্রণের অন্যান্য পদ্ধতি এবং ঝুঁকির পরিবর্তিত ধারণার সাথেও লড়ছে। অনেক দেশে এখন ইমপ্লান্ট এবং ইন্ট্রাইউটেরিন ডিভাইসের (IUD) মতো দীর্ঘমেয়াদি জন্মনিয়ন্ত্রণ পদ্ধতির চল বেড়েছে। এসব পদ্ধতি যদিও সংক্রমণ থেকে বাঁচায় না, তবে গর্ভাবস্থা রোধে কন্ডোমের প্রয়োজনীয়তা কমিয়ে দেয়। যেসব সম্পর্কে রোগের ঝুঁকি কম বলে মনে করা হয়, সেখানে কন্ডোমের ব্যবহার কমে গেছে। জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলেছেন যে, এটি একটি বিপজ্জনক শূন্যতা তৈরি করছে। কারণ বিভিন্ন দেশে যৌনবাহিত রোগের হার বাড়ছে। উদাহরণস্বরূপ, যুক্তরাষ্ট্রে গত এক দশকে সিফিলিস এবং অন্যান্য সংক্রমণের ঘটনা ব্যাপকভাবে বেড়েছে। এই বিষয়টি শিল্পের জন্য একটি কঠিন সত্য তুলে ধরে: গ্রাহকদের অভ্যাস বদলালেও, সামাজিকভাবে কন্ডোমের প্রয়োজনীয়তা এখনো প্রবল।
তৃতীয় চ্যালেঞ্জটি হলো খুচরা বাজারের অর্থনীতি। কন্ডোমকে মূলত অল্প লাভের পণ্য হিসেবে ধরা হয়। ক্রেতারা দোকানে দ্রুত দাম তুলনা করে সুবিধার ওপর ভিত্তি করে এটি কেনেন। ফলে ডিসকাউন্ট প্যাক এবং কম দামি ব্র্যান্ডগুলো বড় কোম্পানিগুলোর ওপর চাপ সৃষ্টি করে। এর পাশাপাশি গত কয়েক বছরে ল্যাটেক্সের দাম, জ্বালানি খরচ এবং শিপিং খরচ বেড়েছে। রাবার ও কন্ডোম উৎপাদনের দুটি বড় কেন্দ্র হলো মালয়েশিয়া ও থাইল্যান্ড। সেখানে শ্রমিক ও সরবরাহ সংকট দেখা গেছে। মহামারির সময় মেডিক্যাল গ্লাভসের চাহিদা বাড়ায় কিছু উৎপাদক লাভবান হয়েছিল ঠিকই, তবে এটি বৃহত্তর ল্যাটেক্স ব্যবসার অন্যান্য অংশে বাধা সৃষ্টি করেছিল। ফলে কন্ডোম কোম্পানিগুলোকে একদিকে কাঁচামালের দাম সামলাতে হচ্ছে, অন্যদিকে বেশি দাম দিতে নারাজ গ্রাহকদের মন জুগিয়ে চলতে হচ্ছে।
এর ফলে কন্ডোম শিল্প এখন নিজেদের মূল উদ্দেশ্য ঠিক রেখে নতুন করে বাঁচার চেষ্টা করছে। কিছু কোম্পানি একটু দামি পণ্য বাজারে এনেছে, যেমন— আল্ট্রা-থিন, নন-ল্যাটেক্স, টেক্সচারড বা প্রিমিয়াম-লুব্রিক্যান্ট কন্ডোম। এগুলো থেকে লাভও বেশি আসে। আবার কেউ কেউ কন্ডোম কেনার অস্বস্তি দূর করার চেষ্টা করছে। অনেক ডিরেক্ট-টু-কনজ্যুমার স্টার্টআপ এখন গোপনীয় প্যাকেজিং এবং সাবস্ক্রিপশন মডেল ব্যবহার করে তরুণদের টার্গেট করছে, যারা দোকানে গিয়ে কন্ডোম কিনতে লজ্জাবোধ করেন। ভারতের বাজারে সরকারি কন্ডোমের পাশাপাশি অনেক প্রাইভেট ব্র্যান্ডও রয়েছে। সেখানে কোম্পানিগুলো সাহসী বিজ্ঞাপন এবং লাইফস্টাইল মার্কেটিংয়ের ওপর জোর দেয়। অন্যদিকে ইউরোপ ও উত্তর আমেরিকায় আরাম, ডিজাইন এবং ওয়েলনেসের ওপর ভিত্তি করে মার্কেটিং করা হচ্ছে।
তবে শুধু ব্র্যান্ডিং দিয়ে এই সমস্যার সমাধান সম্ভব নয়, কারণ এর শেকড় গভীর সামাজিক পরিবর্তনের মধ্যে লুকিয়ে আছে। তরুণরা যদি আর্থিকভাবে বেশি চাপে থাকে, সমাজ থেকে বিচ্ছিন্ন থাকে বা দেরিতে সম্পর্ক গড়ে তোলে, তবে কোনো প্যাকেজ ডিজাইনই পুরনো বিক্রি ফিরিয়ে আনতে পারবে না। এ কারণেই অনেক কোম্পানি এখন শুধু বাজার দখলের বদলে ব্যবসার ধরন বদলানোর কথা ভাবছে। তারা এখন কন্ডোমের পাশাপাশি লুব্রিক্যান্ট, হোম সেক্সুয়াল হেলথ কিট এবং ওয়েলনেস পণ্য বিক্রির দিকে ঝুঁকছে। এই কৌশল থেকেই বোঝা যায়, ধনী দেশগুলোতে শুধু কন্ডোম বিক্রি করে বিনিয়োগকারীদের প্রত্যাশা মেটানো এখন আর সম্ভব নয়।
এখানে একটি জনস্বার্থের বিষয়ও রয়েছে, যা ব্যবসায়ীরা এড়িয়ে যেতে পারেন না। কন্ডোমের বিক্রি কমে গেলে তা শুধু কোম্পানির ক্ষতি করে না। এর প্রভাব সংক্রমণ প্রতিরোধ, পরিবার পরিকল্পনা এবং স্বাস্থ্য সুরক্ষার ওপরও পড়ে। অনেক দেশে নিম্ন আয়ের মানুষ সরকার বা বিভিন্ন সংস্থার দেওয়া বিনা মূল্যের বা ভর্তুকি দেওয়া কন্ডোমের ওপর নির্ভর করে। ব্যবসার দিক থেকে আগ্রহ কমে গেলে, প্রাইভেট কোম্পানিগুলো হয়তো সরকারি চুক্তির ওপর বেশি নির্ভরশীল হয়ে পড়বে। তখন তারা সাধারণ মানুষের জন্য নতুন পণ্য তৈরিতে বিনিয়োগ করতে চাইবে না। সেটি হবে একটি বড় ভুল। কারণ কন্ডোমের সঠিক মাপ, ভালো অনুভূতি এবং সহজলভ্যতা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। গবেষণায় দেখা গেছে, অস্বস্তি, খারাপ ফিটিং এবং লজ্জার কারণে অনেকেই নিয়মিত কন্ডোম ব্যবহার করেন না।
এর সবচেয়ে ভালো সমাধান হতে পারে ব্যবসা এবং জনস্বাস্থ্যের বাস্তবতার মধ্যে একটি ভারসাম্য তৈরি করা। কোম্পানিগুলোকে দামি ব্র্যান্ডিংয়ের ওপর নির্ভর না করে পণ্যের মান ও সাশ্রয়ী দামের দিকে বিনিয়োগ করতে হবে। বিক্রেতারা ভেন্ডিং মেশিন বা অনলাইনে বিক্রির মাধ্যমে কন্ডোম কেনা আরও সহজ ও চিন্তামুক্ত করতে পারেন। সরকার ও স্বাস্থ্য সংস্থাগুলোর উচিত এমন শিক্ষামূলক কর্মসূচিতে অর্থায়ন করা, যেখানে কন্ডোমকে সেকেলে পদ্ধতি হিসেবে নয়, বরং সংক্রমণ প্রতিরোধের মূল হাতিয়ার হিসেবে তুলে ধরা হয়। কোম্পানিগুলোর উচিত তরুণ গ্রাহকদের কথা বেশি করে শোনা। কারণ তরুণরা এমন পণ্য চান যা তাদের সুবিধার কথা ভেবে তৈরি, তাদের কোনো পুরোনো নিয়মের ছকে বাঁধার জন্য নয়।
কন্ডোম শিল্প এখনই হারিয়ে যাচ্ছে না। কারণ এর ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং বাজারটিও এখনো বিশাল। তবে এটি এখন একটি কঠিন সময় পার করছে। এখন আর আগের মতো চাইলেই কন্ডোম বিক্রি করা যাবে না। আধুনিক জীবনের এই সূক্ষ্ম কিন্তু বড় পরিবর্তনটি যে কোম্পানিগুলো বুঝতে পারবে, তারাই টিকে থাকবে। মানুষের সামাজিক অভ্যাসের পরিবর্তন হলে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের বাজারও যে থমকে যেতে পারে, এটি তারই প্রমাণ। এই ব্যবসায় বিক্রি কমে যাওয়াটা শুধুই কোনো ব্যবসায়িক সমস্যা নয়। এটি আসলে বর্তমান তরুণ প্রজন্মের স্বাস্থ্য, অন্তরঙ্গতা এবং অর্থনৈতিক অবস্থার জন্য একটি সতর্কবার্তাও বটে।