এআই প্রযুক্তির দুনিয়া বদলে দিতে পারে ছোট্ট এক নতুন চিপ
১ এপ্রিল, ২০২৬

অনেকেই এখনও ভাবেন, আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স বা এআই হলো বিশাল সব ডেটা সেন্টারে থাকা কোনো প্রযুক্তি। যা প্রচুর বিদ্যুৎ পোড়ায় আর বিশ্বের বড় কয়েকটি কোম্পানির নিয়ন্ত্রণে থাকে। এই ধারণা এখনও কিছুটা সত্যি। সবচেয়ে বড় এআই মডেলগুলো তৈরি করতে বিপুল কম্পিউটিং ক্ষমতার দরকার হয়। তবে নতুন এক আবিষ্কার এই ধারণাকে চ্যালেঞ্জ জানাতে শুরু করেছে। তা হলো—ছোট্ট "এজ এআই" (edge AI) চিপ। ছোট ছোট ডিভাইসে সরাসরি মেশিন-লার্নিংয়ের কাজ করার জন্যই এগুলো তৈরি হয়েছে। বিষয়টি শুনতে খুব টেকনিক্যাল মনে হতে পারে। তবে বাস্তবে এটি বদলে দিতে পারে কারা এই শক্তিশালী কম্পিউটিং ব্যবহার করবে, ডেটা কোথায় যাবে এবং আমাদের দৈনন্দিন জীবনের কোন অংশগুলো ক্লাউডের ওপর কম নির্ভরশীল হয়ে উঠবে।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টি বেশ সহজ। দূরের কোনো সার্ভারে বারবার ডেটা পাঠানো বেশ ধীরগতির, ব্যয়বহুল এবং এতে প্রচুর বিদ্যুতের অপচয় হয়। এতে গোপনীয়তা নষ্ট হওয়ার ঝুঁকিও থাকে। আধুনিক জীবনের অনেক কিছুই এখন ইন্টারনেটে যুক্ত ডিভাইসের ওপর নির্ভরশীল। আমাদের স্মার্টফোন ভয়েস কমান্ড শোনার জন্য কান পেতে থাকে। গাড়িগুলো রাস্তা ও পথচারীদের খেয়াল রাখে। কারখানার সেন্সরগুলো ত্রুটি খোঁজে। চিকিৎসা সরঞ্জামগুলো মানুষের কথা, নড়াচড়া ও হার্টবিট মাপে। প্রতিটি কাজের জন্যই যদি দূরের সার্ভারের ওপর নির্ভর করতে হয়, তবে দুর্বল ইন্টারনেট একটি বড় বাধা হয়ে দাঁড়ায়। খরচ বাড়ে। বাড়ে কাজের দেরিও।
এ কারণেই চিপ ও ডিভাইস নির্মাতারা গত কয়েক বছর ধরে ডিভাইসের ভেতরেই কম্পিউটিংয়ের কাজ সারতে জোর প্রতিযোগিতা চালিয়ে যাচ্ছে। এটি এখন আর কোনো ছোটখাটো পরীক্ষা-নিরীক্ষা নয়। অ্যাপল তাদের ফোন ও ল্যাপটপে "নিউরাল ইঞ্জিন" যোগ করেছে। কোয়ালকম মোবাইল ডিভাইসের জন্য এআই-রেডি চিপ বাজারজাত করছে। এনভিডিয়া, এআরএম (Arm) এবং ইন্টেল এজ কম্পিউটিংয়ের বাজারে তুমুল প্রতিযোগিতা করছে। স্টার্টআপগুলো আরও একধাপ এগিয়ে গেছে। তারা অত্যন্ত বিশেষায়িত কিছু চিপ বানাচ্ছে। সাধারণ প্রসেসরের তুলনায় এসব চিপ খুব সামান্য বিদ্যুৎ খরচ করে নির্দিষ্ট এআই-এর কাজ করতে পারে। গার্টনারের (Gartner) মতো গবেষণা প্রতিষ্ঠানের বিশ্লেষকরা কয়েক বছর ধরেই এজ এআই-কে প্রযুক্তির একটি বড় ট্রেন্ড হিসেবে দেখিয়ে আসছেন। আইডিসি (IDC)-সহ অন্যান্য খাতের পূর্বাভাসেও বলা হয়েছে, কোম্পানিগুলো এখন ডেটা যেখানে তৈরি হচ্ছে, তার কাছাকাছি জায়গায় তা প্রসেস করার চেষ্টা করছে। ফলে এজ এআই খাতে বিনিয়োগ দ্রুত বাড়বে।
নতুন এই পরিবর্তনের মানে শুধু এই নয় যে চিপগুলো আরও দ্রুত কাজ করছে। বরং এগুলো অবাক করার মতো ছোট আকার নিয়েও অনেক বেশি কার্যকরী হয়ে উঠছে। বিশ্ববিদ্যালয় ও বাণিজ্যিক ল্যাবগুলোর গবেষকরা নিউরোমর্ফিক এবং ইন-মেমোরি কম্পিউটিংয়ের ডিজাইন তৈরি করছেন। মেমরি এবং প্রসেসরের মধ্যে ডেটা আদান-প্রদান করতে সবচেয়ে বেশি বিদ্যুৎ খরচ হয়। নতুন এই ডিজাইনগুলো সেই প্রয়োজন অনেকটাই কমিয়ে দেয়। আইবিএম, ইন্টেল এবং বেশ কয়েকটি স্টার্টআপ দেখিয়েছে যে, মানুষের মস্তিষ্ক বা মেমরি-নির্ভর এই ডিজাইনগুলো প্যাটার্ন চেনা ও সেন্সর অ্যানালাইসিসের মতো কাজে শক্তির ব্যবহার দারুণভাবে কমাতে পারে। এই ক্ষেত্রটি এখনও বেশ নতুন। অনেক প্রোটোটাইপ এখনও ব্যাপকভাবে ব্যবহারের জন্য পুরোপুরি প্রস্তুত নয়। তবে ভবিষ্যৎ পরিষ্কার—কাজের এআই মানেই বিশাল সার্ভারের সাথে যুক্ত গরম ও ব্যয়বহুল কোনো মেশিন নয়।
এর পেছনে মূল কারণ হলো কম্পিউটিংয়ের অর্থনীতির একটি চরম সীমা। বছরের পর বছর ধরে, চিপগুলোকে আরও ছোট করে এবং সেগুলোতে আরও বেশি ট্রানজিস্টর বসিয়ে পারফরম্যান্স বাড়িয়েছে এই শিল্প। সেই কাজ এখনও চলছে। তবে এ ধরনের উন্নতি এখন কঠিন ও ব্যয়বহুল হয়ে পড়েছে। অন্যদিকে, এআই-এর কাজের চাপও হু হু করে বেড়েছে। আন্তর্জাতিক শক্তি সংস্থা (IEA) সতর্ক করেছে যে, ডেটা সেন্টারগুলো, বিশেষ করে যেগুলো এআই-এর কাজে ব্যবহৃত হয়, সেগুলো বিদ্যুতের চাহিদার একটি বড় কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এর সমাধান সব সময় আরও বড় সেন্টার তৈরি করা নয়। অনেক ক্ষেত্রেই মূল কাজ হলো সার্ভারে এত বেশি ডেটা পাঠানো বন্ধ করা। যদি একটি পরিধানযোগ্য ডিভাইস (wearable device) মানুষের পড়ে যাওয়া শনাক্ত করতে পারে, খামারের সেন্সর ফসলের রোগ ধরতে পারে, অথবা ক্লাউড সংযোগ ছাড়াই হিয়ারিং এইড রিয়েল-টাইমে গলার স্বর পরিষ্কার শোনাতে পারে, তবে লোকাল প্রসেসিং শুধু একটি সুবিধাই থাকে না। এটি একটি প্রযুক্তিগত প্রয়োজন হয়ে দাঁড়ায়।
বাস্তবে এর প্রভাব কতটা, তার প্রমাণ ইতিমধ্যেই মিলছে। স্বাস্থ্য খাতে গবেষকরা এজ এআই টুল নিয়ে পরীক্ষা করেছেন। এসব টুল প্রতিটি ডেটা সার্ভারে না পাঠিয়েই অনিয়মিত হার্টবিট শনাক্ত করতে বা শ্বাস-প্রশ্বাসের প্যাটার্ন মনিটর করতে পারে। যেসব গ্রামাঞ্চলে ব্রডব্যান্ড ইন্টারনেটের গতি ভালো নয়, সেখানে এই সুবিধাটি দারুণ কাজ করে। যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল কমিউনিকেশনস কমিশন বারবার দেখিয়েছে যে, বিশেষ করে প্রত্যন্ত অঞ্চলগুলোতে উচ্চগতির ইন্টারনেটের ব্যাপক অভাব রয়েছে। উৎপাদন শিল্পে মিলি সেকেন্ডের মধ্যে কারখানার যন্ত্রাংশ পরীক্ষা করতে লোকাল এআই সিস্টেম ব্যবহার করা হচ্ছে। এতে অপচয় ও কাজ বন্ধ থাকার সময় কমছে। আর যানবাহনের ক্ষেত্রে তো গতির কোনো বিকল্প নেই। রাস্তায় থাকা কোনো বস্তু বাচ্চা, সাইকেল নাকি প্লাস্টিকের ব্যাগ—তা সিদ্ধান্ত নেওয়ার জন্য একটি গাড়ি দূরের সার্ভারের উত্তরের অপেক্ষায় বসে থাকতে পারে না।
ডেটার গোপনীয়তার দিকটিও সমান গুরুত্বপূর্ণ। অনেক গ্রাহকই এখন এমন ডিভাইস নিয়ে অস্বস্তিতে ভোগেন যেগুলো প্রতিনিয়ত অডিও, ভিডিও বা স্বাস্থ্যের তথ্য আপলোড করে। ডেটা চুরির ঘটনাগুলো এই ভয়কে আরও যৌক্তিক করে তুলেছে। আইবিএম-এর বার্ষিক ডেটা ব্রিচ রিপোর্টে দেখা গেছে, ব্যক্তিগত ডেটা চুরি হলে তা কোম্পানিগুলোর জন্য যেমন ব্যয়বহুল, তেমনি ব্যবহারকারীদের জন্যও ক্ষতিকর। যখন বেশিরভাগ বিশ্লেষণ ডিভাইসের ভেতরেই হয়, তখন সংবেদনশীল তথ্য বাইরে পাঠানোর প্রয়োজন কমে যায়। তবে এটি একাই গোপনীয়তার সব সমস্যার সমাধান করে না। খারাপ সফটওয়্যার, দুর্বল নিরাপত্তা এবং কোম্পানির বাজে নীতির কারণে এখনও ব্যবহারকারীদের তথ্য ঝুঁকিতে পড়তে পারে। তবে ডিভাইসেই বেশিরভাগ কাজ সেরে নিলে কর্পোরেট সিস্টেমগুলোতে মানুষের ব্যক্তিগত তথ্যের ছড়াছড়ি কমানো সম্ভব।
এর সাথে বিশ্বজুড়ে এআই ব্যবহারের সুযোগের বিষয়টিও জড়িত। ক্লাউড এআই-এর জন্য শক্তিশালী অবকাঠামো, বিশাল সার্ভার এবং উন্নত পেমেন্ট সিস্টেম প্রয়োজন। এই মডেল সাধারণত ধনী কোম্পানি এবং উন্নত দেশগুলোর পক্ষেই যায়। ছোট এবং সস্তা এআই চিপগুলো এই বাধা দূর করতে পারে। ভারত, আফ্রিকা বা লাতিন আমেরিকার কিছু অংশে মোবাইলের ব্যবহার অনেক বেশি হলেও, ব্রডব্যান্ড ইন্টারনেট সীমিত বা ব্যয়বহুল। সেখানে কম দামি ফোন বা টুলে লোকাল এআই প্রযুক্তি অনুবাদ, স্বাস্থ্য পরীক্ষা, পড়াশোনায় সাহায্য এবং কৃষিকাজের পরামর্শের মতো কাজগুলো মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছে দিতে পারে। শুধু একটি ভালো চিপের কারণে ডিজিটাল বৈষম্য দূর হবে না। তবে হার্ডওয়্যারের এই উন্নতি বৈষম্য বাড়াতেও পারে, আবার কমাতেও পারে।
তবুও, এই আবিষ্কার নিয়ে খুব বেশি রোমাঞ্চিত হওয়ার কিছু নেই। এই ছোট এআই চিপগুলোর কিছু সীমাবদ্ধতা রয়েছে। এগুলো সাধারণত ছোট মডেল চালায়। এরা হয়তো একটি কাজে খুব ভালো, কিন্তু অন্য কাজে বেশ দুর্বল। এদের আপডেট করাও বেশ কঠিন হতে পারে। যখন লাখ লাখ ডিভাইসে এআই প্রযুক্তি ছড়িয়ে পড়ে, তখন নিরাপত্তার বিষয়টি আরও বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। দুর্বল সুরক্ষার একটি স্মার্ট ক্যামেরা বা মেডিকেল সেন্সর সহজেই হ্যাকারদের টার্গেট হতে পারে। ইন্টারনেটযুক্ত অনিরাপদ হার্ডওয়্যার কী করতে পারে, তা বিশ্ব ইতিমধ্যেই দেখেছে। ২০১৬ সালের 'মিরাই বটনেট' (Mirai botnet) হামলা দুর্বল নিরাপত্তার ডিভাইসগুলোকে কাজে লাগিয়ে ইন্টারনেটে ব্যাপক বিশৃঙ্খলা তৈরি করেছিল। তাই উন্নত এজ ডিভাইসগুলোর জন্য শুরু থেকেই আরও শক্তিশালী নিরাপত্তা ব্যবস্থা প্রয়োজন।
এটি ভবিষ্যতের নীতি ও শিল্পের বেশ কিছু সিদ্ধান্তের দিকে ইঙ্গিত করে। এজ সিস্টেমগুলো এমনভাবে ডিজাইন করা উচিত, যেখানে কোন ডেটা লোকাল থাকবে, কোনটি আপলোড হবে এবং কেন হবে—তার স্পষ্ট নিয়ম থাকবে। ব্যবহারকারীদের কাছে সহজ ভাষায় সবকিছু তুলে ধরতে, নিয়মিত সিকিউরিটি আপডেট দিতে এবং একটি নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত ডিভাইসের সাপোর্ট নিশ্চিত করতে কোম্পানিগুলোকে চাপ দেওয়া উচিত। সরকারি কেনাকাটার ক্ষেত্রেও এটি সহায়ক হতে পারে। স্কুল, হাসপাতাল ও পরিবহন সংস্থাগুলো এমন বিক্রেতাদের পুরস্কৃত করতে পারে, যারা ক্লাউড-নির্ভর সিস্টেমের বদলে বেশি কার্যকরী ও গোপনীয়তা-বান্ধব টুল তৈরি করে। এজ ডিভাইসগুলো যেন সব নেটওয়ার্কে ঠিকমতো কাজ করে এবং ভবিষ্যতে আপডেট করা যায়, তা নিশ্চিত করতে স্ট্যান্ডার্ড বডি এবং টেলিকম নিয়ন্ত্রকদেরও ভূমিকা রয়েছে।
এআই নিয়ে এত মাতামাতির মাঝে সবচেয়ে বড় শিক্ষাটি নজর এড়িয়ে যাওয়া খুব স্বাভাবিক। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ নতুন আবিষ্কারটি সবসময় বিশাল কোনো মডেল বা জমকালো লঞ্চ ইভেন্ট নিয়ে আসে না। কখনও কখনও এটি হয় অত্যন্ত নীরব একটি হার্ডওয়্যার, যা ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দু পরিবর্তন করে দেয়। ছোট্ট এআই চিপগুলো কখনোই ক্লাউডের জায়গা নেবে না। এগুলো বড় আকারের কম্পিউটিংয়ের প্রয়োজনীয়তাও শেষ করে দেবে না। তবে এগুলো নতুন একটি পথের সন্ধান দেয়। যে পথে সাধারণ মানুষের জন্য উন্নত ডিজিটাল সেবাগুলো আরও দ্রুত, সস্তা এবং ব্যক্তিগত হয়ে উঠবে। প্রযুক্তির দুনিয়ায়, ভবিষ্যৎকে অনেক সময় বিশাল মনে হয়; যতক্ষণ না তা হঠাৎ করে ছোট হয়ে আপনার হাতের মুঠোয় এসে পৌঁছায়।