একনায়কদের গণ্ডি পেরিয়ে ফোন স্পাইওয়্যার এখন মানুষের ঘরে ঘরে
১ এপ্রিল, ২০২৬

অনেক বছর ধরে স্পাইওয়্যার শব্দটি শুনলেই রাষ্ট্রীয় হ্যাকার, ভিন্নমতাবলম্বী এবং গোপন গোয়েন্দা বাহিনীর কথা মাথায় আসত। এই ধারণাটি এখনও আংশিক সত্যি। মেক্সিকো থেকে সৌদি আরবের মতো দেশগুলোতে সাংবাদিক, অধিকারকর্মী এবং রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে শক্তিশালী ফোন হ্যাকিং টুল ব্যবহার করা হয়েছে। তবে এই চিত্র এখন অসম্পূর্ণ। স্পাইওয়্যারের আরেকটি বাজার সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনে ছড়িয়ে পড়েছে। আর এটি প্রায় চোখেই পড়ে না। প্যারেন্টাল কন্ট্রোল, এমপ্লয়ি মনিটরিং বা ফ্যামিলি সেফটির প্রতিশ্রুতি দেওয়া বিভিন্ন অ্যাপ স্টোর, অ্যাফিলিয়েট নেটওয়ার্ক এবং ঝকঝকে ওয়েবসাইটের আড়ালে এগুলো লুকিয়ে থাকে। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই এগুলো মূলত মোবাইল স্পাই অ্যাপ। কারও সম্মতি ছাড়াই তার ব্যক্তিগত জীবনের ওপর নজরদারি করার জন্যই এগুলো তৈরি করা হয়।
সমস্যার আকার মানুষের ধারণার চেয়েও অনেক বড়। নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠান ও অ্যাডভোকেসি সংস্থাগুলোর আন্তর্জাতিক জোট ‘দ্য কোয়ালিশন অ্যাগেইনস্ট স্টকারওয়্যার’ প্রতি বছর এমন হাজার হাজার আক্রান্ত মোবাইল ডিভাইস শনাক্ত করে। সাইবার সিকিউরিটি প্রতিষ্ঠান ক্যাসপারস্কি এই জোটকে তথ্য দিয়ে সাহায্য করে। তারা বারবার বলেছে যে, স্টকারওয়্যার এখনও একটি বৈশ্বিক সমস্যা। ইউরোপ, ল্যাটিন আমেরিকা, এশিয়া ও উত্তর আমেরিকাজুড়ে এমন ঘটনা ঘটছে। এগুলো সবসময় খুব উন্নত প্রযুক্তির হ্যাক হয় না। অনেক সময় হ্যাকার হয়তো এমন কেউ, যার হাতে কয়েক মিনিটের জন্য আপনার ফোন ও একটি ক্রেডিট কার্ড ছিল। সেই সুযোগে সে মেসেজ, লোকেশন, ছবি বা কল ট্র্যাক করার ব্যবস্থা করে নেয়। এই সহজ সত্যটিই স্পাইওয়্যারের হুমকিকে আরও ব্যক্তিগত ও বিপজ্জনক করে তুলেছে।
গবেষণায় দেখা গেছে, স্বামী-স্ত্রী বা সঙ্গীর ওপর নজরদারি এখন আর শুধু মেসেজ পড়া বা পাসওয়ার্ড অনুমান করার মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। পারিবারিক নির্যাতনের ক্ষেত্রে ডিজিটাল টুলগুলো এখন বড় ভূমিকা রাখছে। ইউএস ন্যাশনাল নেটওয়ার্ক টু এন্ড ডোমেস্টিক ভায়োলেন্স বছরের পর বছর ধরে সতর্ক করে আসছে। তারা বলছে, নির্যাতনকারীরা ভুক্তভোগীদের নিয়ন্ত্রণ করতে স্পাইওয়্যার, লুকানো লোকেশন শেয়ারিং, ক্লাউড অ্যাকাউন্টের অ্যাক্সেস এবং কানেক্টেড ডিভাইস ব্যবহার করছে। যুক্তরাজ্যের ‘রিফিউজ’সহ অন্যান্য সহায়তা গোষ্ঠীগুলোও একই ধরনের তথ্য দিয়েছে। প্রযুক্তি নির্যাতনের ধরনে নতুন রূপ দিয়েছে। একজন হয়তো বাড়ি ছেড়ে চলে যেতে পারেন, দরজার তালা পাল্টাতে পারেন। তারপরও প্রতিদিন হাতে থাকা ফোনটির মাধ্যমেই তাকে ট্র্যাক করা সম্ভব। আক্রমণের ধরন সাইবার হলেও এর প্রভাব ভয়াবহভাবে শারীরিক ও মানসিক।
মোবাইল স্পাই অ্যাপগুলোকে সবচেয়ে বেশি বিপজ্জনক করে তুলেছে এর আইনি মারপ্যাঁচ। বিক্রেতারা হয়তো বলবেন, এই সফটওয়্যারটি শিশুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বা কর্মীদের ডিভাইসের ব্যবস্থাপনার জন্য তৈরি। কিন্তু একই অ্যাপ হয়তো গোপনে চালানো, সাইলেন্ট ইন্সটলেশন, টাইপ করা অক্ষর রেকর্ড, রিয়েল-টাইম জিপিএস ট্র্যাকিং, সোশ্যাল মিডিয়া মনিটরিং এবং ব্যক্তিগত চ্যাট পড়ার বিজ্ঞাপন দেয়। নিরাপত্তা গবেষক ও ভোক্তা অধিকার নিয়ে কাজ করা ব্যক্তিরা দেখেছেন, এর মধ্যে কয়েকটি কোম্পানি দুর্বল সুরক্ষায় নিজেদের সার্ভারে এসব স্পর্শকাতর ডেটা সংগ্রহ করে। গত এক দশকে বেশ কয়েকবার স্টকারওয়্যার কোম্পানিগুলো নিজেরাই হ্যাক হওয়ার বা তথ্য ফাঁসের শিকার হয়েছে। এতে গ্রাহকদের রেকর্ড, ভুক্তভোগীদের মেসেজ, স্ক্রিনশট এবং লোকেশনের ডেটা ফাঁস হয়ে গেছে। নজরদারি শিল্প শুধু মানুষের গোপনীয়তাই নষ্ট করে না। তারা যেসব ডেটা চুরি করে, সেগুলো সুরক্ষিত রাখতেও ব্যর্থ হয়।
এই চিত্র একটি বড় সাইবার সিকিউরিটি সমস্যার ইঙ্গিত দেয়। এই অ্যাপগুলো শুধু নজরদারিতে থাকা ব্যক্তির জন্যই হুমকি নয়। ডিভাইসের সাথে যুক্ত সবার জন্যই এরা বিপদের কারণ হতে পারে। ডাক্তার, আইনজীবী, চাকরিদাতা এবং পরিবারের সদস্যদের সাথে আদান-প্রদান করা মেসেজগুলো চুরি হতে পারে। টু-ফ্যাক্টর অথেনটিকেশনের কোড হাতিয়ে নেওয়া সম্ভব। ব্যাংকিং কার্যক্রমের ওপর নজরদারি করা যায়। ছবি এবং ক্লাউড অ্যাকাউন্টের পাসওয়ার্ডও ফাঁস হতে পারে। কর্মক্ষেত্রে একটি স্পাইওয়্যারযুক্ত ফোন দিয়ে প্রতিষ্ঠানের ইমেইল, গ্রাহকের তথ্য বা অভ্যন্তরীণ সিস্টেমেও হ্যাকাররা ঢুকে পড়তে পারে। যেহেতু কাজ এবং ব্যক্তিগত জীবন এখন একই ডিভাইসে মিশে গেছে, তাই গোপনে থাকা একটি নজরদারি অ্যাপ শুধু ব্যক্তিগত অধিকার ক্ষুণ্ণ করে না। এটি যেকোনো প্রতিষ্ঠানের জন্যও বড় ঝুঁকির কারণ হয়ে দাঁড়ায়।
এর পেছনের কারণগুলো একই সাথে প্রযুক্তিগত, বাণিজ্যিক এবং সামাজিক। এখন ফোনের ভেতরে প্রায় সবকিছুই থাকে। মানুষ কোথায় ঘুমায়, কাকে ভালোবাসে, কোথায় কাজ করে এবং কী ভয় পায়—সবই ফোন জানে। ফলে কারও ওপর নিয়ন্ত্রণ নিতে চাইলে ফোনই সেরা লক্ষ্যবস্তু। অন্যদিকে, মোবাইলের সফটওয়্যার বাজার এখন ব্যবহারকারীদের সুবিধা বাড়াতে গিয়ে নজরদারি দুর্বল করে ফেলেছে। অনেকেই দ্রুত অ্যাপ ইনস্টল করেন, পারমিশন ডিটেইলস না পড়েই এগিয়ে যান এবং সহজে অনুমান করা যায় এমন পাসওয়ার্ড ব্যবহার করেন। কিছু স্পাইওয়্যার ছড়াতে খুব উন্নত প্রযুক্তি বা হ্যাকিংয়েরও প্রয়োজন হয় না। এগুলো সামাজিক বিশ্বাস, জোর-জবরদস্তি বা শেয়ার করা পাসকোডের ওপর নির্ভর করে। ক্ষতিকর সম্পর্কের ক্ষেত্রে এই বিশ্বাসকেই অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করা হয়।
এখানে নীতিগত ফাঁকফোকরও রয়েছে। বড় বড় প্রযুক্তি কোম্পানি স্টকারওয়্যারের বিরুদ্ধে পদক্ষেপ নিলেও এর প্রয়োগ সবসময় সমান নয়। গুগল অ্যান্ড্রয়েডে পারমিশনের অপব্যবহার ও নজরদারির বিষয়ে নিয়ম কড়া করেছে। অ্যাপল আইফোনে অ্যাপের কার্যক্রম আরও কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করে। তারপরও সাইড-লোডিং, হ্যাক হওয়া অ্যাকাউন্ট, এন্টারপ্রাইজ সার্টিফিকেট বা নিয়মকানুনগুলোর ফাঁক গলে ক্ষতিকর নজরদারি ঠিকই চলছে। নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলো ব্যবস্থা নিতে শুরু করেছে। যুক্তরাষ্ট্রে ফেডারেল ট্রেড কমিশন কিছু স্পাইওয়্যার বিক্রেতার বিরুদ্ধে পদক্ষেপ নিয়েছে। গোপনে ফোন থেকে ডেটা চুরির দায়ে অভিযুক্ত কোম্পানিগুলোর বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। তবে এই বাজার পরিস্থিতি অনুযায়ী নিজেদের দ্রুত পাল্টে ফেলে। এক নামে নিষিদ্ধ হওয়া কোনো পণ্য সামান্য পরিবর্তন করে ভিন্ন নামে আবারও বাজারে ফিরে আসে।
এই সমস্যার সামাজিক ক্ষতিটা সহজে বোঝা যায় না, কারণ ভুক্তভোগীরা বেশিরভাগ সময় একা হয়ে যান। ফোনের চার্জ দ্রুত শেষ হওয়া, ফোন অতিরিক্ত গরম হওয়া বা হঠাৎ লগইন অ্যালার্ট আসাকে হয়তো সাধারণ কোনো প্রযুক্তিগত সমস্যা মনে হতে পারে। বাস্তবে, এগুলো বিপদের লক্ষণ হতে পারে। সাইবার সিকিউরিটি বিশেষজ্ঞ ও পারিবারিক সহিংসতা নিয়ে কাজ করা সংস্থাগুলো বলছে, সন্দেহভাজন স্পাইওয়্যার মোছার আগে লোকজনকে সতর্ক থাকতে হবে। কোনো বিপজ্জনক সম্পর্কের ক্ষেত্রে অ্যাপ মুছে ফেললে বা পাসওয়ার্ড পাল্টালে নির্যাতনকারী সতর্ক হয়ে যেতে পারে। তাই নিরাপত্তার সঠিক পরিকল্পনা করা জরুরি। এ কারণেই সন্দেহজনক কিছু টের পেলে তা প্রমাণ হিসেবে রাখা, বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ নেওয়া এবং সাহায্যের জন্য নিরাপদ কোনো ডিভাইস ব্যবহার করার পরামর্শ দেন অনেকেই।
এর সমাধানগুলো খুব অজানা কিছু নয়, তবে প্রযুক্তি শিল্প এবং সরকারি সংস্থাগুলোকে আরও বেশি গুরুত্ব দিতে হবে। গোপনে নজরদারি বা মেসেজ চুরি করতে পারে এমন অ্যাপগুলো স্টোরে প্রকাশের আগে আরও কঠোরভাবে যাচাই করা উচিত। নজরদারির অ্যাপ বিক্রেতাদের বাণিজ্যিকভাবে বড় হওয়া আটকাতে পেমেন্ট প্রসেসর এবং অ্যাড নেটওয়ার্কগুলো বড় ভূমিকা রাখতে পারে। মোবাইল অপারেটিং সিস্টেমগুলোর প্রাইভেসি সতর্কতা, পারমিশন ড্যাশবোর্ড এবং সংবেদনশীল অ্যাকাউন্ট পরিবর্তনের অ্যালার্ট আরও উন্নত করা উচিত। নিরাপত্তা কোম্পানিগুলো স্টকারওয়্যারকে শুধু 'অপ্রয়োজনীয় সফটওয়্যার' হিসেবে চিহ্নিত না করে, আরও স্পষ্টভাবে শনাক্ত করতে পারে। সেই সাথে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকেও আরও ভালো প্রশিক্ষণ দেওয়া প্রয়োজন। অনেক সময়ই ভুক্তভোগীদের বলা হয় যে এটি স্রেফ একটি পারিবারিক বা সম্পর্কের ঝামেলা। অথচ এটি একই সাথে এক ধরনের বেআইনি ডিজিটাল অনুপ্রবেশও।
ব্যবহারকারীদেরও মোবাইলের নিরাপত্তা নিয়ে বাস্তবমুখী ভাবতে হবে। স্ক্রিন লক করাটাই যথেষ্ট নয়। যদি অন্য কেউ আপনার পিন নম্বর জানে, ক্লাউড ব্যাকআপের অ্যাক্সেস রাখে বা মোবাইল ক্যারিয়ার অ্যাকাউন্টের নিয়ন্ত্রণ নেয়, তবে বিপদ থেকেই যায়। শক্তিশালী পাসওয়ার্ড, মাল্টি-ফ্যাক্টর অথেনটিকেশন, নিয়মিত অ্যাপ যাচাই করা এবং সফটওয়্যার আপডেট করলে নিরাপত্তা অনেকটাই বাড়ে। ডিভাইস অ্যাডমিনিস্ট্রেটর সেটিংস, অ্যাক্সেসিবিলিটি পারমিশন এবং ফোনে অচেনা প্রোফাইল ইন্সটল করা আছে কি না, তা চেক করাও জরুরি। পরিবারের সবার সাথে মোবাইল প্ল্যান শেয়ার করার সময় বোঝা উচিত যে, কে কার লোকেশন ও অ্যাকাউন্টের রেকর্ড দেখতে পাচ্ছে। এই ছোট ছোট পরিবর্তনগুলোই হ্যাকারদের কাজ কঠিন করে দিতে পারে।
এর ভেতরের সত্যিটা বেশ অস্বস্তিকর। ফোন স্পাইওয়্যারের সবচেয়ে বড় হুমকি এখন আর শুধু রাষ্ট্রীয় পর্যায়ের বড় কোনো হ্যাকিং নয়, যা বিশ্বজুড়ে খবরের শিরোনাম হয়। বরং যত্ন, নিরাপত্তা এবং কাজের গতি বাড়ানোর নামে দৈনন্দিন জীবনে প্রবেশ করা সাধারণ বাণিজ্যিক নজরদারিও এখন বড় হুমকি। এই পরিবর্তনটি গুরুত্বপূর্ণ। কারণ এটি একটি জাতীয় সাইবার সিকিউরিটি সমস্যাকে মানুষের রান্নাঘর, শোবার ঘর, স্কুল এবং ছোট অফিসে নিয়ে এসেছে। কোনো সমাজ যদি মোবাইলে নজরদারি করাকে ব্যক্তিগত বিষয় হিসেবে দেখে, তবে তারা আসল সত্যটি মিস করবে। আধুনিক স্পাই অ্যাপ এখন আর শুধু সম্পর্কের ঝামেলার টুল বা সাধারণ সফটওয়্যার নয়। এটি একটি ক্রমবর্ধমান নজরদারি অর্থনীতির অংশ। এই অর্থনীতি মানুষকে শেখাচ্ছে যে, অন্যের ফোনে ঢুকে পড়া, নিয়ন্ত্রণ নেওয়া এবং গোপনে নজরদারি করা খুবই স্বাভাবিক বিষয়। আর এই বিষয়টি এমন প্রতিটি মানুষের জন্য চিন্তার কারণ হওয়া উচিত, যারা সাথে ফোন নিয়ে ঘোরেন।