২০৩০ সালের মধ্যেই ল্যাবে তৈরি রক্ত দিয়ে শুরু হতে পারে মানুষের চিকিৎসা
১ এপ্রিল, ২০২৬

বেশিরভাগ মানুষ মনে করেন, রক্ত ল্যাবে তৈরি করা যায় না। এটিকে অত্যন্ত জটিল এবং পুরোপুরি মানুষের শরীর ও রক্তদাতাদের ওপর নির্ভরশীল বলে মনে করা হয়। কিন্তু এখন পরিস্থিতি বদলাচ্ছে। ২০৩০ সালের মধ্যে রক্ত নিয়ে সবচেয়ে বড় খবরটি হয়তো কোনো রক্তদান শিবির হবে না। বরং অল্পসংখ্যক কিন্তু অত্যন্ত সংকটাপন্ন রোগীর জন্য ল্যাবে তৈরি লোহিত রক্তকণিকার বাস্তব ব্যবহার শুরু হতে পারে।
এটি কোনো কল্পবিজ্ঞান নয়। আবার পুরোপুরি রক্তদানের বিকল্পও নয়। এর লক্ষ্য অনেক সুনির্দিষ্ট ও বাস্তব। ব্রিটেন, জাপান এবং যুক্তরাষ্ট্রের বিজ্ঞানীরা ল্যাবের নিয়ন্ত্রিত পরিবেশে স্টেম সেল থেকে লোহিত রক্তকণিকা তৈরির চেষ্টা করছেন। ২০২২ সালে যুক্তরাজ্যের গবেষকরা একটি ক্লিনিক্যাল স্টাডি শুরু করেন। সেখানে কয়েকজন স্বেচ্ছাসেবকের শরীরে অল্প পরিমাণ ল্যাবে তৈরি লোহিত রক্তকণিকা দেওয়া হয়। এনএইচএস ব্লাড অ্যান্ড ট্রান্সপ্লান্ট-এর সহায়তায় ব্রিস্টল ও কেমব্রিজ ইউনিভার্সিটির মতো প্রতিষ্ঠান এই ট্রায়াল চালায়। শরীরে এই রক্তকণিকা কতটা নিরাপদ এবং কতদিন টিকে থাকে, সেটাই তারা দেখতে চেয়েছিলেন। এটি ছিল একটি বড় পদক্ষেপ। কারণ এর মাধ্যমে বিষয়টি ল্যাবের গণ্ডি পেরিয়ে সরাসরি রোগীদের ওপর পরীক্ষার স্তরে পৌঁছায়।
ল্যাবে তৈরি এই রক্তের পরিমাণ এখনো খুব সামান্য। তবে এর প্রয়োজনীয়তা অনেক। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে, বিশ্বজুড়ে প্রতি বছর কোটি কোটি ব্যাগ রক্ত সংগ্রহ করা হয়। তবুও অনেক দেশে রক্তের অভাব থেকেই যায়। আবার রক্ত পর্যাপ্ত থাকলেও সঠিক গ্রুপের রক্ত মেলানো সবসময় সহজ হয় না। সিকল সেল, থ্যালাসেমিয়া বা বিরল ইমিউন রিঅ্যাকশনের রোগীদের খুব নির্দিষ্ট ধরনের রক্তের প্রয়োজন হয়। বারবার অন্যের রক্ত নেওয়ার ফলে তাদের শরীরে অ্যান্টিবডি তৈরি হতে পারে। এর ফলে ভবিষ্যতে চিকিৎসা করা কঠিন ও বিপজ্জনক হয়ে ওঠে। এনএইচএস ব্লাড অ্যান্ড ট্রান্সপ্লান্ট বারবার সতর্ক করেছে যে, কিছু বিরল গ্রুপের রক্ত জোগাড় করা অত্যন্ত কঠিন। বিশেষ করে যাদের জিনগত কারণে বিরল গ্রুপের রক্ত থাকে, সাধারণ রক্তদাতাদের মধ্যে তাদের রক্তের মিল পাওয়া কঠিন হয়।
এখানেই ল্যাবে তৈরি রক্ত সবচেয়ে বেশি কাজে লাগতে পারে। এই দশকের শেষে বিজ্ঞানীরা সব ধরনের রক্ত অফুরন্ত পরিমাণে তৈরির চেষ্টা করছেন না। তারা মূলত অল্প পরিমাণে নিখুঁতভাবে মেলানো রক্তের ব্যাচ তৈরির চেষ্টা করছেন। যেসব রোগীকে রক্তের জন্য দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে হয় বা ঝুঁকিপূর্ণ ট্রান্সফিউশনের মধ্য দিয়ে যেতে হয়, এটি তাদের জন্য। এসব ক্ষেত্রে সামান্য পরিমাণ রক্তও চিকিৎসায় বড় বদল আনতে পারে। বর্তমানে যেসব রোগীকে রক্তদাতার ওপর নির্ভর করতে হয়, তারা হয়তো একদিন নিজেদের প্রয়োজন অনুযায়ী ল্যাবে তৈরি লোহিত রক্তকণিকা পাবেন। এই রক্ত হবে আরও পরিষ্কার, সতেজ এবং তাদের শরীরের সঙ্গে নিখুঁতভাবে মানানসই।
এই উদ্যোগের পেছনের বিজ্ঞানটি বেশ জটিল হলেও বোঝা কঠিন নয়। গবেষকরা মূলত রক্তদাতাদের থেকে পাওয়া স্টেম সেল দিয়ে কাজ শুরু করেন। মানুষের শরীর যেভাবে প্রাকৃতিকভাবে লোহিত রক্তকণিকা তৈরি করে, ল্যাবেও সেই ধাপগুলো অনুসরণ করা হয়। এরপর ট্রান্সফিউশনের জন্য উপযুক্ত ও পরিণত কোষগুলোকে আলাদা করা হয়। এর সবচেয়ে আকর্ষণীয় দিকটি শুধু রক্ত তৈরি করা নয়। বরং ল্যাবে তৈরি এই রক্ত বেশ সতেজ হয়। সাধারণ দান করা রক্তে বিভিন্ন বয়সের লোহিত রক্তকণিকা থাকে। কিন্তু ল্যাবে তৈরি রক্তে একদম নতুন কোষ থাকে, যা শরীরে বেশিদিন টিকে থাকতে পারে। বড় গবেষণায় যদি এটি প্রমাণিত হয়, তবে ভবিষ্যতে কিছু রোগীর রক্ত নেওয়ার প্রয়োজন অনেক কমে যেতে পারে।
ল্যাবের বাইরেও এর প্রভাব অনেক ব্যাপক। যেসব দেশের স্বাস্থ্য ব্যবস্থা উন্নত, সেখানে সাধারণ মানুষ মনে করেন রক্ত চাইলেই পাওয়া যায়। কিন্তু হাসপাতালগুলো আসল পরিস্থিতি জানে। বছরের বিভিন্ন সময়ে রক্তের সংকট দেখা দেয়। ছুটির দিন, তীব্র গরম, খারাপ আবহাওয়া বা রোগবালাইয়ের সময় রক্তদান কমে যায়। কোভিড-১৯ মহামারির সময় অনেক দেশে রক্ত সংগ্রহে বড় ধরনের ব্যাঘাত ঘটে। যুক্তরাষ্ট্রে আমেরিকান রেড ক্রস ও হাসপাতালগুলো বারবার রক্তের অভাব নিয়ে সতর্ক করেছিল। নিম্ন আয়ের দেশগুলোতে এই সমস্যা আরও গুরুতর ও নিত্যদিনের। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা দীর্ঘদিন ধরে আফ্রিকা ও এশিয়ার বিভিন্ন দেশে নিরাপদ রক্তের বড় অভাবের কথা বলে আসছে। সেখানে প্রসূতিদের রক্তক্ষরণ, শিশুদের রক্তাল্পতা ও দুর্ঘটনার কারণে সীমিত স্বাস্থ্য ব্যবস্থার ওপর সবসময় চাপ থাকে।
তবে ল্যাবে রক্ত তৈরির এই উদ্যোগের মূল কারণ শুধু রক্তের অভাব নয়। এর আসল কারণ হলো নিখুঁত চিকিৎসা। আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞান অঙ্গ প্রতিস্থাপন, জিন এডিটিং বা ক্যানসার কোষ ধ্বংস করায় অনেক এগিয়েছে। কিন্তু রক্ত সঞ্চালন এখনও মানুষের স্বেচ্ছায় রক্তদানের ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল। এই ব্যবস্থা প্রতিদিন মানুষের জীবন বাঁচাচ্ছে ঠিকই, তবে মানুষের শরীরের জটিলতার সঙ্গে এটি পেরে ওঠে না। শুধু পরিচিত ABO বা Rh গ্রুপই সব নয়। রক্তে শত শত অ্যান্টিজেন থাকে। যেসব রোগীকে বারবার রক্ত নিতে হয়, তাদের ক্ষেত্রে সামান্য অমিলও বড় জটিলতা তৈরি করতে পারে। গবেষণায় দেখা গেছে, রোগীর শরীরে অন্যের রক্তের বিরুদ্ধে অ্যান্টিবডি তৈরি হওয়া একটি বড় সমস্যা। একে বলে অ্যালোইমুনাইজেশন। রোগীর শরীরের সঙ্গে নিখুঁতভাবে মিলিয়ে রক্ত দেওয়া গেলে এই ঝুঁকি কমানো সম্ভব।
সিকল সেল রোগীদের জন্য এর সুফল সবচেয়ে বেশি হতে পারে। ব্রিটেন ও যুক্তরাষ্ট্রে চিকিৎসকরা বারবার বলেছেন, অনেক রোগীর সাধারণ গ্রুপের চেয়েও বেশি নিখুঁতভাবে মেলানো রক্ত প্রয়োজন। কিন্তু সাধারণ রক্তদাতাদের মধ্যে এই বৈচিত্র্য সবসময় থাকে না। তাই উপযুক্ত রক্ত খুঁজে পাওয়া কঠিন হয়ে যায়। এর ফলে শুধু অসুবিধাই হয় না। রক্ত পেতে দেরি হলে রোগীর ব্যথা বাড়ে, চিকিৎসা পিছিয়ে যায় এবং ঝুঁকি বাড়ে। এই ধরনের রোগীদের সাহায্যে যে প্রযুক্তি কাজ শুরু করবে, তা শুধু বিজ্ঞানের সাফল্যই প্রমাণ করবে না। এটি উন্নত স্বাস্থ্য ব্যবস্থায় দীর্ঘদিন ধরে থাকা একটি বড় বৈষম্যও দূর করবে।
তবে এক্ষেত্রে কিছু সতর্কতারও কারণ রয়েছে। ল্যাবে তৈরি রক্তের খরচ অনেক বেশি। এর জন্য প্রচুর সময়, বিশেষ যন্ত্রপাতি এবং কড়া নিয়ন্ত্রণের প্রয়োজন। ২০৩০ সালের মধ্যে সাধারণ সার্জারি বা জরুরি চিকিৎসার জন্য পর্যাপ্ত রক্ত তৈরি করা প্রায় অসম্ভব। প্লাজমা ও প্লেটলেট তৈরির ক্ষেত্রেও আলাদা চ্যালেঞ্জ রয়েছে। তা ছাড়া এই রক্ত কতটা নিরাপদ ও কার্যকর, নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলো তার শক্ত প্রমাণ চাইবে। প্রাথমিক ট্রায়ালগুলো গুরুত্বপূর্ণ হলেও, এটি কেবল শুরু। অনেক চিকিৎসা পদ্ধতি প্রথম ধাপে আশাব্যঞ্জক মনে হলেও পরে খরচ বা বাস্তবতার কারণে থমকে যায়।
এজন্যই ল্যাবে তৈরি রক্তকে সাধারণ রক্তদানের বিকল্প হিসেবে ভাবা ঠিক হবে না। এটিকে একটি নির্দিষ্ট চিকিৎসার হাতিয়ার হিসেবে উন্নত করা উচিত। সরকার ও স্বাস্থ্য ব্যবস্থা এই গবেষণায় অর্থায়ন করতে পারে। একইসঙ্গে বিরল রক্তদাতাদের তালিকা আরও মজবুত করতে পারে। হাসপাতালগুলোর ভবিষ্যতের এই রক্তের ভরসায় বসে থাকলে চলবে না। তাদের এখনও শক্তিশালী রক্তদান কর্মসূচি চালিয়ে যেতে হবে। বিরল রক্তের জন্য ডিজিটাল ট্র্যাকিং ও অন্যান্য দেশের সঙ্গে সহযোগিতার ওপরও জোর দিতে হবে। এই নতুন প্রযুক্তি বর্তমান ব্যবস্থাকে মুছে ফেলার বদলে তাকে সাহায্য করলেই সবচেয়ে ভালো ফল পাওয়া যাবে।
এই উদ্যোগ সফল হলে, ২০৩০ সালের মধ্যে এর প্রভাব হয়তো শুরুতে খুব একটা চোখে পড়বে না। প্রতিটি হাসপাতালে কৃত্রিম রক্তের বোতল হয়তো সাজানো থাকবে না। এর শুরুটা হতে পারে এমন কোনো শিশুকে দিয়ে, যার শরীরে অ্যান্টিবডির কারণে রক্ত দেওয়া প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়েছিল। অথবা এমন কোনো রোগীকে দিয়ে, যাকে আর সঠিক রক্তদাতার খোঁজে বসে থাকতে হবে না। সেটাই হবে বিজ্ঞানের জন্য এক বিরাট মোড় ঘোরানো ঘটনা। রক্ত দীর্ঘদিন ধরেই চিকিৎসা বিজ্ঞানের একটি বড় সীমানা হয়ে দাঁড়িয়ে ছিল। গবেষকরা যদি অত্যন্ত জরুরি রোগীদের জন্য সামান্য পরিমাণ রক্তও ল্যাবে তৈরি করতে পারেন, তবে বিজ্ঞানের সেই সীমাবদ্ধতা আগের চেয়ে অনেক ছোট হয়ে আসবে।