পৃথিবী থেকে ধর্ম হারিয়ে যাচ্ছে না, বরং বিশ্বজুড়েই এর রূপ পাল্টাচ্ছে
১ এপ্রিল, ২০২৬

খুব সহজেই মনে হতে পারে যে বিশ্বজুড়ে ধর্মের প্রভাব কমছে। অনেক ধনী দেশে চার্চে যাওয়া মানুষের সংখ্যা কমেছে। ধর্মের প্রতি টান দুর্বল হয়েছে। এক প্রজন্ম আগের চেয়ে জনজীবন এখন অনেক বেশি সেক্যুলার বা ধর্মনিরপেক্ষ মনে হয়। কিছু জায়গায় এই চিত্র সত্যি হলেও, এটি পুরো গল্প নয়। আসল কথা হলো, ধর্ম হারিয়ে যাচ্ছে না। বরং ভূগোল, বয়স, অভিবাসন এবং জন্মহারের কারণে বিশ্বের ধার্মিক জনসংখ্যার হিসাব বদলে যাচ্ছে। এর প্রভাব আগামী কয়েক দশক ধরে রাজনীতি, শিক্ষা, পারিবারিক জীবন এবং সামাজিক আস্থার ওপর পড়বে।
বড় বড় পরিসংখ্যানগুলোও এই দিকেই ইঙ্গিত দেয়। পিউ রিসার্চ সেন্টারের গবেষণা অনুযায়ী, বিশ্বজুড়ে এখনো খ্রিষ্টধর্মই সবচেয়ে বড়। সম্প্রতি বিশ্বে তাদের অনুসারীর সংখ্যা প্রায় ২৩০ কোটি। জনসংখ্যার দিক থেকে ইসলাম দ্বিতীয় বৃহত্তম এবং সবচেয়ে দ্রুত বর্ধনশীল ধর্ম। হিন্দুরা রয়েছে তৃতীয় অবস্থানে, যাদের বেশিরভাগই ভারত ও নেপালে বাস করেন। ধর্মহীন মানুষের সংখ্যাও চোখে পড়ার মতো। এদের সাধারণত নাস্তিক, অজ্ঞেয়বাদী বা কোনো প্রাতিষ্ঠানিক ধর্মে যুক্ত না থাকা মানুষ হিসেবে ধরা হয়। বিশেষ করে চীন, ইউরোপ, উত্তর আমেরিকা এবং পূর্ব এশিয়ার কিছু অংশে এদের সংখ্যা বেশি। তবে এই বিষয়ে একটি বড় ভুল ধারণা রয়েছে। ধর্মহীন মানুষের সংখ্যা সব জায়গায় সমানতালে বাড়ছে না। অনেক জায়গাতেই এদের বৃদ্ধির হার ধীর হয়ে গেছে। আবার কিছু অঞ্চলে ধার্মিক সম্প্রদায়ের দ্রুত বৃদ্ধির কাছে এরা পিছিয়ে পড়ছে।
বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ। কারণ জনসংখ্যার এই পরিবর্তন শুধু বিশ্বাসের ওপর নির্ভর করে না, এটি জন্ম ও মৃত্যুর হারের ওপরও নির্ভরশীল। পিউ-এর দীর্ঘমেয়াদী গবেষণায় বারবার দেখা গেছে, অন্যান্য বড় ধর্মাবলম্বীদের তুলনায় মুসলিমরা গড়ে বেশি তরুণ এবং তাদের জন্মহারও বেশি। সাব-সাহারান আফ্রিকায় খ্রিষ্টানদের সংখ্যা সবচেয়ে দ্রুত বাড়ছে। সেখানকার জনসংখ্যা তরুণ এবং তা বেড়েই চলেছে। অন্যদিকে, ইউরোপের বেশিরভাগ মানুষের বয়স বেড়ে যাচ্ছে। সেখানে খ্রিষ্টান চার্চ এবং ধর্মহীন—উভয় গোষ্ঠীর মধ্যেই জন্মহার কম। জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়ার চিত্রটিও কাছাকাছি। সময়ের সাথে সাথে সেখানে ধর্ম এবং পরিচয়ে বড় পরিবর্তন এসেছে। কিন্তু তাদের সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো—সামগ্রিকভাবে জনসংখ্যা কমে যাওয়া এবং বয়স্ক মানুষের সংখ্যা বেড়ে যাওয়া।
অন্যভাবে বললে, ধর্মের ভবিষ্যৎ কেবল ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান, সংসদ বা অনলাইনের বিতর্কে নির্ধারিত হচ্ছে না। এটি নির্ধারিত হচ্ছে হাসপাতালের মাতৃসদন, অভিবাসনের পথ এবং শহরের বিভিন্ন পাড়া-মহল্লায়। আজ নাইজেরিয়ায় জন্ম নেওয়া একটি শিশু আর সুইডেনে জন্ম নেওয়া একটি শিশুর ধর্মীয় পরিবেশ একেবারেই আলাদা। ধারণা করা হচ্ছে, নাইজেরিয়া বিশ্বের অন্যতম জনবহুল দেশ হতে যাচ্ছে। সেখানে খ্রিষ্টান ও মুসলিম—উভয় সম্প্রদায়ের মানুষের ব্যক্তিগত ও সামাজিক জীবনে ধর্ম একটি বড় জায়গা জুড়ে আছে। অন্যদিকে, সুইডেনে ধর্মহীন মানুষের সংখ্যা অনেক বেশি। সেখানে ধর্ম ও পরিচয়ের সম্পর্কও বেশ আলাদা। তবে সেখানেও বিয়ে বা শেষকৃত্য, দাতব্য কাজ এবং সামাজিক সহায়তায় ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানগুলো এখনো ভূমিকা রাখে।
অভিবাসনের কারণে এই সমীকরণ আরও বদলেছে। ধার্মিক মানুষরা শুধু নিজেদের দেশের সীমানাতেই আটকে থাকেন না। গত তিন দশকে অভিবাসনের কারণে অনেক পশ্চিমা শহর দৃশ্যতই বহুমাত্রিক ধর্মে রূপ নিয়েছে। লন্ডন, টরন্টো, প্যারিস এবং নিউইয়র্ক এর ভালো উদাহরণ। নতুন আসা মানুষদের হাত ধরে এসব শহরের বিভিন্ন এলাকায় মসজিদ, মন্দির, গুরুদ্বার, পেন্টেকোস্টাল চার্চ এবং বৌদ্ধ কেন্দ্র গড়ে উঠেছে। ব্রিটেনের আদমশুমারিতে দেখা গেছে, সেখানে নিজেদের খ্রিষ্টান পরিচয় দেওয়া মানুষের সংখ্যা কমেছে এবং ধর্মহীনদের সংখ্যা বেড়েছে। কিন্তু একইসাথে মুসলিম, হিন্দু, শিখ ও অন্যান্য সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের বৃদ্ধিও অব্যাহত রয়েছে। অর্থাৎ, মানুষ শুধু ধর্মবিশ্বাস থেকে বেরিয়ে যাচ্ছে—বিষয়টি এত সহজ নয়। বরং এটি নানা ধর্মের এক মিশ্র সমাজ তৈরি করেছে।
এই পরিবর্তনের কারণেই ধর্ম নিয়ে প্রকাশ্য বিতর্কগুলো আগের চেয়ে অনেক বেশি তীব্র মনে হয়। অনেক দেশে পুরোনো সংখ্যাগরিষ্ঠ ধর্ম তাদের একচেটিয়া সামাজিক প্রভাব হারাচ্ছে। ঠিক সেই সময়ে ছোট ছোট ধর্মীয় গোষ্ঠীগুলো আরও বেশি দৃশ্যমান হয়ে উঠছে। এর ফলে স্কুল, খাবার, পোশাক, ছুটি, দাফন বা শেষকৃত্যের নিয়ম এবং চিন্তার স্বাধীনতা নিয়ে দ্বন্দ্ব তৈরি হতে পারে। ফ্রান্সে সেক্যুলারিজম এবং প্রকাশ্যে ধর্মীয় পোশাক পরা নিয়ে বারবার বিতর্ক হয়েছে। ভারতে হিন্দু পরিচয় এবং নাগরিকত্বের সম্পর্ক নিয়ে উত্তেজনা বেড়েছে। যুক্তরাষ্ট্রে এখনো রাজনীতি এবং জনজীবনে খ্রিষ্টধর্মের বড় প্রভাব রয়েছে। তবে বিংশ শতাব্দীর মাঝামাঝি সময়ের চেয়ে দেশটি এখন অনেক বেশি বৈচিত্র্যময়। আর আগের যেকোনো প্রজন্মের চেয়ে এখন সেখানে অনেক বেশি মানুষ নিজেদের ধর্মহীন বলে পরিচয় দেন।
এর সামাজিক প্রভাব শুধু রাজনীতির মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই। ধার্মিক মানুষের সংখ্যার পরিবর্তনের ওপর নির্ভর করে কারা দাতব্য সংস্থা চালাবেন, কারা স্বেচ্ছাসেবী হিসেবে কাজ করবেন এবং বিপদের সময় কারা পাশে দাঁড়াবেন। যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে, নিজেদের মধ্যে পার্থক্য থাকা সত্ত্বেও ধর্মীয় সম্প্রদায়গুলোই মূলত খাদ্য সহায়তা, শরণার্থী পুনর্বাসন, বয়স্কদের যত্ন ও সামাজিক বন্ধন তৈরির প্রধান চালিকাশক্তি। পুরোনো চার্চগুলোতে যখন মানুষের আনাগোনা কমে যায়, তখন একটি শহর শুধু একটি উপাসনালয়ই হারায় না। তারা এমন একটি প্রতিষ্ঠান হারায়, যা একসময় খাবার বিলি, তরুণদের ক্লাব, শেষকৃত্য এবং প্রতিদিনের বিপদে-আপদে মানুষের পাশে থাকার কাজগুলো করত। আবার একই সময়ে, অভিবাসীদের তৈরি করা নতুন ধর্মীয় সমাবেশগুলো ভিন্ন ভাষা ও ঐতিহ্যে সেই একই সামাজিক নেটওয়ার্ক নতুন করে গড়ে তোলে।
এই কারণেই কোন ধর্ম ‘জিতছে’—এমন স্থূল হিসাব আসল বিষয়টা তুলে ধরতে পারে না। জনসংখ্যা দিয়ে কেবল আকারটা বোঝা যায়। কিন্তু এর মাধ্যমে মানুষের বিশ্বাসের গভীরতা, চর্চার ধরন বা দৈনন্দিন জীবনে ধর্মের ভূমিকা পুরোপুরি বোঝা যায় না। কোনো একটি দেশে হয়তো কাগজে-কলমে লাখ লাখ খ্রিষ্টান, মুসলিম, হিন্দু বা বৌদ্ধ থাকতে পারে। কিন্তু বাস্তবে তাদের উপাসনার ধরন একেক রকম হতে পারে। ল্যাটিন আমেরিকা এর একটি স্পষ্ট উদাহরণ। ওই অঞ্চলে ক্যাথলিকদের গভীর প্রভাব রয়েছে। অথচ ব্রাজিল ও গুয়াতেমালার মতো দেশগুলোতে পেন্টেকোস্টাল এবং ইভানজেলিক্যাল চার্চ দ্রুত জনপ্রিয় হচ্ছে। এরা স্থানীয় উপাসনার ধরন, মানুষের অভ্যাস ও রাজনৈতিক জোটের হিসাব-নিকাশ পাল্টে দিচ্ছে। শুধু সংখ্যা নয়, মানুষ ঠিক কোন ধরনের ধর্ম চর্চা করছে, সেটাও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
অনেকেই মনে করেন, আধুনিকায়ন সবসময় ধর্মবিশ্বাসকে দুর্বল করে দেয়। এটি একটি ভুল ধারণা। এ নিয়ে মিশ্র প্রমাণ রয়েছে। কিছু সমাজে শিক্ষা, নগরায়ন এবং আয় বাড়ার সাথে প্রাতিষ্ঠানিক ধর্মের সম্পর্ক কমার একটা মিল পাওয়া যায়। বিশেষ করে যেখানে ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানগুলো মানুষের আস্থা হারিয়েছে। কিন্তু অন্যান্য অনেক জায়গায় আধুনিক জীবন ধর্মকে মুছে ফেলতে পারেনি। বরং এটি ধর্মের রূপ বদলে দিয়েছে। মেগাচার্চ, ডিজিটাল প্রার্থনা গ্রুপ, ইসলামিক ফাইন্যান্স বা ইসলামি ব্যাংকিং ব্যবস্থা, যোগব্যায়ামের সাথে যুক্ত আধ্যাত্মিকতা এবং নতুন করে তীর্থযাত্রার চল শুরু হওয়া—এসবই প্রমাণ করে যে, ধর্ম সময়ের সাথে মানিয়ে নেয়। এমনকি যেখানে পুরোনো উপাসনালয়গুলোতে মানুষের ভিড় কমে গেছে, সেখানেও নতুন কোনো উপায়ে মানুষের আধ্যাত্মিক খোঁজ ঠিকই বেঁচে আছে।
তাহলে এই বাস্তবতায় সরকার, শিক্ষক এবং সমাজনেতাদের কী করা উচিত? প্রথমত, তাদের ধর্ম সম্পর্কে আরও ভালোভাবে জানতে হবে। জনপরিসরে হওয়া অনেক বিতর্কেই ধর্মকে হয় পুরোনো আমলের জিনিস, না হয় হুমকি হিসেবে দেখা হয়। এর কোনোটাই সত্যি নয়। ধর্ম এখনো অনেক মানুষের নৈতিক জীবন ও সমাজের একটি টেকসই চালিকাশক্তি। অজ্ঞতা কমানোর জন্য স্কুল ও সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোতে বড় ধর্মগুলো এবং ধর্মহীন দৃষ্টিভঙ্গি সম্পর্কে পরিষ্কার ধারণা দেওয়া উচিত। এর উদ্দেশ্য ধর্মপ্রচার নয়, বরং মানুষকে জানানো। দ্বিতীয়ত, আদমশুমারি সংস্থা এবং গবেষকদের আরও সতর্কভাবে তথ্য সংগ্রহ করতে হবে। কে কোন ধর্মে আছে—শুধু এই হিসাবটুকু দিয়ে মানুষের ধর্মাচরণ, ধর্মান্তর এবং প্রজন্মের পরিবর্তনের আসল পার্থক্যগুলো বোঝা যায় না। তৃতীয়ত, নীতিনির্ধারকদের উচিত বহুমাত্রিক সমাজের জন্য আগে থেকেই প্রস্তুতি নেওয়া। এর মানে হলো—উপাসনা, ছুটি, প্রাতিষ্ঠানিক ধর্মীয় সেবা, দাফন বা শেষকৃত্য এবং বৈষম্য রোধের ক্ষেত্রে এমন সব ন্যায্য নিয়ম তৈরি করা, যা সবার জন্য সমানভাবে প্রযোজ্য হবে।
ধর্মীয় নেতারাও একটি বড় চ্যালেঞ্জের মুখে রয়েছেন। কেবল অনুসারীদের সংখ্যা বাড়লেই নৈতিক অধিকার প্রতিষ্ঠিত হয় না। অনেক প্রতিষ্ঠানই এখন কেলেঙ্কারি, রাজনীতিকরণ ও অবিশ্বাসের মতো সমস্যার সাথে লড়ছে। ধর্মীয় সম্প্রদায়গুলো যদি সমাজে নিজেদের গুরুত্ব ধরে রাখতে চায়, তবে তাদের সেবা ও স্বচ্ছতার মাধ্যমে বিশ্বাসযোগ্যতা প্রমাণ করতে হবে। বড় ধরনের মতপার্থক্য থাকা সত্ত্বেও সবার সাথে মিলেমিশে থাকার সদিচ্ছাও দেখাতে হবে।
আজকের বৈশ্বিক ধর্মের মানচিত্র থেকে সবচেয়ে বড় শিক্ষাটি হলো—ধর্মের পতনই শেষ কথা নয়, আবার শুধু অনুসারী বৃদ্ধি পাওয়া মানেই বিজয় নয়। ধর্ম হারিয়ে যাচ্ছে না। এটি জায়গা বদলাচ্ছে, সংখ্যায় বাড়ছে, খণ্ড খণ্ড হচ্ছে এবং নতুন জায়গায় নতুন রূপে ফিরে আসছে। বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ, কারণ কোটি কোটি মানুষ কীভাবে বিয়ে করবেন, শোক পালন করবেন, ভোট দেবেন, দান করবেন, সন্তান মানুষ করবেন এবং ভবিষ্যৎ নিয়ে কী ভাববেন—তা এখনো এই বিশ্বাসের ওপরই নির্ভর করে। বিশ্বজুড়ে মানুষ একচেটিয়াভাবে সেক্যুলার বা একচেটিয়াভাবে ধার্মিক হচ্ছে না। বরং এই হিসাবটি আরও বেশি অসম হয়ে উঠছে। এই অসমতাকে মেনে নিয়ে একসাথে বাঁচতে শেখাই হয়তো এই শতাব্দীর সামাজিক শান্তির সবচেয়ে বড় পরীক্ষা হতে যাচ্ছে।