জঙ্গলে অবাধ লুঠ, খালি হয়ে যাচ্ছে নদীর বুক, জলপাইগুড়িতে ভোটের হাওয়া কেমন? কে এগিয়ে, কে পিছিয়ে?

২১ এপ্রিল, ২০২৬

জঙ্গলে অবাধ লুঠ, খালি হয়ে যাচ্ছে নদীর বুক, জলপাইগুড়িতে ভোটের হাওয়া কেমন? কে এগিয়ে, কে পিছিয়ে?

<p><span style="font-weight: 400;"><strong>দীপক ঘোষ:</strong> জলপাইগুড়িতে পা রাখলেই এখন অনুভব করবেন ভোট এসে গিয়েছে। রাজ্যের অন্যান্য জেলার থেকে আলাদা বৈশিষ্ট্য রয়েছে এই জেলার। এখনও রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতার নামে নিষ্ঠুর পেশিসংঘাতের পরিবেশ তার রাজত্ব গড়তে পারেনি। ডুয়ার্স বলতেই বাঙালির চোখের সামনে ভেসে ওঠে অপরূপ প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে ভরা এক অঞ্চল। কিন্তু সেই ডুয়ার্স নিজে কেমন আছে? (Jalpaiguri Voter Hawa)</span></p> <p><span style="font-weight: 400;">ডুয়ার্সে এখনও রাজনৈতিক সৌজন্যের সংস্কৃতি ভেঙেচুরে যায়নি। ভোট আছে, ভোটের লড়াই আছে। সেইসঙ্গে চোখে পড়বে রাজনৈতিক সৌজন্য। ভোটের মুখে রামনবমীর মিছিল ঘিরে সেই সৌজন্যই চোখে পড়ল এখানে। একই শোভাযাত্রায় একসঙ্গে পা মেলালেন প্রতিদ্বন্দ্বী দুই প্রার্থী। তৃণমূলের বুলুচিক বরাইক এবং তৃণমূলের সুকরা মুন্ডা। </span><span style="font-weight: 400;">বুলুচিককে বলতে শোনা যায়, “আমরা প্রত্য়েক বছরই এটা পালন করা হয়। এখানে কোনও জাত, ধর্ম দেখি না আমরা।” সুকরা আবার বলেন, “এটা ধর্মীয় অনুষ্ঠান। প্রার্থী হোন বা না হোন, আসবেন, অংশ নেবেন। সুশাসন এবং মানবকল্যাণের জন্যই আয়োজন। সকলকে স্বাগত এখানে।” (West Bengal Assembly Elections 2026)</span></p> <p><span style="font-weight: 400;">গত <a title="বিধানসভা নির্বাচন" href="https://bengali.abplive.com/elections/west-bengal-assembly-election-2026" data-type="interlinkingkeywords">বিধানসভা নির্বাচন</a>েই এখানে একেবারে নজরকাড়া উত্থান হয় বিজেপির। জলপাইগুড়ি জেলার মোট ৭টি আসনের মধ্যে চারটিতেই জয়ী হয় গেরুয়া শিবির। মাত্র ৩ টি আসন ধরে রাখতে পারে তৃণমূল কংগ্রেস। ২১-এর ভোটে বিজেপির দখলে ছিল, ধূপগুড়ি, ময়নাগুড়ি, ডাবগ্রাম-ফুলবাড়ি এবং নাগরাকাটা। অন্য দিকে তৃণমূল পেয়েছিল জলপাইগুড়ি, রাজগঞ্জ, এবং মাল আসনটি।</span></p> <p><span style="font-weight: 400;">২০২৪ এর নির্বাচনে এই লোকসভা আসনে জয়ী হন বিজেপির জয়ন্ত রায়। ২০১৯ সালের পর দ্বিতীয়বারের জন্য তিনি জয়ী হলেও, বিধানসভার ফল অনুযায়ী এগিয়ে যায় তৃণমূল কংগ্রেস। হিসেব পাল্টে হয়ে যায় তৃণমূল-৪, বিজেপি-৩। তৃণমূলের দখলে চলে যায় ময়নাগুড়ি, রাজগঞ্জ, মাল, এবং নাগরাকাটা। অন্য দিকে, বিজেপি এগিয়ে ছিল ধূপগুড়ি, জলপাইগুড়ি, ফুলবাড়ি কেন্দ্রে।</span></p> <p><span style="font-weight: 400;">এবারের নির্বাচনী প্রতিদ্বন্দ্বিতায় চার-তিনে এগিয়ে থেকে লড়াইয়ে নেমেছে তৃণমূল কংগ্রেস। ফলে নিজেদের আসনসংখ্যা বাড়িয়ে নেওয়ার লক্ষ্যে যার যার মতো করে হাতিয়ারে শান দিচ্ছে দু’পক্ষ। </span><span style="font-weight: 400;">ফলে প্রচারের ময়দানে ভাতা, উন্নয়ন, SIR বনাম, অনুন্নয়ন, দুর্নীতি ও সাম্প্রদায়িক সমীকরণের সংঘাত।</span></p> <p><span style="font-weight: 400;">তৃণমূল, বিজেপি-দু’পক্ষই মানুষকে যখন তাদের প্রতিশ্রুতি আর স্লোগানে প্রভাবিত করতে চাইছে, সেই সময় সাধারণ মানুষ কী চাইছেন? পথ চলতে চলতে শুনতে চাইলাম তাঁদের কথা। একেবারে খোলা মনেই তাঁরা উজাড় করে দিলেন নিজেদের মনের কথা।</span></p> <p><span style="font-weight: 400;">স্থানীয় এক বাসিন্দা বলেন, “কাজকর্মই ভাল। চাকরি বাকরি কোথায়?” চাকরির প্রয়োজনীয়তা শোনা যায় আর এক ব্যক্তির মুখে। তাঁকে বলতে শোনা যায়, “চাকরি চাই। চাকরি তো লাগবেই! ছেলেগুলো কী খাবে?” রাজ্য সরকারের যুবসাথী প্রকল্পে বেকারদের যে ১৫০০ করে টাকা দেওয়া হচ্ছে, সেপ্রসঙ্গ উঠতে কার্যত ফুঁসে ওঠেন তৃতীয় একজন। তিনি বলেন, “ওটায় কী হবে? ১৫০০ টাকায় কী হয় বলুন তো!” যে চা-বাগানের উপর জীবন-জীবিকা নির্ভর করে স্থানীয়দের, সেই চা-বাগানেরই কোনও উন্নয়ন নেই বলে জানান অন্য আর একজন। চা-বাগানের উন্নতি না হলে কিছু হবে না বলে জানান তিনি।</span></p> <p><span style="font-weight: 400;"><iframe title="YouTube video player" src="https://www.youtube.com/embed/pSkZV-JLM84?si=6A2mLxVaVAXRlkdF" width="560" height="315" frameborder="0" allowfullscreen="allowfullscreen"></iframe></span></p> <p><span style="font-weight: 400;">এই গুচ্ছ গুচ্ছ অভিযোগ খতিয়ে দেখতে আমরা বেরিয়ে পড়েছিলাম বাস্তব চিত্র তুলে আনার জন্য। ডুয়ার্স রাজ্যের পর্যটন মানচিত্রে এক উজ্জ্বল স্থান দখল করে আছে। সেই পর্যটনের হাল-হকীকত সন্ধান করতে গিয়ে কার্যত বিস্মিত হতে হল আমাদের।</span></p> <p><span style="font-weight: 400;">জলপাইগুড়িতে বছরের পর বছর ধরে যে করিডর ধরে যাতায়াত হাতির দলের, সেগুলি আটকে দেওয়া হয়েছে। তৈরি হচ্ছে রিসর্ট-হোটেল। কুল কুল করে বয়ে চলা যে মূর্তি নদীকে ঘিরে বাড়তি আবেগ বাঙালির, তাকে কার্যত গ্রাস করতে বসেছে নির্মীয়মান হোটেল-রিসর্টগুলি। পরিবেশবিদ মানবেন্দ্র রায় বলেন, “এই চাপরামারি জঙ্গল থেকে খরিয়া বন্দর যাতায়াতে দীর্ঘ ৫০-৬০ বছর ধরে এই রাস্তা ব্যবহার করত হাতির দল। ইদানীং কালে প্রচুর রিসর্ট হওয়ায় হাতিরা বাধা পাচ্ছে এবং গ্রামে ঢুকে নিরীহ মানুষকে ঘরবাড়ি ভাঙচুর করছে। অত্যন্ত দুঃখজনক ব্যাপার। বললেও সরকার পদক্ষেপ করছে না।”</span></p> <p><span style="font-weight: 400;">সাধারণ মানুষের অভিযোগ, এখানে রাস্তার দু’পাশে জঙ্গল ঘন মনে হলেও ভিতরে চলছে ব্যাপক বৃক্ষ নিধন। গত কয়েক বছর ধরে যেটা বাড়াবাড়ির পর্যায়ে। এখানে বনরক্ষী বাহিনী আছে কিন্তু গাছ রক্ষা হচ্ছে না।</span></p> <p><span style="font-weight: 400;">জঙ্গল খালি হচ্ছে, ফলে হাতি হারাচ্ছে তাদের আস্তানা। সম্প্রতি আস্তানা হারিয়ে হাতির লোকালয়ে ঢুকে পড়ার ঘটনা বেড়েছে ব্যাপকহারে। একদিকে হাতির করিডর আটকে নির্মাণ, অন্যদিকে জঙ্গল ধ্বংসের পরিণতি ভুগতে হচ্ছে সাধারণ মানুষকে। মানবেন্দ্র বাবুর বক্তব্য, “এই সংরক্ষিত বনাঞ্চলে শাল, সেগুন কাঠ কাটাক কোনও নিয়মই নেই। কিন্তু বন দফতর কী ভাবে যে কাটল...কেটে জমা করা হয়েছে, ধীরে ধীরে বিক্রি করা হয়েছে। কিছু দিন আগেও বিপুল গাছ ছিল। ধীরে ধীরে হালকা হয়ে যাচ্ছে জঙ্গল।”</span></p> <p><span style="font-weight: 400;">জঙ্গল খালি হচ্ছে, ফলে হাতি আস্তানা হারাচ্ছে। লোকালয়ে হাতি ঢুকে পড়ার ঘটনা বাড়ছে ইদানীং কালে এক জায়গায় প্রচুর কাঠ কেটে জড়ো করে রাখা হয়েছে বলে চোখে পড়ল। আর এই জঙ্গল ধ্বংসের পরিণতি ভুগতে হচ্ছে সাধারণ মানুষকে। স্থানীয় এক বাসিন্দা বলেন, “নিয়ে চলে যাচ্ছে। কিছু করার নেই। ভিতর দিয়ে, ভিতর দিয়ে চলে যাচ্ছে। দিনের পর দিন একই জিনিস। বন অলরেডি নষ্ট হয়ে গিয়েছে। নাহলে হাতি রাস্তায় চলে আসে!” হোটেল-রিসর্ট গড়ে ওঠা নিয়ে আর এক ব্যক্তি বলেন, “২০০৬ সাল থেকে দেখছি। কখনও কখনও বাধা দেয়। বাধা দেওয়ার পর আবার চালু হয়ে যায়। আগে বলত, জঙ্গস থেকে এক কিলোমিটার দূর থেকে হবে রিসর্ট। এখন সাইডে হচ্ছে, সামনে হচ্ছে।” এক মহিলার কথায়, “বাধা দিলেও মানে না।” লোকালয়ে হাতি ঢুকে পড়ার ঘটনায় বলেন, “সব বস্তিতে ঢুকে পড়ে। দিনে দিনে বাড়ছেই।” যদিও চালসার রেঞ্জার অশেষ পালের বক্তব্য, “গাছ চুরির কোনও অভিযোগ আসেনি। অভিযোগ এলে তদন্ত করে দেখা হবে।”</span></p> <p><span style="font-weight: 400;">পর্যটন এই জেলায় আর্থিক সমৃদ্ধির সবচেয়ে বড় যোগান। অথচ এই পর্যটনই আজ প্রশ্ন চিহ্নের মুখে। কিন্তু পকেট মোটা হচ্ছে লুটেরাদের। এখানে দিনের আলোয় চলছে প্রাকৃতিক সম্পদের লুঠ। শুধু জঙ্গলে নয়, খালি হয়ে যাচ্ছে নদীর বুক। বালি-পাথর লুঠের কারবার এতটাই রমরম করে চলছে যা নিজে চোখে না দেখলে বিশ্বাস হওয়ার নয়। সকাল থেকে লাইন দিয়ে ট্রাক্টর বোঝাই হয়ে যাচ্ছে বালি আর পাথর। ন্যাওড়া নদীর বিস্তীর্ণ দু’পারেই লুঠের কারবার। এই এলাকাকে মানুষ এখন চেনে বালুচিস্তান নামে। নদী থেকে বালি বোঝাই করে নিয়ে যাওয়া এক ট্রাক্টর চালককে বালি তোলার নিয় প্রশ্ন করলে বলেন, “নদী থেকে তুলে আনছি। রোজ চার-পাঁচ গাড়ি বালি তোলা হয়। পুলিশ রাস্তায় আটকালে মালিক কথা বলে। কী দেয় মালিক জানে।” আর এক ট্রাক্টর চালক বলেন, “মাসোহারা দিতে হয় পুলিশকে। মাসে ৫০০০ করে দিতে হয়। রোজ ১০০ টাকা করেও দিতে হয়।”</span></p> <p><span style="font-weight: 400;">মালবাজার থানার IC সৌমজিৎ মল্লিক বলেন, “এখন কোনও বিষয়ে মন্তব্য করব না। যা বলার ”</span><span style="font-weight: 400;">ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ বলবেন।” জলপাইগুড়ির পুলিশ সুপার <a title="অমরনাথ" href="https://bengali.abplive.com/topic/amarnath" data-type="interlinkingkeywords">অমরনাথ</a> কে পুলিশের টাকা নেওয়ার বিষয়ে কোনও প্রতিক্রিয়া দিতে চাননি।</span></p> <p><span style="font-weight: 400;">জলপাইগুড়ি জেলায় কর্মসংস্থানের সবচেয়ে বড় উৎসই হল চা। সেই চা বাগানগুলি ক্রমশ জড়িয়ে পড়ছে বিপর্যয়ের বেড়াজালে। যত দিন গড়াচ্ছে ততই লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়ছে বন্ধ চা বাগানের সংখ্য়া। তেমনি সদ্য বন্ধ হয়ে যাওয়া একটি চা বাগানে, কিলকটে ঢুকেছিলাম আমরা। মালিক বাগান বন্ধ করে দিলে শ্রমিকরা নিজেদের হাতে দায়িত্ব তুলে নেন। চা বাগানে কর্মরত এক মহিলা বলেন, “আমরাই চালাচ্ছি এখন।” অন্য একজন বলেন, “৯ তারিখ পেমেন্ট হয়েছিল। সাহেব বলল, পেমেন্ট আনতে যাচ্ছি, আর এল না।” কিন্তু টাকা কে দিচ্ছে? জানা গেল, চা-শ্রমিকদের নেতারা মিলে সব করছেন। কাঁচা পাতাও বিক্রি করতে হচ্ছেন বলে জানান অনেকে। </span></p> <p><span style="font-weight: 400;">একদিকে সম্পদ লুঠ, সম্পদ ধ্বংস। অন্যদিকে কর্মসংস্থান সঙ্কোচিত হওয়ার আক্ষেপ আর কান্না। এখন সবই ধামাচাপা পড়ে যাচ্ছে রাজনৈতিক প্রচারের ঢক্কানিনাদের সামনে। ধর্মীয় আবেগ-উচ্ছ্বাসকে ইভিএম পর্যন্ত টেনে নিয়ে যেতে যখন উন্মাদনায় পায়ে পা মিলিয়েছেন রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিরা, তখন একটুকরো রুটির জন্য চলছে সাধারণ মানুষের জীবনপণ লড়াই। তাঁদের কান্না চাপা পড়ে যাচ্ছে শোভাযাত্রার উদ্দাম কারা নাকাড়ার আওয়াজের নীচে।</span></p>

Source: abplive

Publication

The World Dispatch

Source: World News API

Keywords: west bengal assembly election 2026, congress news, .bjp news, cpm news, west bengal assembly election, isf news, tmc news, west bengal election 2026, jalpaiguri voter hawa, trinamool news, ONLY AVAILABLE IN PROFESSIONAL AND CORPORATE PLANS