‘ব্রিটেন ভেঙে পড়েছে’: যুক্তরাজ্যের হতাশাকে পুঁজি করে লাভবান হচ্ছেন একজন
১৭ এপ্রিল, ২০২৬
রিফর্ম ইউকে পার্টির নেতা নাইজেল ফারাজ ভোটারদের উদ্বেগকে সফলভাবে হাতিয়ার করেছেন। তিনি পপুলিজমে নতুন করে জোয়ার এনেছেন।
যুক্তরাজ্য জুড়ে এক গভীর হতাশার অনুভূতি শক্ত হচ্ছে। এর কারণ অর্থনৈতিক স্থবিরতা এবং সামাজিক চাপ। বিশ্লেষকরা এই পরিস্থিতিকে "ডুম লুপ" নাম দিয়েছেন।
এই চক্রের বৈশিষ্ট্য হলো ধীর প্রবৃদ্ধি, উচ্চ কর এবং ব্যবসায়ীদের আস্থার অভাব। এর ফলে এমন একটি পরিবেশ তৈরি হচ্ছে যেখানে দেশের সম্পদগুলোর মূল্য কমে যাচ্ছে। এই সুযোগে বিদেশী বিনিয়োগকারীরা ব্রিটিশ কোম্পানিগুলো কিনে নিচ্ছেন। তারা আগের মূল্যের চেয়ে অনেক কম দামে এগুলো কিনছে। এতে দেশের অর্থনীতির দীর্ঘমেয়াদী স্বাস্থ্য নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে।
বর্তমান অর্থনৈতিক চিত্র বেশ কয়েকটি চ্যালেঞ্জিং সূচকে ভরা। ২০২৬ সালের পূর্বাভাস বলছে, যুক্তরাজ্যের জিডিপি প্রবৃদ্ধি খুব ধীর হবে। কিছু অনুমান অনুযায়ী, এই হার ০.৭% বা ১.০% এর মতো কম হতে পারে। এই ধীরগতির পেছনে বিভিন্ন কারণ রয়েছে। এর মধ্যে ব্রেক্সিটের দীর্ঘস্থায়ী অর্থনৈতিক প্রভাব একটি। মনে করা হয়, ব্রেক্সিটের কারণে ব্যবসায়িক বিনিয়োগ প্রায় ১০% কমে গেছে। এছাড়া বিশ্বজুড়ে চলমান অনিশ্চয়তাও একটি কারণ। ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলো উচ্চ করের বোঝায় ভুগছে। ২০২৫ সালের শেষের দিকে, রেকর্ড ৬৪% সংস্থা এটিকে একটি বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে উল্লেখ করেছে। এর সাথে বাড়ছে শ্রমের খরচও। এই সব মিলিয়ে ব্যবসায়ীদের মধ্যে এক ঐতিহাসিক হতাশার পরিবেশ তৈরি হয়েছে। ২০২৬ সালে যুক্তরাজ্যের অর্থনীতির বিষয়ে প্রায় ৭৮% পারিবারিক ব্যবসা প্রতিষ্ঠানই নেতিবাচক মনোভাব প্রকাশ করেছে।
সাধারণ মানুষের জন্য, এই অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জগুলো তীব্র জীবনযাত্রার ব্যয় সংকট হিসেবে দেখা দিয়েছে। ২০২৬ সালের মার্চ মাসে, গ্রেট ব্রিটেনের ৮৭% প্রাপ্তবয়স্ক মানুষ জীবনযাত্রার ব্যয়কে দেশের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় বলে মনে করেছেন। এর পরেই ছিল এনএইচএস (৮১%) এবং অর্থনীতি (৭২%)। দেশের একটি বড় অংশের মানুষ এর সরাসরি প্রভাব অনুভব করছেন। দুই-তৃতীয়াংশ প্রাপ্তবয়স্ক জানিয়েছেন যে গত মাসে তাদের জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়েছে। এই আর্থিক চাপের সাথে আবাসন ও স্বাস্থ্যের মতো ক্ষেত্রে সামাজিক বৈষম্য পরিস্থিতিকে আরও জটিল করছে। এই বৈষম্যগুলো সমাজকে বিভক্ত করছে এবং মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর প্রভাব ফেলছে। জনগণের এই অসন্তোষ সরকারের প্রতি আস্থার রেকর্ড ঘাটতিতে প্রতিফলিত হচ্ছে। ৪৫% মানুষ এখন বলছে যে, তারা 'প্রায় কখনোই' বিশ্বাস করে না যে সরকারগুলো দলীয় স্বার্থের ঊর্ধ্বে গিয়ে দেশের প্রয়োজনকে অগ্রাধিকার দেয়।
অর্থনৈতিক দুর্বলতা এবং সামাজিক অসন্তোষের এই পরিবেশ যুক্তরাজ্যের কর্পোরেট খাতের ওপর বড় প্রভাব ফেলেছে। লন্ডন স্টক মার্কেট, যা একসময় বিশ্বের অন্যতম প্রধান আর্থিক কেন্দ্র ছিল, তার র্যাঙ্কিংয়ে পিছিয়ে পড়েছে। বেশ কয়েকটি বড় ব্রিটিশ কোম্পানি হয় বিদেশী সংস্থার দ্বারা অধিগ্রহণ করা হয়েছে অথবা বিদেশের স্টক এক্সচেঞ্জে তালিকাভুক্ত হওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এই প্রবণতাকে একটি "আর্থিক ডুম লুপ" হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে। এই চক্রে, যুক্তরাজ্যের কোম্পানিগুলিতে বিনিয়োগের অভাব তাদের অবমূল্যায়ন ঘটায়। ফলে কোম্পানিগুলো অধিগ্রহণের জন্য আকর্ষণীয় লক্ষ্যে পরিণত হয় এবং দেশীয় অর্থনীতি থেকে আরও পুঁজি বেরিয়ে যায়। এর পরিণতি সুদূরপ্রসারী। চাকরি তৈরি, মজুরি, পেনশন ফান্ড এবং কর রাজস্ব—সবকিছুর ওপরই এর প্রভাব পড়ছে।
এই বহুমুখী সংকট মোকাবেলায় জোরালো পদক্ষেপের জন্য দাবি বাড়ছে। কিছু বিশেষজ্ঞ মনে করেন যে এই চক্র ভাঙতে রাষ্ট্রকে হস্তক্ষেপ করতে হবে। তারা যুক্তরাজ্যের অসংখ্য ছোট পেনশন ফান্ডকে একত্রিত করে বড় সংস্থায় পরিণত করার মতো পদক্ষেপের পরামর্শ দিচ্ছেন। এই বড় সংস্থাগুলো তখন ব্রিটিশ কোম্পানিগুলিতে বিনিয়োগ করতে পারবে। এছাড়াও, দেশীয় বিনিয়োগের জন্য কর ছাড় দেওয়ার কথাও বলা হচ্ছে। প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমারের নেতৃত্বে লেবার সরকারের ওপর এই কাঠামোগত সমস্যাগুলো সমাধানের জন্য প্রচণ্ড চাপ রয়েছে। তবে, সরকারের আর্থিক সুযোগ সীমিত এবং রাজনৈতিক পরিস্থিতিও বিভক্ত। তাই অর্থনৈতিক শক্তি ও জনগণের আস্থা ফিরিয়ে আনার পথটি একটি বিশাল চ্যালেঞ্জ। আগামী মাসগুলোতে সরকারের এই কৌশল সাধারণ মানুষের জীবনে কতটা ইতিবাচক পরিবর্তন আনতে পারে, সেটাই হবে আসল পরীক্ষা।
Source: smh