হরমুজ প্রণালী পার হতে ইরানের নতুন শর্ত
১৭ এপ্রিল, ২০২৬
ইরান হরমুজ প্রণালী পুনরায় খুলে দেওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করেছে। তবে এই জলপথ পাড়ি দেওয়ার জন্য তারা বেশ কিছু শর্তের একটি তালিকা তৈরি করেছে।
ইরান গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালী দিয়ে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচলের জন্য কঠোর শর্তাবলী নির্ধারণ করেছে। এই পদক্ষেপ বিশ্ব বাণিজ্য ও নিরাপত্তায় নতুন করে অনিশ্চয়তা তৈরি করেছে। ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস (IRGC)-এর পক্ষ থেকে এই নতুন নিয়ম ঘোষণা করা হয়েছে। তারা জানিয়েছে, এই গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক পথের নিয়ন্ত্রণ ইরানের হাতেই থাকবে। বিশ্বের তেলের একটি বড় অংশ এই পথেই পরিবহন করা হয়। এই ঘটনাটি একটি জটিল প্রেক্ষাপটে ঘটছে। একদিকে ভঙ্গুর আঞ্চলিক যুদ্ধবিরতি চলছে, অন্যদিকে ইরানের বন্দরগুলোকে লক্ষ্য করে মার্কিন নৌ অবরোধ অব্যাহত রয়েছে। এর ফলে বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ এই জলপথে এক বিপজ্জনক পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে।
তেহরানের দেওয়া শর্ত অনুযায়ী, এই প্রণালী দিয়ে চলাচলকারী সব জাহাজকে বাণিজ্যিক হতে হবে। সামরিক জাহাজ চলাচল সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করা হয়েছে। এছাড়াও, জাহাজ এবং এর পণ্য ইরানের ভাষায় 'শত্রু দেশ'-এর সঙ্গে যুক্ত থাকতে পারবে না। এখন থেকে সব জাহাজকে ইরানের 지정 করা একটি নির্দিষ্ট ট্রানজিট রুট ব্যবহার করতে হবে। এর ফলে জাহাজগুলোকে ইরানের জলসীমার মধ্যে দিয়ে যেতে হবে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, জাহাজগুলোকে চলাচলের জন্য সরাসরি ইরানের বাহিনী, বিশেষ করে IRGC নৌবাহিনীর সঙ্গে সমন্বয় করতে হবে। এর মাধ্যমে কার্যকরভাবে সমস্ত জাহাজের গতিবিধি তাদের তত্ত্বাবধানে চলে আসবে। লেবাননে যুদ্ধবিরতির সঙ্গে ইরানের এই প্রণালী সাময়িকভাবে পুনরায় খোলার সম্পর্ক রয়েছে বলে মনে করা হচ্ছে।
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ইরানের বন্দরগুলোতে আসা-যাওয়া করা জাহাজগুলোর ওপর নৌ অবরোধ বজায় রেখেছে। এর মধ্যেই ইরান এই নতুন পদক্ষেপগুলো বাস্তবায়ন করছে। ফেব্রুয়ারির শেষে মার্কিন-ইসরায়েলি সামরিক অভিযানের পর শুরু হওয়া ব্যাপক সংঘাত থামানোর আলোচনা ব্যর্থ হয়। এরপর ১৩ এপ্রিল থেকে মার্কিন অবরোধ শুরু হয়েছিল। সেই অভিযানের প্রতিক্রিয়ায় ইরান যান চলাচল মারাত্মকভাবে সীমাবদ্ধ করে দিয়েছিল। আন্তর্জাতিক শক্তি সংস্থা এটিকে 'বিশ্বের তেল বাজারের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় সরবরাহ সংকট' বলে অভিহিত করেছিল। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেছেন, একটি চূড়ান্ত চুক্তিতে না পৌঁছানো পর্যন্ত ইরানের ওপর মার্কিন অবরোধ 'পুরোপুরি কার্যকর' থাকবে।
এই পরিস্থিতির প্রভাব বিশ্ব অর্থনীতি ও আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার জন্য সুদূরপ্রসারী। হরমুজ প্রণালী জ্বালানি বাজারের জন্য একটি অপরিহার্য পথ। সাম্প্রতিক সংকটের কারণে ইতোমধ্যে দামের অস্থিরতা এবং সাপ্লাই চেইন সমস্যা দেখা দিয়েছে। ইরানের নতুন শর্ত এবং মার্কিন অবরোধ—এই দুই মিলে আন্তর্জাতিক জাহাজ শিল্পের জন্য ঝুঁকি ও জটিলতা বাড়িয়ে তুলেছে। একই সঙ্গে আইনি প্রশ্নও উঠছে। আন্তর্জাতিক নৌ সংস্থা পর্যালোচনা করছে যে ইরানের নতুন নিয়মাবলী নৌচলাচলের স্বাধীনতা সংক্রান্ত আন্তর্জাতিক আইন মেনে চলছে কিনা। কয়েক সপ্তাহ ধরে জাহাজ চলাচল নাটকীয়ভাবে কমে গেছে এবং ইরানের ঘোষণা সত্ত্বেও অনেক জাহাজ কোম্পানি অনিশ্চয়তার মধ্যে এই প্রণালী ব্যবহারে দ্বিধা বোধ করছে।
সামনের পথ এখনও উত্তেজনায় পূর্ণ। বর্তমান পরিস্থিতি একটি ভঙ্গুর যুদ্ধবিরতির উপর নির্ভরশীল, যা আগামী সপ্তাহে শেষ হতে পারে। এরপর ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে পুনরায় আলোচনা শুরু হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। যদিও ইরান প্রণালী পুনরায় খুলে দেওয়াকে উত্তেজনা কমানোর পদক্ষেপ হিসেবে উপস্থাপন করেছে, কিন্তু তাদের নিয়ন্ত্রণের এই জিদকে দর কষাকষির কৌশল হিসেবেই দেখা হচ্ছে। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় উদ্বিগ্নভাবে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছে। কারণ, সামান্য ভুল গণনা বা কূটনৈতিক ব্যর্থতা নতুন করে সংঘাতের জন্ম দিতে পারে। এতে বিশ্বজুড়ে জ্বালানি নিরাপত্তা এবং আন্তর্জাতিক শান্তি আরও বিপন্ন হবে।
Source: express