মহিলা সংরক্ষণ বিল আটকে গেল লোকসভায়, মোদী সরকারের বড় ধাক্কা

১৭ এপ্রিল, ২০২৬

মহিলা সংরক্ষণ বিল আটকে গেল লোকসভায়, মোদী সরকারের বড় ধাক্কা

মহিলা সংরক্ষণ দ্রুত কার্যকর করার একটি বিল লোকসভায় পরাজিত হয়েছে। এটি নরেন্দ্র মোদী সরকারের জন্য একটি বড় রাজনৈতিক ধাক্কা। ঐক্যবদ্ধ বিরোধীরা এই বিলের বিরুদ্ধে ভোট দিয়েছে।

এক বড়সড় রাজনৈতিক পট পরিবর্তনে, লোকসভা ও রাজ্য বিধানসভায় মহিলাদের জন্য আসন সংরক্ষণ দ্রুত কার্যকর করতে আনা কেন্দ্রীয় সরকারের একটি বিল গুরুত্বপূর্ণ ভোটে পরাজিত হয়েছে। এই সাংবিধানিক সংশোধনী পাশ করতে না পারাটা প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর সরকারের জন্য একটি বিরাট রাজনৈতিক ধাক্কা। কারণ এই সরকার খুব কমই সংসদে এভাবে পরাজিত হয়েছে।

বিরোধীরা একজোট হয়ে এই বিল রুখে দিয়েছে। তাদের অভিযোগ, সরকার লিঙ্গ ন্যায়ের অজুহাতে দেশের নির্বাচনী মানচিত্র বদলানোর মতো একটি বিতর্কিত পদক্ষেপ নিতে চাইছে। ভোটে এই পরাজয়ের ফলে বহুপ্রতীক্ষিত সংরক্ষণ নীতির ভবিষ্যৎ অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়েছে। এই ঘটনা নতুন করে এক রাজনৈতিক ঝড় তুলেছে।

সংসদে এই পরাজয়ের কারণ বুঝতে হলে মহিলা সংরক্ষণ বিলের ইতিহাস জানতে হবে। বিভিন্ন সরকারের কয়েক দশকের ব্যর্থ চেষ্টার পর, মোদী সরকার ২০২৩ সালে 'নারী শক্তি বন্দন অধিনিয়ম' পাশ করেছিল। এটি ছিল মহিলাদের জন্য এক-তৃতীয়াংশ আসন সংরক্ষণের একটি যুগান্তকারী আইন। কিন্তু এই আইন কার্যকর করার জন্য দুটি শর্ত রাখা হয়—পরবর্তী জনগণনা শেষ করা এবং আসন পুনর্বিন্যাসের জন্য 'ডিলিমিটেশন' প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা। এই অনির্দিষ্ট সময়সীমার জন্য বিরোধী দলগুলো সরকারের তীব্র সমালোচনা করে। তাদের মতে, এর মাধ্যমে বিলের সুবিধাগুলো অনির্দিষ্টকালের জন্য পিছিয়ে দেওয়া হচ্ছিল। সরকারের সর্বশেষ প্রচেষ্টা ছিল একটি নতুন সাংবিধানিক সংশোধনী বিল এনে এই প্রক্রিয়াটি দ্রুত সম্পন্ন করা, যার মাধ্যমে ২০১১ সালের জনগণনার ভিত্তিতেই ডিলিমিটেশনের অনুমতি দেওয়া হতো।

রাহুল গান্ধীর নেতৃত্বে বিরোধীরা একজোট হয়ে সরকারের এই প্রস্তাবের তীব্র বিরোধিতা করে। বিরোধীদের যুক্তি ছিল, মহিলা সংরক্ষণের মতো বিষয়কে বিতর্কিত ডিলিমিটেশন প্রক্রিয়ার সঙ্গে যুক্ত করে ভারতের যুক্তরাষ্ট্রীয় ক্ষমতার কাঠামোকে বদলে দেওয়ার চেষ্টা হচ্ছে। অনেক বিরোধী-শাসিত রাজ্য, বিশেষ করে দক্ষিণ ভারতের রাজ্যগুলোর আশঙ্কা, জনসংখ্যার ভিত্তিতে ডিলিমিটেশন হলে সংসদে তাদের রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্ব কমে যাবে এবং উত্তর ভারতের জনবহুল রাজ্যগুলোর প্রভাব বাড়বে। বিরোধীরা এক বিরল সমন্বয়ের নজির দেখিয়ে বিলটির বিরুদ্ধে ভোট দেয়। ফলে, সাংবিধানিক সংশোধনী পাশের জন্য প্রয়োজনীয় দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাওয়া যায়নি। বিলের পক্ষে ২৯৮টি এবং বিপক্ষে ২৩০টি ভোট পড়ে, যা প্রয়োজনীয় সংখ্যার চেয়ে অনেক কম ছিল। এটি সরকারের ফ্লোর ম্যানেজারদের জন্য একটি বড় ধাক্কা।

এই পরাজয় মোদী সরকারের জন্য একটি বিরাট আঘাত। কারণ গত এক দশকেরও বেশি সময় ধরে সংসদে তাদের প্রায় একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রণ ছিল। এই ফলাফল থেকে বোঝা যায়, ডিলিমিটেশন প্রস্তাব নিয়ে বিরোধীদের তীব্রতা আঁচ করতে শাসক দল হয়তো ভুল করেছিল। সরকারি দলের নেতারা দেশের স্বার্থে এবং নারী ক্ষমতায়নের জন্য সাংসদদের বিলটি সমর্থন করার আহ্বান জানিয়েছিলেন। কিন্তু বিরোধীরা ডিলিমিটেশন প্রক্রিয়ার বিপদগুলো সামনে এনে পুরো বিতর্ককে সফলভাবে অন্যদিকে ঘুরিয়ে দেয়। ভোটের পর, সরকার ডিলিমিটেশন এবং কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলগুলির মর্যাদা সংক্রান্ত আরও দুটি বিল প্রত্যাহার করে নেয়।

এর তাৎক্ষণিক ফল হলো, মহিলা সংরক্ষণ আইন নিয়ে এক দীর্ঘমেয়াদী অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। যদিও ২০২৩ সালের আইনটি এখনও বহাল আছে, কিন্তু এটি কার্যকর করার প্রক্রিয়া এখন সাংবিধানিক শূন্যতায় আটকে গেছে। কারণ এর জন্য প্রয়োজনীয় জনগণনা এবং ডিলিমিটেশনের কোনো স্পষ্ট রাস্তা আর খোলা নেই। এর রাজনৈতিক প্রভাব সুদূরপ্রসারী হবে বলে মনে করা হচ্ছে। শাসক দল এই বিষয়টি জনগণের কাছে নিয়ে যাওয়ার কথা বলছে। তারা বিরোধীদেরকে মহিলাদের জন্য একটি যুগান্তকারী সংস্কারে বাধাদানকারী হিসেবে তুলে ধরবে। অন্যদিকে, এই জয়ে উৎসাহিত ও ঐক্যবদ্ধ বিরোধীরা একে কাজে লাগিয়ে আরও শক্তি সঞ্চয় করার চেষ্টা করবে। তারা দাবি করবে যে, তারা সরকারের বাড়াবাড়ি থেকে দেশের সাংবিধানিক কাঠামোকে রক্ষা করেছে। ভারতীয় মহিলাদের রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্ব বাড়ানোর যে দীর্ঘদিনের স্বপ্ন, তা এখন দেশের জটিল রাজনৈতিক বিভেদগুলোর মধ্যে আরও গভীরভাবে জড়িয়ে পড়েছে।

Source: kannada_news18

Publication

The World Dispatch

Source: World News API