ইসরায়েলের সাথে যুদ্ধবিরতি: লেবাননে স্বস্তি, কিন্তু শান্তির পথে অনেক বাধা

১৭ এপ্রিল, ২০২৬

ইসরায়েলের সাথে যুদ্ধবিরতি: লেবাননে স্বস্তি, কিন্তু শান্তির পথে অনেক বাধা

সপ্তাহব্যাপী যুদ্ধের পর লেবাননে স্বস্তি ফিরে এসেছে। তবে এই শান্তি টিকিয়ে রাখা কঠিন হবে।

ইসরায়েল ও লেবাননের মধ্যে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় একটি ভঙ্গুর যুদ্ধবিরতি কার্যকর হয়েছে। এর ফলে কয়েক সপ্তাহের তীব্র লড়াই থেকে বহু প্রতীক্ষিত স্বস্তি মিলেছে। এই লড়াইয়ে দক্ষিণ লেবানন বিধ্বস্ত হয়েছে এবং উত্তর ইসরায়েল সর্বোচ্চ সতর্কতায় ছিল। ১৬ এপ্রিল, ২০২৬ থেকে ১০ দিনের এই যুদ্ধবিরতি শুরু হয়েছে। এর উদ্দেশ্য হলো একটি স্থায়ী শান্তি চুক্তির জন্য সরাসরি আলোচনার পরিবেশ তৈরি করা। আন্তর্জাতিক মহল এবং সীমান্তের দুই পারের সাধারণ মানুষ এই বিরতিকে স্বাগত জানিয়েছে। তবে শান্তির পথে এখনও অনেক বড় বাধা রয়ে গেছে। ফলে এই দীর্ঘস্থায়ী সংঘাতের একটি স্থায়ী সমাধান নিয়ে সন্দেহ দেখা দিয়েছে। এই সংঘাত মূলত মার্চ ২০২৬-এর শুরু থেকে বড় আকার ধারণ করে। এর ফলে লেবাননে ২,০০০-এরও বেশি মানুষ মারা গেছে এবং দশ লাখের বেশি মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছে।

এই অস্থায়ী চুক্তির শর্ত অনুযায়ী, সব পক্ষ আক্রমণাত্মক সামরিক অভিযান বন্ধ রাখবে। চুক্তি অনুসারে, লেবানন সরকার ইরান-সমর্থিত জঙ্গি গোষ্ঠী হিজবুল্লাহকে ইসরায়েলের উপর হামলা চালানো থেকে বিরত রাখতে পদক্ষেপ নেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। এর বিনিময়ে, ইসরায়েলও স্থল, আকাশ ও সমুদ্রপথে তাদের আক্রমণাত্মক সামরিক অভিযান বন্ধ রাখবে। তবে তারা স্পষ্ট করে বলেছে যে, যেকোনো আসন্ন হুমকির বিরুদ্ধে আত্মরক্ষার অধিকার তাদের থাকবে। ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু বলেছেন, এই সময়ে ইসরায়েলি বাহিনী দক্ষিণ লেবাননের ভেতরে তৈরি করা 'সিকিউরিটি বাফার জোন' থেকে সরবে না। উভয় পক্ষ সম্মত হলে এবং আলোচনায় অগ্রগতি দেখা গেলে যুদ্ধবিরতির এই প্রাথমিক ১০ দিনের মেয়াদ বাড়ানো যেতে পারে।

এই যুদ্ধবিরতির প্রেক্ষাপট হলো ইরানের সাথে জড়িত বৃহত্তর আঞ্চলিক উত্তেজনার অংশ হিসেবে সংঘাতের বৃদ্ধি। নভেম্বর ২০২৪ সালের একটি যুদ্ধবিরতি ব্যর্থ হওয়ার পর লড়াই মারাত্মকভাবে বেড়ে যায়। ইসরায়েল অভিযোগ করেছিল যে হিজবুল্লাহ তাদের সামরিক পরিকাঠামো পুনর্নির্মাণ করে চুক্তির শর্ত লঙ্ঘন করেছে। এরপর ইসরায়েলি সামরিক অভিযানে স্থল সেনা এবং ব্যাপক বিমান হামলা চালানো হয়। এর উদ্দেশ্য ছিল হিজবুল্লাহর ক্ষমতা ধ্বংস করা। কয়েক সপ্তাহের এই যুদ্ধে লেবাননে মারাত্মক মানবিক সংকট তৈরি হয়। এর ফলেই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বে কূটনৈতিক প্রচেষ্টা জোরদার হয়, যার ফল এই বর্তমান চুক্তি।

ইসরায়েল ও লেবানন রাষ্ট্রের মধ্যে আনুষ্ঠানিক চুক্তি হলেও হিজবুল্লাহর ভূমিকা একটি প্রধান এবং জটিল বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। এই শক্তিশালী জঙ্গি গোষ্ঠীটি সরাসরি যুদ্ধবিরতি চুক্তিতে স্বাক্ষর করেনি। যদিও তারা বেশিরভাগ গোলাবর্ষণ বন্ধ রেখেছে, হিজবুল্লাহ এক বিবৃতিতে লেবাননের মাটিতে ইসরায়েলি সৈন্যদের উপস্থিতির বিরুদ্ধে 'প্রতিরোধ' করার অধিকারের কথা বলেছে। এই অবস্থান সহজেই চুক্তিকে দুর্বল করে দিতে পারে। ভবিষ্যতে যেকোনো দীর্ঘমেয়াদী শান্তি আলোচনার মূল বিষয় হবে হিজবুল্লাহকে নিরস্ত্রীকরণ। এটি ইসরায়েলের একটি দাবি এবং লেবানন সরকারও নীতিগতভাবে এটিকে সমর্থন করে, কিন্তু বাস্তবে এটি কার্যকর করা এক অবিশ্বাস্যরকম জটিল ও কঠিন কাজ।

সামনের দিনে, একটি স্থায়ী শান্তির পথ এমন সব চ্যালেঞ্জে পূর্ণ যা কয়েক দশক ধরে সমাধান করা যায়নি। ইসরায়েলি ও লেবাননের কর্মকর্তাদের মধ্যে সরাসরি আলোচনা হওয়ার কথা রয়েছে, যা নিজেই একটি ঐতিহাসিক ঘটনা। এর লক্ষ্য হলো এই অস্থায়ী বিরতিকে একটি টেকসই নিরাপত্তা ব্যবস্থায় পরিণত করা। তবে, শেবা ফার্মসের মতো ভূখণ্ড নিয়ে বিরোধ এবং হিজবুল্লাহর বিশাল সামরিক শক্তির মতো মৌলিক বিষয়ে মতানৈক্য রয়ে গেছে। হিজবুল্লাহ সেখানে একটি রাষ্ট্রের মধ্যে আরেকটি রাষ্ট্র হিসেবে কাজ করে। যুদ্ধবিরতিটি উত্তেজনা কমানোর একটি গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ এনেছে এবং আশার আলো দেখাচ্ছে। কিন্তু দুই পক্ষের গভীর শত্রুতা এবং সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর অমীমাংসিত অবস্থার কারণে এই অস্থায়ী চুক্তি থেকে স্থায়ী শান্তিতে পৌঁছানো খুবই কঠিন হবে।

Source: bbc

Publication

The World Dispatch

Source: World News API