যুদ্ধবিরতির মধ্যে বাণিজ্যিক জাহাজের জন্য হরমুজ প্রণালী খুলে দিল ইরান
১৭ এপ্রিল, ২০২৬
ইরান জানিয়েছে, যুদ্ধবিরতি চলাকালীন হরমুজ প্রণালী বাণিজ্যিক জাহাজের জন্য পুরোপুরি খোলা থাকবে। পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাকচি এই ঘোষণা দিয়েছেন। এই সিদ্ধান্ত লেবাননের যুদ্ধবিরতির সঙ্গে মিলিয়ে নেওয়া হয়েছে।
ইরান শুক্রবার ঘোষণা করেছে, তারা গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালী সব বাণিজ্যিক জাহাজের জন্য খুলে দিয়েছে। এই পদক্ষেপটি কয়েক সপ্তাহ ধরে চলা সংঘাত কমার একটি বড় ইঙ্গিত। এই সংঘাতে বিশ্ব অর্থনীতিতে বড় ধরনের ধাক্কা লেগেছিল। ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাকচি জানিয়েছেন, যুদ্ধবিরতি চলাকালীন এই কৌশলগত জলপথটি 'সম্পূর্ণরূপে খোলা' থাকবে। এই সিদ্ধান্তটি লেবাননে ইজরায়েল ও হিজবুল্লাহর মধ্যে চলমান ১০ দিনের যুদ্ধবিরতির সঙ্গে সরাসরি যুক্ত। এই যুদ্ধবিরতি বৃহস্পতিবার থেকে শুরু হয়েছে। প্রণালীটি খুলে দেওয়ায় তেলের দাম কমে গেছে, কারণ বিশ্বজুড়ে জ্বালানি সরবরাহের একটি প্রধান পথ আবার চালু হওয়ার সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে।
এই ঘোষণা এক ভঙ্গুর কূটনৈতিক পরিস্থিতিতে আশার আলো দেখাচ্ছে। এই প্রণালী খোলার সিদ্ধান্তটি এমন এক সময়ে এলো, যখন যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে উত্তেজনা চলছিল। পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় ৮ এপ্রিল থেকে দুই দেশের মধ্যে দুই সপ্তাহের একটি যুদ্ধবিরতি শুরু হয়েছিল। এই চুক্তির উদ্দেশ্য ছিল ফেব্রুয়ারির শেষে শুরু হওয়া সংঘাত থামানো। সেই সংঘাতে দুই দেশ একে অপরের ওপর সরাসরি হামলা চালিয়েছিল। কিন্তু এই প্রণালী দিয়ে বিশ্বের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ তেল পরিবহন হয়। ইরানের কারণে এই পথে চলাচল মারাত্মকভাবে সীমিত ছিল। আরাকচি নির্দিষ্ট করে বলেছেন, চলাচলকারী জাহাজগুলোকে এখন ইরানের বন্দর ও সমুদ্র বিষয়ক সংস্থার নির্ধারিত 'সমন্বিত পথ' অনুসরণ করতে হবে। এর মাধ্যমে বোঝা যায়, তেহরান জাহাজ চলাচল নিয়ন্ত্রণ করতে চায়।
যুক্তরাষ্ট্র তেহরানের এই ঘোষণায় মিশ্র প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এই খবরকে প্রকাশ্যে স্বাগত জানিয়েছেন। তিনি সোশ্যাল মিডিয়ায় পোস্ট করে বলেছেন যে প্রণালীটি 'সম্পূর্ণ খোলা এবং পুরোপুরি চলাচলের জন্য প্রস্তুত'। তবে তিনি দ্রুতই স্পষ্ট করে দেন যে ইরানের বন্দর ও জাহাজের ওপর মার্কিন নৌ অবরোধ 'পুরোপুরি বহাল থাকবে'। ইরানের সঙ্গে একটি চূড়ান্ত চুক্তি না হওয়া পর্যন্ত এই অবরোধ চলবে। এই অবস্থানে உடனடியாக উত্তেজনা তৈরি হয়েছে। ইরানের পার্লামেন্টের স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের কালিবাফ হুঁশিয়ারি দিয়েছেন যে মার্কিন অবরোধ অব্যাহত থাকলে প্রণালী খোলা থাকবে না। তিনি এটিকে যুদ্ধবিরতি চুক্তির লঙ্ঘন বলেও অভিহিত করেছেন।
আন্তর্জাতিক মহল এই বিষয়ে সতর্কতার সঙ্গে আশাবাদ ব্যক্ত করেছে। যুক্তরাজ্য ও ফ্রান্সের নেতারা এই সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানিয়েছেন। তবে তারা জলপথটি স্থায়ীভাবে এবং নিঃশর্তভাবে পুনরায় খোলার ওপর জোর দিয়েছেন। জাহাজ চলাচল শিল্প সংস্থা এবং জাতিসংঘের আন্তর্জাতিক সমুদ্র বিষয়ক সংস্থা বর্তমানে নতুন ব্যবস্থার বাস্তবতা ও নিরাপত্তা পর্যালোচনা করছে। তারা নিশ্চিত করতে চায় যে এটি আন্তর্জাতিক নৌচলাচলের স্বাধীনতার নীতির সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ। গত সপ্তাহে আলোচনা ব্যর্থ হওয়ার পর এই পদক্ষেপটি নেওয়া হলো। সম্ভবত এই সপ্তাহান্তে পাকিস্তানে যুক্তরাষ্ট্র-ইরান আলোচনার একটি নতুন পর্ব শুরু হতে পারে।
এই ঘটনাগুলোর প্রেক্ষাপটে রয়েছে গত ছয় সপ্তাহের এক অস্থিতিশীল পরিস্থিতি। এই সময়ে সামরিক উত্তেজনা বেড়েছে, বিশ্ব বাণিজ্যে ব্যাঘাত ঘটেছে এবং জ্বালানির দাম резко বেড়েছে। বর্তমান যুদ্ধবিরতির মেয়াদ আগামী সপ্তাহের শুরুতে শেষ হতে চলেছে। ফলে কূটনৈতিক প্রচেষ্টা আরও জরুরি হয়ে পড়েছে। হরমুজ প্রণালী খুলে দেওয়া আঞ্চলিক উত্তেজনা কমানোর জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ। কিন্তু নৌ অবরোধ নিয়ে ওয়াশিংটন ও তেহরানের পরস্পরবিরোধী অবস্থান এবং ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচির মতো অমীমাংসিত মূল বিষয়গুলো রয়ে গেছে। এর ফলে একটি স্থায়ী সমাধানের পথ এখনও অনিশ্চিত এবং চ্যালেঞ্জে পূর্ণ।
Source: abplive