হরমুজ প্রণালী খুলল ইরান, তেলের দাম কমল ৯০ ডলারের নিচে
১৭ এপ্রিল, ২০২৬
লেবাননে যুদ্ধবিরতি চলাকালীন হরমুজ প্রণালী খোলা থাকবে। তেহরান জানিয়েছে, বাণিজ্যিক জাহাজের জন্য এই গুরুত্বপূর্ণ জলপথটি খুলে দেওয়া হচ্ছে।
ইরান কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালী বাণিজ্যিক জাহাজের জন্য খুলে দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছে। শুক্রবার এই ঘোষণার পরই বিশ্ববাজারে তেলের দামে বড় ধরনের পতন হয়েছে। দাম ব্যারেল প্রতি ৯০ ডলারের নিচে নেমে গেছে। এই পদক্ষেপ একটি চলমান সংঘাত কমার ইঙ্গিত দিচ্ছে, যা আন্তর্জাতিক বাজারকে অস্থির করে তুলেছিল। এর ফলে বিশ্ব অর্থনীতি মন্দার দিকে চলে যাওয়ার আশঙ্কাও তৈরি হয়েছিল। আন্তর্জাতিক বাজারে ব্রেন্ট ক্রুড তেলের দাম প্রায় ১০% কমে ব্যারেল প্রতি ৮৯.১১ ডলারে দাঁড়িয়েছে। সাম্প্রতিক মাসগুলোতে এই তেলের দাম ১২০ ডলারও ছাড়িয়ে গিয়েছিল। জ্বালানির দাম কমার খবরে শেয়ারবাজারে তেজিভাব দেখা গেছে। মুদ্রাস্ফীতির চাপ কমায় বিনিয়োগকারীরা স্বস্তি পেয়েছেন।
এই গুরুত্বপূর্ণ জলপথটি খুলে দেওয়ার বিষয়টি ইসরায়েল ও লেবাননের মধ্যে একটি ভঙ্গুর ১০ দিনের যুদ্ধবিরতির সঙ্গে যুক্ত। এই যুদ্ধবিরতিটি বৃহস্পতিবার থেকে কার্যকর হয়। এক বিবৃতিতে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি নিশ্চিত করেছেন, যুদ্ধবিরতি চলাকালীন এই প্রণালী বাণিজ্যিক জাহাজের জন্য ‘সম্পূর্ণরূপে খোলা’ থাকবে। এই ঘটনাটি এমন এক সময়ে ঘটল, যখন তীব্র সংকট চলছিল। এই সংকট শুরু হয়েছিল ২০২৬ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি। সেসময় যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের বিমান হামলার জবাবে ইরান প্রণালীটি বন্ধ করে দিয়েছিল। বিশ্বের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ তেল এই পথ দিয়ে সরবরাহ করা হয়। তাই এটি বন্ধ হয়ে যাওয়ায় ১৯৭০-এর দশকের পর বিশ্ব জ্বালানি বাজারে সবচেয়ে বড় সংকট তৈরি হয়েছিল।
এই ঘোষণায় আন্তর্জাতিক মহলের প্রতিক্রিয়া মিশ্র। একদিকে যেমন তারা আশাবাদী, তেমনই সতর্ক। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সোশ্যাল মিডিয়ায় এই পদক্ষেপকে স্বাগত জানিয়েছেন। তবে তিনি বলেছেন, তেহরানের সঙ্গে একটি চূড়ান্ত চুক্তি না হওয়া পর্যন্ত ইরানের বন্দরগুলোতে মার্কিন নৌ অবরোধ বলবৎ থাকবে। ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী কেয়ার স্টারমার এবং ফরাসি প্রেসিডেন্ট এমানুয়েল ম্যাক্রোঁর মতো ইউরোপীয় নেতারা এই খবরকে স্বাগত জানিয়েছেন। তবে তারা এই জলপথ স্থায়ী ও নিঃশর্তভাবে খুলে দেওয়ার ওপর জোর দিয়েছেন। এদিকে, জাহাজ চলাচল সংস্থাগুলো সতর্কভাবে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছে। কারণ, প্রাথমিক রিপোর্ট অনুযায়ী, জাহাজগুলোকে ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস-এর অনুমোদিত একটি নির্দিষ্ট পথ অনুসরণ করতে হবে।
এই ঘটনার পেছনে রয়েছে আঞ্চলিক উত্তেজনার তীব্র বৃদ্ধি। ২০২৫ সালে ব্যর্থ পারমাণবিক আলোচনা এবং একটি সংক্ষিপ্ত বিমান সংঘাতের পর এই উত্তেজনা বাড়ে। এরপর ইরানের প্রণালী বন্ধ করে দেওয়াকে আন্তর্জাতিক সমুদ্র আইনের লঙ্ঘন হিসেবে দেখা হয়। এর ফলে বাণিজ্যিক জাহাজের ওপর হামলার ঘটনা ঘটে এবং যুক্তরাষ্ট্র এই পথ নিরাপদ করতে সামরিক পদক্ষেপ নেয়। এই অচলাবস্থার কারণে বিশ্বজুড়ে প্রচণ্ড অর্থনৈতিক চাপ তৈরি হয়। ভোক্তা ও ব্যবসায়ীদের জন্য জ্বালানির দাম বেড়ে যায়। বিশেষ করে বিমান ও জাহাজ সংস্থাগুলোর ওপর চাপ বাড়ে। প্রণালী খুলে দেওয়ার খবরে এই সংস্থাগুলোর শেয়ারের দাম অনেক বেড়েছে।
এখনও পরিস্থিতি বেশ অনিশ্চিত। আপাতত প্রণালীটি সাময়িকভাবে খোলা হয়েছে, যা লেবাননের যুদ্ধবিরতি টিকে থাকার ওপর নির্ভরশীল। এই অঞ্চলের সামুদ্রিক নিরাপত্তার ভবিষ্যৎ নির্ভর করছে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে আলোচনার ওপর। জানা গেছে, এই আলোচনা আগামী কয়েকদিনের মধ্যে অনুষ্ঠিত হতে পারে। তবে ইরানের পার্লামেন্টের স্পিকার হুঁশিয়ারি দিয়েছেন যে মার্কিন অবরোধ অব্যাহত থাকলে প্রণালীটি আবার বন্ধ করে দেওয়া হতে পারে। তাই এই কূটনৈতিক সুযোগ একটি স্থায়ী সমাধানে রূপ নেয় কি না, সেদিকেই তাকিয়ে আছে গোটা বিশ্ব।
Source: thetimes