লেবাননে যুদ্ধবিরতির মধ্যে হরমুজ প্রণালী খুলে দিল ইরান

১৭ এপ্রিল, ২০২৬

লেবাননে যুদ্ধবিরতির মধ্যে হরমুজ প্রণালী খুলে দিল ইরান

ইরান হরমুজ প্রণালী খুলে দিয়েছে। লেবাননে যুদ্ধবিরতি চলার সময় এটি খোলা থাকবে বলে জানিয়েছে দেশটি। এই ঘোষণায় বিশ্বজুড়ে তেলের দাম কমলেও উত্তেজনা এখনও কমেনি।

বিশ্বজুড়ে জ্বালানি বাজারে আলোড়ন সৃষ্টি করে ইরান একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘোষণা দিয়েছে। তারা জানিয়েছে, হরমুজ প্রণালী বাণিজ্যিক জাহাজের জন্য ‘সম্পূর্ণ খোলা’। শুক্রবার তেহরান স্পষ্টভাবে জানায়, এই সিদ্ধান্ত লেবাননের ভঙ্গুর যুদ্ধবিরতির সঙ্গে জড়িত। এই ১০ দিনের যুদ্ধবিরতি যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় কার্যকর হয়েছে। এর ফলে লেবাননে ইজরায়েল এবং ইরান-সমর্থিত গোষ্ঠী হিজবুল্লাহর মধ্যে কয়েক সপ্তাহের তীব্র লড়াই আপাতত থেমেছে। এই পদক্ষেপটি প্রায় দুই মাস ধরে চলা মধ্যপ্রাচ্যের ব্যাপক আঞ্চলিক সংঘাত কমানোর একটি সম্ভাবনা তৈরি করেছে।

এই ঘোষণার প্রেক্ষাপট বেশ উত্তপ্ত। ২০২৬ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র-ইজরায়েল জোটের সঙ্গে ইরানের সরাসরি সংঘাত শুরু হয়েছিল। এর প্রতিক্রিয়ায় ইরান হরমুজ প্রণালী কার্যত বন্ধ করে দেয়। এটি বিশ্বের তেল ও প্রাকৃতিক গ্যাস পরিবহনের একটি গুরুত্বপূর্ণ পথ। এর ফলে বিশ্বজুড়ে মারাত্মক জ্বালানি সংকটের আশঙ্কা তৈরি হয়েছিল। লেবাননে সাম্প্রতিক যুদ্ধবিরতিটি ১৬ এপ্রিল শুরু হয়েছে। কয়েক সপ্তাহ ধরে চলা বিধ্বংসী আন্তঃসীমান্ত হামলার পর যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় এটি সম্ভব হয়। এই হামলায় হাজার হাজার মানুষ হতাহত এবং বহু মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছিল। ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি বলেছেন, যুদ্ধবিরতি চলাকালীন প্রণালীটি খোলা থাকবে।

এর তাৎক্ষণিক অর্থনৈতিক প্রভাবও দেখা গেছে। স্বাভাবিক জাহাজ চলাচল পুনরায় শুরু হওয়ার সম্ভাবনায় তেলের দাম প্রায় ৯ শতাংশ কমে যায়। তবে পরিস্থিতি এখনও জটিল এবং অনিশ্চয়তায় পূর্ণ। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানের এই সিদ্ধান্তকে প্রকাশ্যে স্বাগত জানিয়েছেন। তবে তিনি স্পষ্ট করে দিয়েছেন যে, ইরানের বন্দরগুলোকে লক্ষ্য করে চলতি সপ্তাহের শুরুতে আরোপ করা মার্কিন নৌ-অবরোধ পুরোপুরি বলবৎ থাকবে। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ইঙ্গিত দিয়েছেন, ইরানের সঙ্গে একটি চূড়ান্ত চুক্তি না হওয়া পর্যন্ত এই অবরোধ চলবে। তিনি আরও বলেন, এই চুক্তি খুব শীঘ্রই হতে পারে। অন্যদিকে, তেহরান হুঁশিয়ারি দিয়েছে যে, যুক্তরাষ্ট্রের এই অবরোধ অব্যাহত রাখা তাদের মধ্যকার সমঝোতার লঙ্ঘন। এর ফলে প্রণালীটি আবারও বন্ধ করে দেওয়া হতে পারে।

আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়া ছিল স্বস্তি এবং সতর্কতার মিশ্রণ। জাতিসংঘের মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস প্রণালীটি পুনরায় খুলে দেওয়াকে "সঠিক পথের দিকে একটি পদক্ষেপ" বলে অভিহিত করেছেন। তবে তিনি জাহাজ চলাচলের অধিকার সম্পূর্ণ পুনরুদ্ধারের ওপর জোর দিয়েছেন। ফ্রান্স এবং যুক্তরাজ্যের রাষ্ট্রপ্রধানসহ ইউরোপীয় নেতারাও একই সুরে কথা বলেছেন। তারা জোর দিয়ে বলেছেন যে, প্রণালীটি স্থায়ী ও নিঃশর্তভাবে খুলতে হবে। এদিকে, বড় বড় জাহাজ কোম্পানিগুলো জানিয়েছে যে তারা সতর্কতার সঙ্গে এগোবে। তারা জলপথের নিরাপত্তা নিয়ে আশ্বাস চায়, বিশেষ করে যুদ্ধের সময় পেতে রাখা নৌ-মাইনের সম্ভাব্য হুমকি নিয়ে তারা উদ্বিগ্ন। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প দাবি করেছেন যে, ইরান আমেরিকার সহায়তায় মাইন সরানোর কাজ করছে।

আগামী দিনগুলো খুবই গুরুত্বপূর্ণ। এ থেকেই বোঝা যাবে, প্রণালী খুলে দেওয়াটা একটি সাময়িক স্বস্তি, নাকি বৃহত্তর সংঘাত সমাধানের দিকে একটি वास्तविक পদক্ষেপ। লেবাননের যুদ্ধবিরতির সঙ্গে প্রণালীর পরিস্থিতির যে সংযোগের কথা ইরান বলছে, তা নিয়ে মতবিরোধ রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র আনুষ্ঠানিকভাবে এই সংযোগের কথা অস্বীকার করে। এটিই এখন বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দু। লেবাননের দশ দিনের যুদ্ধবিরতির সাফল্য, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় চলমান আলোচনার অগ্রগতি, এবং মার্কিন অবরোধ নিয়ে অচলাবস্থার সমাধান—এই সবই হবে નિર્ણায়ক বিষয়। আপাতত, বিশ্ব এই সংকীর্ণ জলপথের দিকে তাকিয়ে আছে। সবাই আশা করছে, এই ভঙ্গুর শান্তি বজায় থাকবে এবং কূটনীতির মাধ্যমে এই উত্তাল রাজনৈতিক পরিস্থিতি শান্ত হবে।

Source: nytimes

Publication

The World Dispatch

Source: World News API