হাসিনার প্রত্যর্পণের অনুরোধ পর্যালোচনা করছে ভারত, সম্পর্কে নতুন মোড়
১৭ এপ্রিল, ২০২৬
ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, প্রত্যর্পণের অনুরোধটি আইনি পর্যালোচনার মধ্যে রয়েছে। বাংলাদেশের নতুন নেতৃত্বের সঙ্গে সম্পর্ক জোরদার করার চেষ্টার মধ্যেই নয়াদিল্লি এই বিচারিক প্রক্রিয়া সামলাচ্ছে।
প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণের জন্য ঢাকার পাঠানো অনুরোধ আনুষ্ঠানিকভাবে পর্যালোচনা করছে নয়াদিল্লি। এই ঘটনাটি দুই দক্ষিণ এশীয় প্রতিবেশীর পরিবর্তনশীল সম্পর্কের একটি গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্ত। ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় নিশ্চিত করেছে যে অনুরোধটি প্রতিষ্ঠিত বিচারিক এবং অভ্যন্তরীণ আইনি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে পরীক্ষা করা হচ্ছে। তারা জোর দিয়েছে যে কোনো সিদ্ধান্ত রাজনৈতিক সুবিধার পরিবর্তে যথাযথ প্রক্রিয়ার মাধ্যমে নেওয়া হবে। বাংলাদেশে বড় ধরনের রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর ভারত যখন নতুন সরকারের সঙ্গে সম্পর্ক নতুন করে সাজানোর চেষ্টা করছে, তখনই এই ঘটনাটি ঘটল।
এই প্রত্যর্পণের অনুরোধটি এসেছে ২০২৪ সালের আগস্ট মাসের নাটকীয় ঘটনার পর। তখন "জুলাই বিপ্লব" নামে পরিচিত ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানের ফলে শেখ হাসিনার ১৫ বছরের শাসনের অবসান হয়। বিক্ষোভের পর তিনি ভারতে পালিয়ে যান এবং তখন থেকে সেখানেই স্বেচ্ছানির্বাসনে আছেন। পরবর্তী অন্তর্বর্তীকালীন সরকার এবং নবনির্বাচিত প্রশাসন তার শাসনামলের সাথে সম্পর্কিত আইনি প্রক্রিয়ার মুখোমুখি করার জন্য তার প্রত্যাবর্তন চেয়েছে। ২০২৫ সালের নভেম্বরে বাংলাদেশের একটি অভ্যন্তরীণ ট্রাইব্যুনাল মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধের অভিযোগে তাকে অনুপস্থিতিতে মৃত্যুদণ্ড দেয়। তবে হাসিনা এই রায়কে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে দাবি করেছেন।
হাসিনার চলে যাওয়ার পর বাংলাদেশের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট পুরোপুরি বদলে গেছে। ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারির সাধারণ নির্বাচনে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) ভূমিধস বিজয় লাভ করে। এর মাধ্যমে একটি নতুন রাজনৈতিক যুগের সূচনা হয়, কারণ হাসিনার দল আওয়ামী লীগকে নির্বাচনে অংশ নিতে বাধা দেওয়া হয়েছিল। ঢাকার নতুন সরকার প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রীকে বিচারের মুখোমুখি করাকে তাদের কর্মসূচির অংশ হিসেবে অগ্রাধিকার দিয়েছে। এটি ভারতের জন্য একটি জটিল কূটনৈতিক চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে। নয়াদিল্লির সঙ্গে হাসিনা সরকারের একটি শক্তিশালী ও সহযোগিতামূলক সম্পর্ক ছিল। এখন ভারতের মাটিতে হাসিনার উপস্থিতির মতো সংবেদনশীল বিষয়টি সামলানোর পাশাপাশি নতুন প্রশাসনের সঙ্গেও একটি গঠনমূলক অংশীদারিত্ব গড়ে তুলতে হচ্ছে।
ভারতের জন্য এই পরিস্থিতিটি একটি বহুমুখী চ্যালেঞ্জ। একদিকে দ্বিপাক্ষিক প্রত্যর্পণ চুক্তির অধীনে আইনি বাধ্যবাধকতা, অন্যদিকে বৃহত্তর কৌশলগত স্বার্থ— এই দুয়ের মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করতে হচ্ছে। কর্মকর্তারা সব পক্ষের সাথে গঠনমূলকভাবে কাজ করার এবং ঢাকার নতুন সরকারের সাথে সম্পর্ক জোরদার করার বিষয়ে ভারতের ইচ্ছার ওপর জোর দিয়েছেন। প্রত্যর্পণের অনুরোধ নিয়ে জটিলতা সত্ত্বেও, বাণিজ্য থেকে নিরাপত্তা পর্যন্ত বিভিন্ন দ্বিপাক্ষিক বিষয়ে উভয় দেশের মধ্যে উচ্চ পর্যায়ের আলোচনা অব্যাহত রয়েছে। এটি ইঙ্গিত দেয় যে দুই দেশই সম্পর্ককে এগিয়ে নিয়ে যেতে চায়।
এই ঘটনার পরবর্তী পদক্ষেপগুলো ঘনিষ্ঠভাবে পর্যবেক্ষণ করা হবে এবং তা ভারতের আইনি কাঠামোর মধ্যেই সম্পন্ন হবে। এই প্রক্রিয়াটি দীর্ঘ হবে বলে মনে করা হচ্ছে। এতে বিচারিক পর্যালোচনা এবং অভিযোগের রাজনৈতিক চরিত্র বিবেচনা করা হবে, যা দুই দেশের প্রত্যর্পণ চুক্তিতে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। ভারতের এই অনুরোধ সামলানোর পদ্ধতির ওপরই কেবল একজন দীর্ঘদিনের আঞ্চলিক মিত্রের ভাগ্য নির্ভর করছে না, বরং এই অঞ্চলের স্থিতিশীলতা ও উন্নয়নের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার বাংলাদেশের সঙ্গে তার সম্পর্কের ভবিষ্যত গতিপথও নির্ধারিত হবে।
Source: firstpost