এক দশকে প্রথম: মার্কিন মহড়ায় যোগ দিল লিবিয়ার বিবদমান দুই পক্ষ

১৭ এপ্রিল, ২০২৬

এক দশকে প্রথম: মার্কিন মহড়ায় যোগ দিল লিবিয়ার বিবদমান দুই পক্ষ

এক দশকের মধ্যে এই প্রথম লিবিয়ার দুই বিবদমান সামরিক বাহিনী একসঙ্গে মহড়া দিচ্ছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বে এই ঐতিহাসিক মহড়া দেশটিতে শান্তি ফিরিয়ে আনার নতুন আশা জাগিয়েছে।

শান্তি প্রতিষ্ঠার পথে এটি একটি বড় এবং অভূতপূর্ব পদক্ষেপ। লিবিয়ার পূর্বাঞ্চল ও পশ্চিমাঞ্চলের বিবদমান সামরিক বাহিনীগুলো যুক্তরাষ্ট্রের তত্ত্বাবধানে একটি যৌথ মহড়ায় অংশ নিয়েছে। "ফ্লিন্টলক ২০২৬" নামের এই মহড়াটির নেতৃত্বে আছে যুক্তরাষ্ট্রের আফ্রিকা কমান্ড (AFRICOM)। এক দশকেরও বেশি সময়ের মধ্যে এই প্রথমবার প্রতিপক্ষ গোষ্ঠীগুলো একসঙ্গে কোনো সামরিক মহড়ায় অংশ নিল। দীর্ঘদিন ধরে সংঘাতে বিভক্ত দেশটিতে এটি একটি ইতিবাচক পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে। এই সপ্তাহে কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ উপকূলীয় শহর সির্তে মহড়াটি শুরু হয়েছে। এই শহরটি একসময় দুই পক্ষের মধ্যে যুদ্ধের অন্যতম কেন্দ্র ছিল।

২০১১ সালে দীর্ঘদিনের শাসক মুয়াম্মার গাদ্দাফিকে ক্ষমতাচ্যুত করার পর থেকেই লিবিয়ায় গভীর রাজনৈতিক ও সামরিক বিভাজন চলছে। ২০১৪ সালে দেশটি কার্যত বিভক্ত হয়ে পড়ে। তখন দুটি সমান্তরাল প্রশাসন তৈরি হয় এবং বিভিন্ন সশস্ত্র গোষ্ঠী নিয়ন্ত্রণের জন্য লড়াই শুরু করে। প্রধান দুটি বিবদমান পক্ষ হলো—রাজধানী ত্রিপোলিভিত্তিক আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত গভর্নমেন্ট অফ ন্যাশনাল ইউনিটি (জিএনইউ) এবং পূর্বাঞ্চলে খলিফা হাফতারের নেতৃত্বাধীন লিবিয়ান ন্যাশনাল আর্মি (এলএনএ)। ২০১৯ থেকে ২০২০ সালের মধ্যে তাদের সংঘাত চরমে ওঠে, যখন এলএনএ ত্রিপোলি দখলের জন্য বড় ধরনের অভিযান চালায়। সেই প্রচেষ্টা ব্যর্থ হয়, কিন্তু এটি দেশের বিভাজনকে আরও গভীর করে তোলে।

"ফ্লিন্টলক" মহড়াটি মূলত সন্ত্রাস দমন ও নিরাপত্তা সহযোগিতার জন্য একটি বার্ষিক আয়োজন। এতে ৩০টিরও বেশি দেশের বাহিনী অংশ নেয়। এই বছর লিবিয়া এই আয়োজনের অন্যতম আয়োজক, যা একটি ঐতিহাসিক মাইলফলক। পরিকল্পনা ও সমর্থনে ইতালিও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। আকাশ, স্থল এবং সাগরে সমন্বিত প্রশিক্ষণের মাধ্যমে অভিযানের জন্য প্রস্তুতি বাড়ানোই এই মহড়ার লক্ষ্য। লিবিয়ার জন্য, জিএনইউ-সমর্থিত বাহিনী এবং এলএনএ ইউনিট উভয়ের অংশগ্রহণ একটি আস্থাবর্ধক পদক্ষেপ। এর উদ্দেশ্য দেশের বিভক্ত সামরিক বাহিনীকে এক করা। মার্কিন কর্মকর্তারা আশা করছেন, এই মহড়া লিবিয়াকে স্থিতিশীল করার এবং বিদেশি ভাড়াটে সেনাদের প্রভাব মোকাবিলার একটি বড় প্রচেষ্টার শুরু হবে।

সব পক্ষই এই সহযোগিতার গুরুত্ব তুলে ধরেছে। এলএনএ-এর ডেপুটি কমান্ডার এবং খলিফা হাফতারের ছেলে সাদ্দাম হাফতার এক ভাষণে বলেন, এই মহড়া আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক শান্তি রক্ষায় লিবিয়াকে একটি নির্ভরযোগ্য অংশীদার হিসেবে আবারও প্রমাণ করেছে। একইভাবে, ত্রিপোলি-ভিত্তিক সরকারের প্রতিনিধিরা পূর্বাঞ্চলের কর্মকর্তাদের সঙ্গে মহড়ার প্রস্তুতি তদারকি করেছেন। যুক্তরাষ্ট্র ও জাতিসংঘসহ আন্তর্জাতিক মধ্যস্থতাকারীরা দীর্ঘদিন ধরে বলছেন, দীর্ঘমেয়াদী স্থিতিশীলতা ও জাতীয় নির্বাচনের জন্য সামরিক বাহিনীকে একীভূত করা জরুরি। এই যৌথ মহড়াকে সেই নীতির একটি বাস্তব প্রয়োগ হিসেবে দেখা হচ্ছে।

এই সহযোগিতার প্রভাব সুদূরপ্রসারী। একটি আরও একীভূত ও পেশাদার লিবীয় সামরিক বাহিনী উগ্রপন্থী গোষ্ঠীগুলোকে আরও কার্যকরভাবে মোকাবিলা করতে এবং দেশের বিশাল সীমান্ত রক্ষা করতে পারবে। এটি বিদেশি যোদ্ধাদের ওপর লিবিয়ার নির্ভরতা কমাতে এবং সংঘাতে ইন্ধন জোগানো বিদেশি শক্তিগুলোকে দূরে রাখার একটি কৌশলগত পদক্ষেপ হিসেবেও দেখা হচ্ছে। এই প্রাথমিক মহড়ার সাফল্য সশস্ত্র বাহিনীকে আরও একীভূত করার পথ তৈরি করতে পারে। এটি রাজনৈতিক আলোচনার জন্যও একটি নতুন গতি সঞ্চার করতে পারে। যদিও সম্পূর্ণ পুনর্মিলনের পথটি এখনও নানা চ্যালেঞ্জে পূর্ণ, সির্তের এই ঐতিহাসিক সামরিক মহড়া লিবিয়ার জন্য আরও স্থিতিশীল ও সমন্বিত ভবিষ্যতের দিকে একটি বাস্তব ও আশাব্যঞ্জক পদক্ষেপ।

Source: abplive

Publication

The World Dispatch

Source: World News API