অনিশ্চিত যুদ্ধবিরতি, তবু দক্ষিণ লেবাননে ফিরছে মানুষের ঢল
১৭ এপ্রিল, ২০২৬
হেজবোল্লাহ যুদ্ধবিরতি মানবে কিনা, তা এখনো স্পষ্ট নয়। তবে লেবাননের মানুষ কিছুটা শান্তির আশায় স্বস্তি বোধ করছে এবং সাহায্য সংস্থাগুলো এগিয়ে আসছে।
আমেরিকার মধ্যস্থতায় হওয়া একটি ভঙ্গুর যুদ্ধবিরতি ১৬ এপ্রিল থেকে কার্যকর হয়েছে। এর পরেই বাস্তুচ্যুত লেবানিজরা দলে দলে দেশের দক্ষিণে নিজেদের বাড়ির দিকে ফিরতে শুরু করেছে। ১৭ এপ্রিল হাজার হাজার মানুষ তাদের জিনিসপত্র গাড়ি ও ট্রাকে বোঝাই করে। এতে বৈরুত ও মাউন্ট লেবানন থেকে সিডন ও টায়ার শহরের দিকে যাওয়া হাইওয়েগুলোতে তীব্র যানজট তৈরি হয়। এই ফেরাটা ঘটছে ইসরায়েলি বাহিনী ও হেজবোল্লাহ যোদ্ধাদের মধ্যে ছয় সপ্তাহের এক বিধ্বংসী সংঘাতের পর। এই সংঘাতে লেবাননে ২,০০০-এর বেশি মানুষ নিহত এবং দশ লাখের বেশি মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছিল। বাস্তুচ্যুতরা এমন এক জায়গায় ফিরে যাচ্ছে যা তীব্র ইসরায়েলি বোমাবর্ষণে ক্ষতবিক্ষত। তাদের অনেকেই জানে না যে তাদের বাড়িঘর আদৌ টিকে আছে কিনা।
বাড়ি ফেরার এই যাত্রা এক কঠিন ও বেদনাদায়ক তীর্থযাত্রার মতো। ফিরে এসে পরিবারগুলো দেখছে যে তাদের আস্ত গ্রাম ও পাড়াগুলো ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে। বৈরুতের দক্ষিণের শহরতলি এবং দক্ষিণাঞ্চলের বিভিন্ন শহরে ফিরে আসা বাসিন্দারা দেখছে শুধু ভেঙে পড়া অ্যাপার্টমেন্ট আর ধ্বংসাবশেষে ভরা রাস্তা। পরিকাঠামো ভেঙে পড়েছে। লিতানি নদীর ওপরের প্রধান সেতুগুলো ধ্বংস হয়ে গেছে। ফলে লেবাননের সেনাবাহিনীকে যানবাহন চলাচলের জন্য অস্থায়ী পারাপারের ব্যবস্থা করতে হচ্ছে। এই ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞের পরেও, এমনকি যাদের বাড়িঘর আর নেই, তাদেরও নিজের ভিটেমাটিতে ফেরার ইচ্ছাটা প্রবল। কেউ কেউ ধ্বংসস্তূপের ওপরই তাঁবু খাটিয়ে থাকার শপথ নিচ্ছে।
এই ফিরে আসার চেষ্টার ওপর গভীর অনিশ্চয়তার ছায়া রয়েছে। কারণ যুদ্ধবিরতিটি প্রাথমিকভাবে মাত্র দশ দিনের জন্য করা হয়েছে, যাতে আরও আলোচনার সুযোগ থাকে। লেবানন ও ইসরায়েল, দুই দেশের সেনাবাহিনীই নিরাপত্তার কারণে বেসামরিক নাগরিকদের এত তাড়াতাড়ি ফিরতে বারণ করেছিল। ইসরায়েলি বাহিনী এখনো দক্ষিণ লেবাননের ভেতরে অবস্থান করছে। ইসরায়েলের প্রতিরক্ষামন্ত্রী বলেছেন যে তারা একটি "বাফার জোন" ধরে রাখবে এবং সেনা প্রত্যাহার করবে না। উত্তেজনা আরও বাড়িয়ে দিয়েছে হেজবোল্লাহ। তারা রাষ্ট্রীয় পর্যায়ের এই চুক্তিতে সরাসরি স্বাক্ষরকারী নয়। তারা যুদ্ধবিরতি মানবে কিনা তা নিশ্চিত করেনি। তবে, ঘরে ফেরা মানুষের গাড়ির বহরে তাদের সমর্থকদের দেখা গেছে।
এই সংঘাতটি ২ মার্চ তীব্রভাবে বেড়ে গিয়েছিল। এটি একটি বৃহত্তর আঞ্চলিক সংঘাতের অংশ। এর আগে ২০২৪ সালেও একবার সংঘাত হয়েছিল। তারপর থেকে কিছুটা শান্ত পরিস্থিতি ছিল। অনেক এলাকা সেই আগের সংঘাতের ক্ষতি কাটিয়ে ওঠার চেষ্টা করছিল। বর্তমান যুদ্ধবিরতিটি আমেরিকার মধ্যস্থতায় হয়েছে। কয়েক দশকের মধ্যে এই প্রথম ইসরায়েল ও লেবানন সরকারের মধ্যে সরাসরি কূটনৈতিক আলোচনা হলো। এর লক্ষ্য একটি স্থায়ী শান্তি চুক্তির ভিত্তি তৈরি করা। আন্তর্জাতিক সাহায্য সংস্থাগুলো সাহায্যের জন্য প্রস্তুত হচ্ছে। কিন্তু মানবিক সংকট বিশাল। কারণ প্রায় ৩৭,০০০ বাড়ি ধ্বংস হয়ে গেছে।
আগামী দিনগুলো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। দক্ষিণ লেবাননের ভবিষ্যৎ নির্ভর করছে এই ভঙ্গুর যুদ্ধবিরতি একটি স্থায়ী শান্তিতে রূপান্তরিত হতে পারে কিনা তার ওপর। এর জন্য কিছু বিতর্কিত বিষয় সমাধান করতে হবে। যেমন, লেবাননের মাটিতে ইসরায়েলি সেনাদের উপস্থিতি এবং হেজবোল্লাহকে নিরস্ত্র করা, যা ইসরায়েলের একটি প্রধান দাবি। দক্ষিণের দিকে ফেরা হাজার হাজার পরিবারের জন্য এই যাত্রাটা বেশ কঠিন। তাদের সঙ্গে সম্বল বলতে সামান্য যা কিছু অবশিষ্ট আছে। তাদের মনে একদিকে যেমন আশা, তেমনই এক বেদনাদায়ক ভয়ও কাজ করছে। তারা জানে, এই শান্তি যেকোনো মুহূর্তে ভেঙে যেতে পারে। আর তখন তাদের আবার সব ছেড়ে পালাতে হবে।
Source: washingtonpost