আর ছাড় দিতে নারাজ আমেরিকা, রাশিয়ার থেকে তেল কেনা বন্ধ হওয়ার মুখে, কী করবে ভারত?

১৬ এপ্রিল, ২০২৬

আর ছাড় দিতে নারাজ আমেরিকা, রাশিয়ার থেকে তেল কেনা বন্ধ হওয়ার মুখে, কী করবে ভারত?

<p><span style="font-weight: 400;"><strong>নয়াদিল্লি:</strong> যুদ্ধকালীন পরিস্থিতিতে সাময়িক ছাড়পত্র মিলেছিল। কিন্তু ইরান এবং রাশিয়ার থেকে তেল কেনার ক্ষেত্রে নিষেধাজ্ঞা সরিয়ে আর ছাড়পত্র দিতে নারাজ আমেরিকা। ফলে ভারতও আর রাশিয়া এবং ইরানের কাছ থেকে তেল কিনতে পারবে না। হোয়াইট হাউসের তরফে স্পষ্ট জানিয়ে দেওয়া হল, ছাড়পত্রের মেয়াদ আর বৃদ্ধি করা হবে না। (Russian Oil)</span></p> <p><span style="font-weight: 400;">বুধবার আমেরিকার ট্রেজারি সচিব স্কট বেসেন্ট স্পষ্ট জানিয়ে দেন, আর ছাড়পত্র মিলবে না। তিনি বলেন, “রাশিয়ার তেল কেনার জেনারেল লাইসেন্স রিনিউ করব না আমরা, উরানের তেল কেনার জেনারেল লাইসেন্সও রিনিউ করা হবে না। ১১ মার্চের আগে যে তেল জলভাগে ছিল, সেই তেলেই ছাড়পত্র দেওয়া হয়েছিল শুধু। সেই ছাড়পত্রের ব্য়বহার সম্পূর্ণ হয়েছে।” (US-Iran War)</span></p> <p><span style="font-weight: 400;">গত ২৮ ফেব্রুয়ারি আমেরিকা এবং ইজ়রায়েলের তরফে প্রথমে ইরানে হামলা চালানো হয়। হত্যা করা হয় দেশের তদানীন্তন সর্বোচ্চ শাসক আয়াতোল্লা আলি খামেনেইকে। সেই থেকে একটানা বন্ধ ছিল হরমুজ প্রণালী,যার দরুণ জ্বালানি সঙ্কট নেমে আসে বিভিন্ন দেশের উপর। ভারতেও জ্বালানি সঙ্কট দেখা দেয়। </span></p> <p><span style="font-weight: 400;">সেই পরিস্থিতিতে সাময়িক ছাড়পত্র দেয় আমেরিকা। ১১ মার্চ পর্যন্ত রাশিয়া থেকে তেল নিয়ে যে সব জাহাজ সমুদ্রে নেমে পড়ে, সেগুলি থেকে তেল কেনা যাবে বলে জানানো হয়। এক মাসের জন্য ওই ছাড়পত্র দেওয়া হয়েছিল সেই সময়। সেই নিরিখে ১১ এপ্রিল পর্যন্ত মেয়াদ ছিল ওই ছাড়পত্রের। </span></p> <p><span style="font-weight: 400;">একই ভাবে গত ২০ মার্চ আমেরিকার ট্রেজারি বেঞ্চের তরফে ইরানেরতেল কেনায় সাময়িক ছাড়পত্র দেওয়া হয়। ১৪০ মিলিয়ন ব্যারেল তেল বিভিন্ন দেশে পৌঁছে দেওয়া যাবে বলে জানানো হয় সেইসময়। ইরানের তেলের উপর ওই ছাড়পত্রের মেয়াদ ১৯ এপ্রিল পর্যন্ত। এই সময় ছাড়পত্রের মেয়াদ পেরিয়ে যাওয়ার কথা যে বলা হচ্ছে, তাও আমেরিকার কৌশল বলে মনে করা হচ্ছে। সমঝোতায় তেহরানকে রাজি করাতেই চাপসৃষ্টি করা হচ্ছে বলে মত বিশেষজ্ঞদের একাংশের।</span></p> <p><span style="font-weight: 400;">আমেরিকার তরফে ছাড়পত্র মেলায় রাশিয়া এবং ইরান, দুই দেশের কাছ থেকেই তেল কিনতে ঝাঁপিয়ে পড়ে ভারত। ওই সময়সীমার মধ্যে ভারতের বিভিন্ন তৈল শোধনাগারের তরফে ৩০ মিলিয়ন ব্য়ারেল তেলের বরাত দেওয়া হয়। মার্চ মাসে রাশিয়া থেকে দৈনিক ১.৯৮ মিলিয়ন ব্যারেল তেল এসে পৌঁছয়। এমনকি Reliance-ও রাশিয়ার থেকে তেল কিনতে শুরু করে। পাশাপাশি, ইরানের তেল নিয়ে ভারতে ৪ মিলিয়ন ব্যারেল তেল নিয়ে এসে পৌঁছয় দু’টি ট্যাঙ্কার। আমেরিকার নিষেধাজ্ঞার জেরে সাত বছর পর ইরান থেকে তেল এসে পৌঁছয় ভারতে।</span></p> <p><span style="font-weight: 400;">ইকনমিক টাইমসের রিপোর্ট বলছে, ভারত, ফিলিপিন্সের মতো এশিয়ার বেশ কিছু দেশ ইতিমধ্যেই ছাড়পত্রের মেয়াদ বৃদ্ধি করতে আবেদন জানিয়েছে আমেরিকার কাছে। রাশিয়া থেকে তেল আমদানিতে যাতে বন্ধ না হয়, অনুরোধ জানানো হয়েছে। আমেরিকার পরবর্তী সিদ্ধান্তের দিকে এই মুহূর্তে তাকিয়ে সকলে।</span></p>

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র সাম্প্রতিক সময়ে তার কঠোর অবস্থান স্পষ্ট করেছে, যার ফলে ভারত এক জটিল ভূ-রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি। ওয়াশিংটন সাফ জানিয়েছে যে তারা রাশিয়া থেকে অপরিশোধিত তেল আমদানির ক্ষেত্রে আর কোনো ছাড় দেবে না। এই সিদ্ধান্ত ভারতের জন্য একটি বড় ধাক্কা, কারণ দেশটি ইউক্রেন যুদ্ধের পর থেকে রাশিয়ার কাছ থেকে বিপুল পরিমাণে ছাড়ের মূল্যে তেল কিনে আসছিল। এই পরিস্থিতিতে নয়াদিল্লিকে তার জ্বালানি নিরাপত্তা, অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা এবং দীর্ঘদিনের কূটনৈতিক সম্পর্কগুলির মধ্যে একটি সূক্ষ্ম ভারসাম্য বজায় রাখতে হবে।

ইউক্রেনে রাশিয়ার আগ্রাসনের পর ২০২২ সাল থেকে পশ্চিমা দেশগুলি মস্কোর ওপর কঠোর অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে। এর ফলে রাশিয়া তার তেল বিক্রির জন্য নতুন বাজার খুঁজতে বাধ্য হয় এবং ভারত এই সুযোগটি কাজে লাগায়। আগে ভারতের মোট তেল আমদানিতে রাশিয়ার ভাগ ছিল নগণ্য, কিন্তু যুদ্ধের পর তা বেড়ে প্রায় ৩৫-৪০ শতাংশে পৌঁছায়। ছাড়ের মূল্যে তেল পাওয়ায় ভারত তার অভ্যন্তরীণ বাজারে জ্বালানির দাম নিয়ন্ত্রণ করতে এবং মুদ্রাস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে সক্ষম হয়েছিল। ভারত সরকারের পক্ষ থেকে বারবার বলা হয়েছে যে দেশের শক্তি নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং ১.৪ বিলিয়ন মানুষের স্বার্থ রক্ষা করাই তাদের মূল লক্ষ্য।

প্রথমদিকে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং তার মিত্ররা ভারতের এই অবস্থান নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করলেও, সরাসরি কোনো কঠোর পদক্ষেপ নেয়নি। কিন্তু সাম্প্রতিক সিদ্ধান্ত থেকে এটা স্পষ্ট যে ওয়াশিংটনের ধৈর্য শেষ হয়ে আসছে। মার্কিন ট্রেজারি সেক্রেটারি স্কট বেসেন্ট ঘোষণা করেছেন যে রাশিয়া ও ইরান থেকে তেল আমদানির জন্য দেওয়া অস্থায়ী ছাড় আর নবায়ন করা হবে না। এর কারণ হিসেবে মনে করা হচ্ছে যে, আমেরিকা রাশিয়াকে অর্থনৈতিকভাবে আরও বিচ্ছিন্ন করতে এবং তার যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার ক্ষমতা হ্রাস করতে চাইছে। এই পদক্ষেপ ভারতের জন্য একটি স্পষ্ট বার্তা যে তাকে পশ্চিমা দেশগুলির নিষেধাজ্ঞার সঙ্গে আরও বেশি সঙ্গতিপূর্ণ হতে হবে।

রাশিয়ার ছাড়ের তেল ছাড়া ভারতের অর্থনীতিতে বড় ধরনের প্রভাব পড়তে পারে। বিশেষজ্ঞদের মতে, এর ফলে ভারতের তেল আমদানি খাতে বার্ষিক প্রায় ৯ থেকে ১১ বিলিয়ন ডলার অতিরিক্ত খরচ হতে পারে। এর প্রভাব পড়বে দেশের বাণিজ্য ঘাটতির ওপর এবং টাকার মূল্যের ওপরও চাপ সৃষ্টি হতে পারে। সাধারণ মানুষের ওপর এর প্রভাব পড়তে পারে পেট্রোল ও ডিজেলের দাম বৃদ্ধির মাধ্যমে, যা সার্বিক মুদ্রাস্ফীতিকে আরও বাড়িয়ে তুলতে পারে। এছাড়াও, এই পরিস্থিতি ভারতের দীর্ঘদিনের মিত্র রাশিয়ার সঙ্গে সম্পর্কেও প্রভাব ফেলতে পারে। অন্যদিকে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রাখাও ভারতের জন্য কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

এই জটিল পরিস্থিতিতে ভারতের সামনে বেশ কয়েকটি পথ খোলা রয়েছে। প্রথমত, নয়াদিল্লি কূটনৈতিক স্তরে ওয়াশিংটনের সঙ্গে নিবিড় আলোচনা চালিয়ে যেতে পারে, যাতে তার জ্বালানি নিরাপত্তার প্রয়োজনীয়তা বোঝানো যায়। একই সঙ্গে, মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলি, যেমন ইরাক ও সৌদি আরব, এবং আমেরিকা থেকেও তেল আমদানি বাড়ানোর জন্য আলোচনা শুরু করতে পারে। তবে অন্য উৎস থেকে তেল কিনলে খরচ বাড়ার সম্ভাবনা প্রবল। অভ্যন্তরীণভাবে, জ্বালানির দামের সম্ভাব্য বৃদ্ধি মোকাবিলা করার জন্য সরকারকে নতুন নীতি গ্রহণ করতে হতে পারে। আগামী দিনে ভারত কীভাবে এই অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করে, তার ওপর দেশের ভবিষ্যৎ অনেকটাই নির্ভর করছে।

Source: abplive

Publication

The World Dispatch

Source: World News API