মোদিই এখন ভরসা? ট্রাম্পের কথা বলার ৪৮ ঘণ্টার মধ্যেই ফোন করলেন ফরাসি প্রেসিডেন্ট, মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিরতা নিয়ে আলোচনা
১৬ এপ্রিল, ২০২৬
উল্লেখযোগ্যভাবে, রাষ্ট্রপতি ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে কথা বলার ঠিক ৪৮ ঘণ্টা পরেই ম্যাক্রোঁর এই ফোনকলটি আসে। প্রধানমন্ত্রী মোদি স্পষ্ট করে দিয়েছেন যে, এই অঞ্চলে শান্তি ও স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনতে ভারত-ফ্রান্সের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করে যাবে।
বিশ্ব রাজনীতিতে নতুন সমীকরণের ইঙ্গিত দিয়ে, মধ্যপ্রাচ্যের ক্রমবর্ধমান অস্থিরতা নিরসনে আন্তর্জাতিক মহল ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর দিকে তাকিয়ে রয়েছে। এই প্রেক্ষাপটে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রাক্তন রাষ্ট্রপতি ডোনাল্ড ট্রাম্পের এক গুরুত্বপূর্ণ মন্তব্যের মাত্র ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে ফরাসি প্রেসিডেন্ট এমানুয়েল ম্যাক্রোঁর সঙ্গে প্রধানমন্ত্রী মোদীর ফোনালাপ বিশেষ তাৎপর্য বহন করছে। বৃহস্পতিবার দুই নেতার মধ্যে এই আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়, যেখানে প্রধানত পশ্চিম এশিয়ার বর্তমান পরিস্থিতি এবং হরমুজ প্রণালীতে নৌচলাচলের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার ওপর জোর দেওয়া হয়। এই ঘটনা ভারতের বিশ্বমঞ্চে ক্রমবর্ধমান কূটনৈতিক প্রভাবকেই তুলে ধরেছে।
সাম্প্রতিক সময়ে মধ্যপ্রাচ্যে, বিশেষ করে ইরান এবং তার প্রতিবেশী দেশগুলির মধ্যে উত্তেজনা এক নতুন মাত্রা পেয়েছে। হরমুজ প্রণালী, যা বিশ্বের জ্বালানি সরবরাহের জন্য একটি অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জলপথ, সেখানে নৌচলাচল ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। এই সংকটের পরিপ্রেক্ষিতে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান কী হবে, তা নিয়ে বিশ্বজুড়ে জল্পনা চলছিল। ডোনাল্ড ট্রাম্প সম্প্রতি এক বিবৃতিতে মধ্যপ্রাচ্য সংকট সমাধানের জন্য আলোচনার উপর জোর দিলেও, প্রয়োজনে আবার সামরিক পদক্ষেপ গ্রহণের হুঁশিয়ারিও দিয়েছেন। তার এই মন্তব্যের পর অনেকেই মনে করছেন যে, আমেরিকা এই অঞ্চলে সরাসরি বড় আকারের হস্তক্ষেপে আগ্রহী নয়, যা বিশ্ব শক্তিসমূহের মধ্যে এক ধরনের শূন্যতা তৈরি করেছে। এই পরিস্থিতিতেই ফ্রান্সের মতো দেশগুলো বিকল্প মধ্যস্থতাকারী হিসেবে ভারতের দিকে ঝুঁকছে।
ফরাসি প্রেসিডেন্ট ম্যাক্রোঁ এবং প্রধানমন্ত্রী মোদীর মধ্যে এই ফোনালাপ হঠাৎ ঘটে যাওয়া কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। ভারত ও ফ্রান্সের মধ্যে একটি শক্তিশালী কৌশলগত অংশীদারিত্ব রয়েছে, যা ১৯৯৮ সাল থেকে বিদ্যমান। প্রতিরক্ষা, মহাকাশ গবেষণা, এবং সম্প্রতি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার মতো বিভিন্ন ক্ষেত্রে দুই দেশের সহযোগিতা সময়ের সঙ্গে সঙ্গে আরও গভীর হয়েছে। দুই নেতাই বহুপাক্ষিক বিশ্বব্যবস্থায় বিশ্বাসী এবং আন্তর্জাতিক সমস্যা সমাধানে আলোচনার ওপর গুরুত্ব দেন। ম্যাক্রোঁ প্রধানমন্ত্রী মোদীকে "প্রিয় বন্ধু" হিসাবে সম্বোধন করে এই অঞ্চলের শান্তি ও স্থিতিশীলতার জন্য ভারতের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সহযোগিতা অব্যাহত রাখার কথা বলেছেন, যা দুই দেশের সম্পর্কের গভীরতাকে প্রমাণ করে।
ভারতের এই কূটনৈতিক গুরুত্ব বৃদ্ধির পেছনে বেশ কিছু কারণ রয়েছে। প্রথমত, মধ্যপ্রাচ্যের বিবদমান প্রায় সকল পক্ষের সঙ্গেই ভারতের বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক বিদ্যমান। ইসরায়েল, ইরান এবং আরব দেশগুলোর সঙ্গে নয়াদিল্লির ভারসাম্যপূর্ণ নীতি ভারতকে একটি নিরপেক্ষ মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা পালনের সুযোগ করে দিয়েছে। দ্বিতীয়ত, এই অঞ্চলে ভারতের বিশাল অর্থনৈতিক স্বার্থ জড়িত, যার মধ্যে জ্বালানি নিরাপত্তা এবং প্রবাসী ভারতীয়দের நல অন্যতম। তাই, মধ্যপ্রাচ্যের স্থিতিশীলতা ভারতের জাতীয় স্বার্থের জন্যও অপরিহার্য। প্রধানমন্ত্রী মোদীর নেতৃত্বে ভারত তার 'কৌশলগত স্বায়ত্তশাসন' নীতি অনুসরণ করে কোনো নির্দিষ্ট শক্তি জোটের অংশ না হয়ে স্বাধীনভাবে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করছে, যা বিশ্বব্যাপী তার গ্রহণযোগ্যতা বাড়িয়েছে।
এই ফোনালাপের পর পরবর্তী পদক্ষেপ কী হতে পারে, সেদিকেই সকলের নজর থাকবে। ভারত হয়তো তার কূটনৈতিক চ্যানেল ব্যবহার করে বিবদমান পক্ষগুলোকে সংযম প্রদর্শনের জন্য এবং আলোচনায় বসার জন্য উৎসাহিত করবে। ফ্রান্স এবং অন্যান্য ইউরোপীয় দেশগুলোর সঙ্গে মিলে একটি সম্মিলিত কূটনৈতিক উদ্যোগও গ্রহণ করা হতে পারে। তবে এটা স্পষ্ট যে, বিশ্ব রাজনীতি এক নতুন দিকে মোড় নিচ্ছে, যেখানে ভারত শুধুমাত্র একটি অর্থনৈতিক শক্তি হিসেবেই নয়, বরং একজন বিশ্বস্ত মধ্যস্থতাকারী এবং শান্তি স্থাপনকারী বা 'গ্লোবাল পিসমেকার' হিসেবেও নিজের স্থান তৈরি করে নিচ্ছে। এই পরিবর্তনশীল বিশ্বব্যবস্থায় ভারতের ভূমিকা আগামী দিনে আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে বলে আশা করা যায়।
Source: bengali_news18