পৃথিবী থেকে কেন হারিয়ে যাচ্ছে ‘জীবন্ত মাটি’

২৭ মার্চ, ২০২৬

পৃথিবী থেকে কেন হারিয়ে যাচ্ছে ‘জীবন্ত মাটি’

আমাদের পায়ের নিচের মাটি নিয়ে একটি সাধারণ ধারণা রয়েছে যে, এটি কেবল চূর্ণবিচূর্ণ পাথর ছাড়া আর কিছুই নয়। এটি যেন এক জড় ও প্রাণহীন স্পঞ্জ, যা কেবল রাসায়নিক সারে পূর্ণ হওয়ার অপেক্ষায় থাকে। মানুষের সাধারণ কল্পনায়, মাটি হলো রুক্ষতা বা প্রাণহীনতার চূড়ান্ত প্রতীক। আমরা হাত থেকে এটি ধুয়ে ফেলি, এর ওপর পিচ ঢালাই করে রাস্তা বানাই এবং একে কেবল একটি ভৌত মঞ্চ হিসেবে দেখি যার ওপর জীবনের আসল নাটকটি মঞ্চস্থ হয়। অথচ, এই মৌলিক ভুল ধারণার আড়ালে লুকিয়ে আছে আমাদের পৃথিবীর সবচেয়ে বিস্ময়কর জৈবিক বাস্তবতার একটি। এক মুঠো সুস্থ মাটিতে পৃথিবীর মোট মানুষের চেয়েও বেশি সংখ্যক একক জীবন্ত প্রাণীর বাস। মাটি কোনোভাবেই মৃত খনিজ পদার্থ নয়, বরং এটি নিঃসন্দেহে পৃথিবীর সবচেয়ে জটিল এবং ঘনবসতিপূর্ণ বাস্তুতন্ত্র। আর মানবজাতির এই সত্য অনুধাবন করতে ব্যর্থ হওয়া এমন এক নীরব সংকটের জন্ম দিচ্ছে, যা বিশ্বব্যাপী কৃষির ভবিষ্যৎকে হুমকির মুখে ফেলছে।

এই অণুজীব জগতের বিশালতা বুঝতে হলে আধুনিক মৃত্তিকা বাস্তুবিদদের সংগৃহীত তথ্যের দিকে তাকাতে হবে। জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার (এফএও) হিসাব অনুযায়ী, বৈশ্বিক জীববৈচিত্র্যের প্রায় এক-চতুর্থাংশের বাস এই মাটিতে। সায়েন্স জার্নালে প্রকাশিত একটি বিস্তৃত মূল্যায়ন অনুসারে, এক ঘনফুট মাটির মধ্যে থাকা এই ভূগর্ভস্থ জালে রয়েছে কোটি কোটি ব্যাকটেরিয়া, হাজার হাজার প্রজাতির প্রোটোজোয়া এবং শত শত মাইল বিস্তৃত সূক্ষ্ম ছত্রাকের সুতো। এই জীবগুলো যে কেবল মাটিতে বাস করে তা নয়; তারা সক্রিয়ভাবে মাটি তৈরি করে। তারা জৈব পদার্থকে প্রক্রিয়াজাত করে, পাথর থেকে ফসফরাস বের করে এবং পুষ্টি উপাদানগুলোকে এমন রূপ দেয় যা উদ্ভিদের শিকড় শোষণ করতে পারে। এর বিনিময়ে উদ্ভিদ সালোকসংশ্লেষণের মাধ্যমে তৈরি তরল কার্বন মাটিতে পাঠায়, যা এই অণুজীবদের খাদ্যের যোগান দেয়। এই প্রাচীন, অদৃশ্য বাণিজ্য নেটওয়ার্কের কারণেই বনভূমি গড়ে ওঠে এবং ফসল বেড়ে ওঠে। তবে, সাম্প্রতিক বৈজ্ঞানিক জরিপগুলো এই বাস্তুতন্ত্রের স্বাস্থ্যের এক হতাশাজনক চিত্র তুলে ধরেছে। ইউরোপীয় কমিশনের জয়েন্ট রিসার্চ সেন্টারের প্রতিবেদনে দেখা গেছে, ইউরোপের প্রায় ৭০ শতাংশেরও বেশি কৃষিজমি বর্তমানে অস্বাস্থ্যকর অবস্থায় রয়েছে এবং ভয়াবহ জৈবিক ক্ষয়ের শিকার হচ্ছে। উত্তর আমেরিকা, এশিয়া এবং আফ্রিকাতেও একই ধরনের দ্রুত পরিবেশগত অবক্ষয়ের ধারা ত্বরান্বিত হচ্ছে।

এই ভয়াবহ অবক্ষয়ের মূল কারণগুলো লুকিয়ে আছে সেই পদ্ধতিগুলোর মাঝেই, যা বিংশ শতাব্দীর কৃষি বিপ্লব ঘটিয়েছিল। আধুনিক শিল্পভিত্তিক কৃষিব্যবস্থায় মাটিকে একটি জীবন্ত আবাসস্থলের বদলে কারখানার মেঝে হিসেবে বিবেচনা করা হয়। ক্রমাগত গভীর কর্ষণ এবং লাঙ্গল চাষের ফলে মাটির নিচ থেকে আলো-সংবেদনশীল ছত্রাকের নেটওয়ার্ক এবং গভীরে থাকা অণুজীবগুলো প্রখর রোদে উন্মুক্ত হয়ে পড়ে। এর ফলে মাটিকে ধরে রাখার আণুবীক্ষণিক কাঠামো কার্যত ছিন্নভিন্ন হয়ে যায়। এছাড়া কৃত্রিম নাইট্রোজেন সারের অত্যধিক ব্যবহার প্রাকৃতিক জৈবিক আদান-প্রদানকে ব্যাহত করে। ফসলের গায়ে জোর করে কৃত্রিম পুষ্টি চাপিয়ে দিলে তারা মাটিস্থ অণুজীবদের টিকিয়ে রাখার জন্য প্রয়োজনীয় কার্বন নিঃসরণ বন্ধ করে দেয়। অণুজীবগুলো যখন অনাহারে মারা যেতে থাকে, তখন মাটি তার 'গ্লোমালিন' নামক প্রাকৃতিক আঠালো নিঃসরণ হারিয়ে ফেলে, যা মাটির কণাগুলোকে একত্রে বেঁধে রাখে। বছরের পর বছর বিস্তীর্ণ জমিতে একই ফসল চাষ করার পদ্ধতি, যা 'মোনোক্রপিং' বা এক ফসলি চাষ নামে পরিচিত, তা অণুজীবের বৈচিত্র্যকে আরও কমিয়ে দেয়। কারণ মাটির নিচের এই বাস্তুতন্ত্র নানা প্রজাতির উদ্ভিদের শিকড় থেকে নিঃসৃত বৈচিত্র্যময় উপাদানের ওপর নির্ভর করেই টিকে থাকে।

জীবন্ত মাটিকে মেরে ফেলার পরিণতি অত্যন্ত ভয়াবহ এবং তা ক্রমশ দৃশ্যমান হচ্ছে। মাটি যখন তার জৈবিক আঠা হারিয়ে ফেলে, তখন এর গাঠনিক অখণ্ডতা নষ্ট হয় এবং তা সূক্ষ্ম ধুলোয় পরিণত হয়। এটি তখন বৃষ্টির জল ধরে রাখার জন্য স্পঞ্জের মতো কাজ করতে পারে না। পরিবর্তে, পানি মাটির ওপর দিয়ে গড়িয়ে যায় এবং মূল্যবান উপরিভাগের মাটিকে নদী ও সমুদ্রে ভাসিয়ে নিয়ে যায়। অন্যদিকে, জমিটি একইসঙ্গে ধ্বংসাত্মক বন্যা এবং দীর্ঘস্থায়ী খরার জন্য মারাত্মকভাবে ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে ওঠে। এই পরিবেশগত বিপর্যয়ের ঐতিহাসিক উদাহরণ বেশ ভয়াবহ। ১৯৩০-এর দশকে আমেরিকান গ্রেট প্লেইনস এলাকায় কয়েক দশক ধরে গভীর কর্ষণের ফলে মাটিকে ধরে রাখা গভীর শিকড়যুক্ত প্রেইরি বাস্তুতন্ত্র ধ্বংস হয়ে গিয়েছিল। এর চূড়ান্ত রূপ ছিল 'ডাস্ট বোল' নামক এক চরম পরিবেশগত বিপর্যয়। তখন লাখ লাখ একর জমির উপরিভাগের মাটি স্রেফ উড়ে গিয়েছিল, যার ফলে পুরো জনপদ বাস্তুচ্যুত হয়েছিল এবং আঞ্চলিক অর্থনীতি ধসে পড়েছিল। বর্তমানে এই ঝুঁকির মাত্রা বহুগুণ বেশি। জাতিসংঘ সতর্ক করেছে যে, অবক্ষয়ের বর্তমান হার অব্যাহত থাকলে আগামী ৬০ বছরের মধ্যে মানবজাতি তার বেশিরভাগ উর্বর মাটি হারিয়ে ফেলতে পারে। খাদ্য নিরাপত্তার বাইরেও, মাটির অণুজীব ধ্বংস হওয়া জলবায়ু পরিবর্তনকে ত্বরান্বিত করে। মহাসাগরগুলোর পরেই সুস্থ মাটি হলো পৃথিবীর দ্বিতীয় বৃহত্তম কার্বন সিঙ্ক বা কার্বন সঞ্চয়স্থল। অণুজীবের মৃত্যু এবং মাটির অবক্ষয়ের ফলে শত শত বছর ধরে সঞ্চিত কার্বন জারিত হয়ে পুনরায় বায়ুমণ্ডলে মিশে যায়। এটি একটি বিপজ্জনক চক্র তৈরি করে, যা বৈশ্বিক তাপমাত্রা আরও বাড়িয়ে দেয়।

এই হুমকির তীব্রতা সত্ত্বেও, মাটির অণুজীবের অবক্ষয় কোনো অপরিবর্তনীয় পরিণতি নয়। বিজ্ঞানী, কৃষিবিদ এবং কৃষকদের একটি ক্রমবর্ধমান অংশ ভূগর্ভস্থ স্বাস্থ্যের ওপর জোর দিয়ে দ্রুত ‘রিজেনারেটিভ’ বা পুনরুৎপাদনশীল কৃষিব্যবস্থায় রূপান্তরের পক্ষে প্রচারণা চালাচ্ছেন। এর মূলনীতি হলো মাটিকে যথাসম্ভব কম বিরক্ত করে প্রাকৃতিক বাস্তুতন্ত্রের অনুকরণ করা। ‘নো-টিল’ (বিনা কর্ষণ) কৃষিপদ্ধতিতে জমি অক্ষত রাখা হয় এবং আগের ফসলের অবশিষ্টাংশের মধ্য দিয়েই বীজ বপন করা হয়। এটি যান্ত্রিক ধ্বংসের হাত থেকে সূক্ষ্ম ছত্রাকের নেটওয়ার্ককে রক্ষা করে। ‘কভার ক্রপ’ বা আচ্ছাদন ফসলের ব্যবহার নিশ্চিত করে যে মাটিতে সবসময় জীবন্ত শিকড় থাকে, যা শীতকাল বা মৌসুমের বাইরের সময়েও অণুজীব সম্প্রদায়ের জন্য খাদ্যের নিরবচ্ছিন্ন উৎস জোগায়। এক ফসলি চাষের বদলে পর্যায়ক্রমে বৈচিত্র্যময় ফসল চাষের মাধ্যমে কৃষকরা একটি শক্তিশালী ও টেকসই অণুজীব জগৎ গড়ে তুলতে পারেন, যা রোগবালাই প্রতিরোধ এবং জল ধরে রাখতে সক্ষম। এই সমাধানগুলো যে ব্যাপক পরিসরে কাজ করে তার জোরালো প্রমাণ রয়েছে। ভারতের অন্ধ্রপ্রদেশ রাজ্যে সরকার সমর্থিত প্রাকৃতিক কৃষি উদ্যোগের মাধ্যমে লাখ লাখ কৃষককে কৃত্রিম রাসায়নিকের ব্যবহার ছেড়ে দিয়ে জৈব উপাদান এবং মাটিকে সবসময় ঢেকে রাখার পদ্ধতিতে উৎসাহিত করা হয়েছে। মাত্র কয়েক বছরের মধ্যেই অংশগ্রহণকারী কৃষকরা জানিয়েছেন যে তাদের জমি পুনরুজ্জীবিত হয়েছে, খরা সহ্য করার ক্ষমতা বেড়েছে এবং ফসলের ফলন প্রচলিত রাসায়নিক-নির্ভর পদ্ধতির সমান বা তাকে ছাড়িয়ে গেছে।

পরিশেষে, বৈশ্বিক খাদ্য সরবরাহ স্থিতিশীল করতে এবং জলবায়ু পরিবর্তনের সবচেয়ে খারাপ প্রভাবগুলো প্রশমিত করতে আধুনিক সমাজ পৃথিবীকে কীভাবে দেখে, সেই দৃষ্টিভঙ্গিতে এক গভীর পরিবর্তন আনতে হবে। পৃথিবীকে বাঁচানোর অর্থ কেবল বায়ুমণ্ডলে জমা হওয়া গ্যাসের দিকে বা মেরু অঞ্চলের গলে যাওয়া বরফের দিকে তাকানো নয়। এর জন্য প্রয়োজন নিচের দিকে তাকানো, আমাদের পায়ের নিচের মাটির ধারণাতীত জটিলতাকে স্বীকার করা। মানব প্রকৌশলের জন্য মাটি কোনো খালি পাত্র নয়; বরং এটি একটি ভঙ্গুর, জীবন্ত ও শ্বাস-প্রশ্বাস নেওয়া আবরণ, যা সমস্ত স্থলজ জীবনকে টিকিয়ে রাখে। মাটি যে সম্মান এবং বৈজ্ঞানিক যত্ন পাওয়ার যোগ্য, তার প্রতি সেই আচরণ করাটা এখন আর কোনো কাল্পনিক আদর্শ নয়; বরং মানবসভ্যতা টিকে থাকার জন্য এটি একটি অপরিহার্য প্রয়োজন।

Publication

The World Dispatch

Source: Editorial Desk

Category: Science